সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উপন্যাস

রাজনীতিমুখর কথাশিল্প

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৩, ১৯:২৭
রাজনীতির বাইরে যেমন কিছুই থাকে না, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্রও তা-ই, তাঁর জীবনের বাঁকে বাঁকে যে কথকতা আছে, যে সময় আছে, এসবের সাথে তাঁকে তো বোঝাপড়া করতেই হয়। এবং মোকাবিলা করে-করেই তাঁকে আগে-পিছে চলতে হয়। সময় আর বাস্তবতাকে তিনিও অস্বীকার করতে পারেন না। ওয়ালীউল্লাহ্র সাহিত্যচর্চার সময় হচ্ছে সেই চল্লিশের দশক, যেখানে পাক-ভারত বিভক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে ভাষামুখর জাতীয়তাবাদের চরম উন্মেষ ঘটছে। তিনি স্বভাবতই সেই সময়টার ধরন, আকার-প্রকার, কারুময়তা নিজগুণ দিয়ে দেখেছেন। শুধু দেখেনইনি, সেই সময়ের মূল কারিগর হয়েছেন তিনি, কথাশিল্পের কারিগর। তার মানে তাঁকে সেই সময়ের সাথে মোকাবিলাটা একেবারে সরাসরিই করতে হয়েছে। কথাশিল্পের জীবন তো আর উপমা, উেপ্রক্ষা বা ইশারা-ইঙ্গিতের জীবন নয়। কাব্যকথন দিয়ে হয়তো রাখঢাক করা চলে। কথাশিল্পে তা চলে না, তিনি তা করেনওনি। তাঁর সাহিত্যিক-ইতিহাস কার্যত পরিকল্পনা করে করে জগত্ নির্মাণের ইতিহাস। তিনি জানেন, এ জগত্ স্বাধীনতা দেয় না, জগতে ষোলআনা স্বাধীনতা বলে কিছু নাইও। যা আছে তা আসলে বাস্তবের সাথে নিজের অস্তিত্ব দেখার প্রাণান্তর সাধনা মাত্র। লেখকের কপালে তো থাকে আরও বেশি যন্ত্রণা, কারণ তিনি জানেন, বিকল্প স্বাধীনতা বিনে তার মুক্তি নাই। তাতে যন্ত্রণা বাড়ে বই কমে না, সেই হিসেবে লেখক হচ্ছেন সদা যন্ত্রণামুখর এক-একটা প্রাণী। তিনি মূলত সাধনা করে গেছেন, একধরনের সত্য সৃজন করেছেন। সেই সৃজনের জন্য কখনো ধর্মীয় জীবিতার কাছে, কখনো বা স্বোপার্জিত অস্তিত্বের কাছে, বা কলোনিয়াল পেষণের জান্তবতাকে নিবিড়ভাবে দেখার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। তিনি সত্য দেখেছেন, যুক্তিও বির্নিমাণ করেছেন, কিন্তু তাঁর শিল্পের কোনো সমর্পণমুখী কাঠামো নেই। এবং তিনি যে নিজের জগত্ বা একধরনের স্বাধীনতা নির্মাণ করেছেন, তা তো তা তাঁরই। এ তো সত্যি যে, তাঁকে একটা ইতিহাসের ভেতরই কথা বলতে হয়েছে, রাষ্ট্রের একটা চেহারা তখন ছিল, ভাষার একটা আদল ছিল। তখন সাহিত্যও অনেকেই রচনা করেছেন। বঙ্কিম-মশাররফ-রবি ঠাকুর-শরত্চন্দ্ররা তাঁদের মতো কাজ করেছেন, আবার মানিক-তারাশঙ্কর-সতীনাথ-জগদীশরাও নিজেদের মতো করে সাহিত্যজগত্ নির্মাণ করছেন। সেই সময়ের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যে স্বরে কথা বলা শুরু করলেন, কথাশিল্পের আলাদা ভুবন তৈরি করতে থাকলেন, তা ধীরে ধীরে চেনা যাচ্ছে। তাঁর সাহিত্যচর্চাকালে তাঁর সেই জায়গাটা আলাদা করে চিনিয়ে দেওয়া হয়নি। তখন হয়তো একধরনের দ্বিধা ছিল, ভাষা-সংস্কৃতির রাজনীতিও ছিল। তিনি যে সামাজিক সত্য নির্মাণ করতে শুরু করলেন, তাঁকে তখন সেইভাবে চেনানো হলো না। আমার মনে হয়, এটা তাঁর সম্পর্কে বড় একটা খামতি। তাঁর সম্পর্কে অতি পরিচিত কথা হচ্ছে—তিনি অস্তিত্ববাদ চেনাতে চাইলেন, রচনাশৈলীতে সমন্বিত চৈতন্যপ্রবাহ তাঁর আছে, ভাষার নিজস্ব কারুকাজ আছে, নিজেকে নিজে চ্যালেঞ্জ করার বাসনা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা তিনি রাজনীতিমুখর এক কথাশিল্পী। তিনি স্বাধীনতা চেয়েছেন, বলার লেখার দেখার। এজন্য আমরা বরং তাঁর উপন্যাসজগত্ নিয়েই কিছু কথা বলি। ১৯৪৮ সালে ‘কমরেড পাবলিশার্স’ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস লালসালু। সেই সময়ে, অর্থাত্ পাকিস্তান সৃষ্টির সেই আশা-নিরাশার এক দ্বিধাময় কালেই তিনি এমন একটা উপন্যাস লিখতে পারলেন! এতে ধর্মীয় নানান কুসংস্কার যেভাবে প্রকাশ করলেন, তাতে এটি রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর বিক্ষোব্ধ চেতনার এক সারাত্সার হয়ে আছে যেন। এখানে ধর্মব্যবসা নিয়ে কথা তো আছেই, মাজার-সংস্কৃতির এক ইতিবৃত্ত প্রকাশিত হয়েছে, এ থেকে উত্তরণের যে ইশারা এখানে আছে, তা-ই আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার মনে হয়। একটা মাজারকে কেন্দ্র করে একধরনের ব্যবসায়িক অবস্থান তো তিনি পরিষ্কার করলেন! তবে মাজারকে কেন্দ্র করে লোকায়ত ধর্মের যে সৌন্দর্য থাকে, ধর্মীয় নিয়ম-নৈতিকতা থেকে, মুক্তি পাওয়ার যে মানবিক বাসনা থাকে, সেই দিকে তিনি যানইনি। এমনকি মসজিদের সাথে মাজারঅলাদের যে সতত একটা কাইজা-ফ্যাসাদ আর নৈতিকতার দ্বন্দ্ব থাকে তাও এখানে দেখি না। বরং মাজারকে কেন্দ্র করে অতি সহজভাবেই গ্রামে একটা মসজিদ গড়ে উঠতে দেখি! তবে এ উপন্যাসে যে চরিত্র যা পাঠককে আগাগোড়া নাড়িয়ে দেয়—তার নাম জমিলা। আমাদের মনে হতে থাকে, এ কোনো চরিত্র নয়, যেন এক বাসনা আর স্বাধীনতার প্রতীক। তার দ্রোহ আর লড়াইই লালসালুর প্রাণভোমরা। যাবতীয় অরাজকতার বিরুদ্ধে তাকে লড়তে হয়, তার যে মৃত্যু মানে জীবন-উত্সর্গের ধরন, তাতে মনে হয়, ঔপন্যাসিক একটা বিশাল আলোময় দরজার কাছে তাঁর পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিলেন! মজিদ এক বদ-চরিত্র, যে তার দ্বিতীয় স্ত্রী জমিলাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মাজারের কাছে শিলাবৃষ্টির ভেতর ফেলে রাখে। তখন নেমে আসে এক আঁধার, জমিলার জীবনের শেষ সময়। আমরা সেই জায়গাটা খানিক পাঠ করি না হয়, ‘ঝাপটা খুলে মজিদ দেখলো লাল কাপড়ে আবৃত কাপড়ের পাশে হাত-পা ছড়িয়ে চিত্ হয়ে পড়ে আছে জমিলা, চোখ বোজা, বুকে কাপড় নাই। চিত্ হয়ে শুয়ে আছে বলে সে-বুকটা বালকের বুকের মত সমান মনে হয়। আর মেহেদী দেয়া তার একটা পা কবরের গায়ের সঙ্গে লেগে আছে।’ এখানেই লেখকের সত্যের কাছে সামাজিক সত্য ফাঁপা জিনিসের মতো খোলাসা হয়ে ওঠে। তারও পর মানুষের জীবন চলে, আমরা উপন্যাসের শেষও দেখি, মানে, ধর্মের সংস্কার থেকে মুক্তি আমাদের নাই, কিন্তু একধরনের অনুসন্ধানের সাথে, লেখকের গতির সাথে আমাদের চৈতন্যসৌন্দর্য বাড়তে থাকে। মাজারকে ভক্তির নামে যে বিচলিত প্রার্থনা দেখি—আমাদের এই জল-জংলার জীবনের সাথে, প্রতিমা প্রেমের সাথে যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য আছে, তাও লেখক বর্ণনা আর ডায়লগে প্রকাশ করেছেন। তখনও তাঁর বর্ণনাশৈলী রিয়েলিস্টিক ইমেজ ছাড়িয়ে সমন্বিত চৈতন্যপ্রবাহের মায়ায়, জাদুবাস্তবার আলো-আঁধারিতে প্রবেশ করেনি, ভাষার প্রচলিত ধারাবাহিকতাকে তিনি তখনও অস্বীকার করেননি, কিন্তু এখানেও তার বর্ণনার নিজস্ব মাধুর্য ক্ষণে ক্ষণে প্রকাশ পেয়েছে। এরপরই উপন্যাস-সাহিত্যে আছে তাঁর লম্বা গ্যাপ, ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’। এর নামকরণেই আছে দারুণ এক বিষণ্নতা। উপন্যাসটির শুরুতেই শুনব শীতের রাতের জোছনাপ্লাবিত সময়ে মানুষ খুনের কথা। রাত জোছনাময় হলেও তাতেই কাহিনির ভিন্ন এক চরিত্র দাঁড়ায়। সেই রাতে যুবক শিক্ষক বাঁশঝাড়ের দিকে গেলে খানিক অন্ধকার খানিক জোছনার ভেতর এক অর্ধনগ্ন নারীকে মৃত অবস্থায় পায়। ঘটনা পরম্পরায় জানা যায়, যে বাড়িতে শিক্ষক লজিং থাকে সে বাড়ির ছেলে কাদের উক্ত যুবতীকে হত্যা করেছে। পরের রাতে এ লাশটাকে কাদেরসহ নদীতে ফেলে দেয়। পুলিশ তা পায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষককেই আসামি করা হয়। এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে যুবক শিক্ষকের মনে হয়, এ জীবন নিরর্থক। এভাবেই আমরা নিরর্থক জীবনের এক মায়াবী রূপ দেখি। এখানেও ধর্মীয় আচরণ, দরবেশি ভাব এসেছে সামন্ত আবহের দোসর হয়ে। এ এমন এক আচরণ, যে আচরণের ভেতর দিয়ে কাদের তার হত্যাযজ্ঞকে পর্যন্ত জায়েজ করে ফেলতে পারছে! সেই শিক্ষকের প্রকৃত নামটি আরেফ আলী, মাত্র একবার উপন্যাসে ব্যবহার করতে দেখি, সমাজের চাপেই কি তার নামটি পর্যন্ত লোপাট হয়ে গেল? তবে আমরা এ উপন্যাসে যে ভাষাভঙ্গি পাই, এর অন্তর্নিহিত স্পষ্ট যে কথনরূপ দেখি, তা আমাদের চেনাজানা ভাষা থেকে আলাদা। এমনকি ব্যক্তির যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর গড়ে ওঠে, যেভাবে তা বিস্তৃতও হয়, আমাদের চৈতন্যের জগতে তা নতুন মাত্রা যোগ করে। উপন্যাসটির ভেতর একটা হত্যাকাণ্ড তথা হত্যাকারীর প্রতি একধরনের মায়াময় আবহ দেখি, যাতে কখনো কখনো দস্তয়েভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’র কথা মনে পড়ে; এমনকি নানান প্রেক্ষাপটও পরস্পর মিলে যায়। আবার যুবক শিক্ষক যেভাবে জীবনকে অর্থহীনতার জায়গায় আবিষ্কার করে, তাতে যেন আলব্যের কাম্যুর ‘আউটসাইডার’-এর ছায়া দেখা যায়। এমনকি বর্ণনার যে চৈতন্যপ্রবাহ এখানে আছে, তাও আমাদের কাছে একেবারে নতুন। একটা অকালমৃত্যুকেও কতভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তা লেখকের বর্ণনাশৈলীর ভেতর দারুণ সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়। গল্প শেষ হলেও এর রেশ বহু বহু গুণ জাগরুক থাকে। উপন্যাসের অন্তর্প্রবাহ দিয়ে যে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সনাক্ত করতে চাই, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ হচ্ছে এর একেবারে শীর্ষে থাকা সৃজনকর্ম। তবে আলোচনার শুরুতেই বলতে হয়, এর এই দাপুটে দিকটা তেমন আলোচিতই হয়নি। নদীর কান্নার সুররিয়েলিস্টিক ধরন, এর ভেতর দিয়ে অস্তিত্ববাদের বিকাশ, বর্ণনার প্রগাঢ়তাই ক্ষণে ক্ষণে আলোচনায় এসেছে। উপন্যাসটির প্রকাশকালও এক্ষেত্রে বিচার্য একটা বিষয়। এটি ছাপা হয় ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে। ততদিনে সামরিক শাসন আমাদের যাপিত জীবনকে একেবারে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটছে। তখনই আমরা যেন নদীর কান্না শুনি। এ হচ্ছে হাহাকারের এক প্রতিচ্ছবি। আমরা এখানে যে কুমুরডাঙ্গাকে দেখি তা যেন আমাদের এই পূর্ববাংলারই প্রতিরূপ। প্রকৃত অর্থে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাস জগতের এক নিত্যস্মরণীয় নাম, পাঠক যখনই তা পাঠ করবেন, তখনই মনে হতে পারে যে তিনি যেন নতুন করে একটা গ্রন্থ পড়ছেন। একধরনের রাজনৈতিক দর্শন এতে প্রকাশ পেয়েছে। উপনিবেশের ভেতরকার পাকিস্তানি উপনিবেশকে খেয়াল করার বিষয় এখানে আছে। কথাক্রমে আরও বলতে হয়, সাংকেতিকতায় পরিপূর্ণ, রাজনৈতিক আচরণে ঠাসা, ভাষার এমন জাদুমুখর আয়োজন আমাদের কথাশিল্পে খুব একটা নেই। একজন প্রকৃত রাজনৈতিক লেখক আসলে সময়ের উপস্থাপক বৈ কিছু নয়। তিনিও একটা সময়কে এঁকেছেন, মূলত একটা ভাগ্যাহত দেশের ছাপচিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। এ এমনই এক দেশ যার সীমারেখা আসলে নদীআশ্রিত। আমাদের এখন মনে পড়তে পারে, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। আবারও বলতে হয়, কুমুরডাঙ্গা জায়গা নয়, মহকুমা নয়, যেন পূর্ববাংলা! শুধু নদী নয়, তামাম জনপদের কান্না যেন আমরা প্রতীকরূপে পাই। এখানকার জনপদ মানেই দলিত, অবহেলিত, হতচকিত, মধ্যবিত্তের তকমা পাওয়া জাগরণমুখী মধ্যবিত্ত, যার অধিকাংশই মুসলমান। দেশ ভাগ হয়, এলাকা অর্জিত হয়, কিন্তু কান্না নামের পরাধীন অবস্থার অবসান হয় না। অনেক মৃত্যু, যেমন—খোদেজা, মুহাম্মদ মুস্তাফা, তাদের বাবা, কফিলউদ্দীন তথা মানুষেরই ক্রন্দন ক্ষণে ক্ষণে এখানে জমা হয়। নদী, সামাজিক বাস্তবতা, জল-হাওয়া নিয়ে আমাদের উপন্যাস জগত্ ভরপুরই। কিন্তু ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ একেবারে আলাদা এক জীবন যেন; যাকে আমরা অস্তিত্ববাদ, সমন্বিত চেতনাপ্রবাহরীতির এক আকর গ্রন্থ বলতেই পছন্দ করি। আমরা গৃহপালিত কিছু আলাপ-আলোচনা পাই, যেখানে শিল্পের রূপ থাকে, এর ভেতরকার রাজনীতিকে তারা যেন দেখতেই চাই না। অথচ এত স্পষ্ট রাজনৈতিক উপন্যাস আমাদের কমই আছে। দেশভাগ বা রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে লেখার অভাব তো নাই। শিল্প সেইভাবে আছে কি? ‘শিম কীভাবে রান্না করতে হয়’ এমনই অনূদিত উপন্যাসিকা (অনুবাদক : শিবব্রত বর্মন) যা পড়তে থাকলে মনে হতে পারে, এ এক অতি বিনোদনধর্মী রচনা, এতে কথাশিল্পের কীই-বা আছে? কিন্তু এখানেও রাজনীতি আছে, একজন এশীয়র চোখে ফ্রান্স কীভাবে ধরা দিতে পারে তা-ই একটা সিম্বলের সাহায্যে প্রকাশ করা হলো। ‘কদর্য এশীয়’ লেখকের রাজনৈতিক কথকতার চমত্কার সারাত্সার। এখানে এশিয়া আছে, সেই জনপদের একটা এলাকা আছে, যারা এশিয়া মহাদেশের পূর্বাঞ্চলে হয়তো থাকে। লেখকের এইটা হয়তো মুক্তিযুদ্ধের আগে-আগেই লেখা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক বিষয় এখানে আছে। বিশেষ করে আমেরিকার সাথে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সম্পর্ক কেমন হতে পারে, আমাদের বুর্জোয়া দলগুলো কীভাবে আমেরিকার করুণা চায়, তারা নিজেকে কীভাবে একেবারে বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতার স্বাদ নিতে চায়, তা-ই বার বার প্রকাশ পেয়েছে। এটি সেই সময়ের রচনা যখন বিশ্বরাজনীতি কার্যত সমাজতান্ত্রিক আর সাম্রাজ্যবাদী, এই দুই মেরুতে ভাগ ছিল। আমেরিকার পররাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে বোঝা যায়, অন্তত চরিত্রসমূহ বোঝায় যে, তারা তৃতীয় বিশ্বের সাথে মানবিক সম্পর্ক করতে চায়, মানুষের উন্নয়ন ঘটাতে চায়। কিন্তু তাদের কাজ করতে হয় ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে; ফলত, তারা এই দেশের গরিব অবস্থার সাথে সরাসরি মিশে যেতে পারে না। কিন্তু এই দেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা তা পারে। আর যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্যই হচ্ছে সমাজতন্ত্রকে আন্তর্জাতিক আবহ দেওয়ার, ফলত তারাও চিন বা রাশিয়ার সাথে নিগূঢ় সম্পর্ক করতে পারে। কিন্তু লেখকের পক্ষপাত সমাজতন্ত্রের প্রতিই। তবে লেখক অর্থনীতিবাদী আচরণ দিয়ে, শুধু উপরিকাঠামোর পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই, সমাজের প্রতি তাঁর মনষ্কাম দৃঢ় করতে চান না। তাই তো মানবিক বিষয়টা খুব খেয়াল করেন তিনি। এমনকি আমেরিকাও হয়তো একপর্যায়ে মানুষের মানবিক উন্নয়ন চাইতেও পারে, এমনটি কোনো এক চরিত্র জানায়ও! এতে রাজনৈতিক নানান সম্পর্ক, আঁতাত, ওল্টা-পাল্টা কর্মসূচি, ক্ষমতায় থাকার নানান কৌশল যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে তা ভাবতে গেলেও আঁতকে উঠতে হয়। আমলাতন্ত্র, মিলিটারি, ক্ষমতাসীন দল, বড় দেশের সাথে তাদের সম্পর্কের যে নিবিড় বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, যেন স্বাধীন বাংলাদেশের সবকটি অতি বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আগাম ইশারাও তার কাছে ছিল! মুক্তবাণিজ্য, পুঁজির বেপরোয়া আচরণ নিয়ে অনেক কথাবার্তা আছে। সর্বোপরি মানুষের স্বোপার্জিত স্বাধীনতার ওপর জোর এত দিয়েছেন যে, এর ভেতর দিয়ে তিনি যেন বিকল্প এক স্বাধীনতার পথ দেখালেন। তিনি যেন সৌন্দর্যমুখর সাম্যের চরম-আকাঙ্ক্ষা, মানবপ্রেমী নৈরাজ্যবাদ, কিংবা যন্ত্রসভ্যতার সাথে প্রকৃতিবাদকে মিশিয়ে দেওয়ার নতুন ধ্বজাধারী হয়েও উঠলেন! আমরা তার ৫টা উপন্যাসকে বিবেচনায় নিয়ে বলতে পারি যে, এর ভেতর দিয়ে সাংস্কৃতিক সত্য উন্মোচিত হয়েছে, তা আর কারও লেখায় অত জোরালোভাবে নেই। তিনি প্রকৃতই রাজনৈতিক ঔপন্যাসিক। মানুষের নানান আচরণ নানাভাবে তাঁর উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। আমরা তাঁর প্রায় উপন্যাসেই এক-একটা নারীমৃত্যু দেখি। ‘লালসালু’র জমিলা, ‘চাঁদের অমাবস্যা’র যুবতী, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র খোদেজা, ‘কদর্য এশীয়’র তিন্নি—এইসব মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তিনি মৃত্যুচিহ্নিত জীবনকে শুধু দেখাননি (তাঁর এসব মৃত্যু যেন বিকল্প এক জীবনসত্তাকে চিনিয়ে দিয়ে রাখলেন—যারা ঈশ্বরনির্ধারিত সহজাত মৃত্যুর প্রতিস্পর্শী হয়ে উঠেছেন!), বরং মানুষের জীবনতৃষ্ণা, প্রেমের স্বতঃপ্রণোদিত ধারাকেই স্পষ্ট করেছেন। তাদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধই বড় বিষয়। তাঁর উপন্যাসমূহের ভেতর দিয়ে অস্তিত্ববাদ, চেতনাপ্রবাহ, ভাষার মাদকতা তো আছেই, এর ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের এই জনপদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকেও যেমন চিনে নিতে পারি, তেমনি প্রকৃত রাজনৈতিক বাস্তবতাও আমরা লালন করার বাসনা করতেই পারি। তিনি কিছু সত্য ক্রমাগত নির্মাণ করেছেন, রাজনীতিমুখর গল্প বলে গেছেন, যা একেবারে নিজের কায়দা সৃজিত। রাজনীতিকে আশ্রয় করে সেই গল্পে থ্রোতে আমরা একটা সময়কে যাচাই-বাছাই করতে পারি।