জাপানি ঐতিহ্য, পাহাড় এবং নদীকে ঘিরে বেড়ে ওঠা টয়োমি হোশিনার কাজ আমাদের সত্যিকার অর্থেই নতুন রূপকথার গল্প দেখাল। কলোনিয়াল শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ যারা নিয়েছেন একই সাথে শিল্পান্দোলনের ধারাগুলো সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল আছেন, তারা জানেন গুরু শিল্পীদের কাজের প্রভাব অতিক্রম করে নতুন চিত্রভাষ্য সৃষ্টি করা কতটা দুরূহ। আর সে যদি হয় জাপানের মতো ঐতিহ্য সম্বলিত কোনো দেশের শিল্পী! নিজ ঐতিহ্যের ঘ্রাণ বজায় রেখে আধুনিক চিত্রকলা নির্মাণের মধ্য দিয়ে স্বাতন্ত্রিক ধারার সৃষ্টি করা এটা হোশিনা পেরেছেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। হোশিনার কাজে বর্ণমালার ব্যবহার এসেছে, এটা তাঁদের ট্র্যাডিশনাল পন্থা। এই রীতি প্রায় প্রত্যেক জাপানি শিল্পীরাই ব্যবহার করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—চিত্রভাষার পাঠোদ্ধার প্রায় সর্বজনীন সক্ষমতা। কিন্তু ভাষা পাঠের নয়। জাপানি ভাষার ধরন রৈখিক। চিত্রাত্মক না। এই দুই ধরনের মিশেল হয় না। আবার সচেতন অথচ ভাষা না জানা দর্শকদের কৌতূহলও নিবারণ হয় না। বোধ করি এই দিকটা বর্তমান সময়ের জাপানি শিল্পীরা অনুধাবন করবেন।
টয়োমি হোশিনার কাজ বিবিধ প্রশ্নে আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। আন্তর্জালিক বাস্তবতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের সার্বিক জীবন-যাপনের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে শব্দময় জগত্ ঘিরে। সেখানে চিন্তার সুযোগ, সৃষ্টির প্রেরণা দারুণভাবে ব্যাহত করে ধ্যানমগ্নতার উদ্যাপন। লক্ষ করলে দেখা যাবে তার কাজের বিষয়বস্তুর ভেতর এই দাবি আছে। ‘যখন শব্দ নিঃশব্দকে খাবে’, ‘মেমোরি অব এ বোটানিক্যাল গার্ডেন’ কিংবা ‘সাইলেন্স’ শিরোনামের কাজগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। পাহাড়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা, সবুজের ভেতরে হলুদ, যা স্বভাবতই শব্দ উত্পাদন করে। কিন্তু তারপর নিস্তব্ধতা নেমে আসে করুণ উপত্যকায়। এখানে ‘সাইলেন্স’কে মূর্ত করে তুলতে শ্রবণেন্দ্রিয় ‘কান’কে প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা গ্রহণ করে শব্দ এবং আমদের সচেতন করে তোলে। কিন্তু বিষয়টা এই শব্দ যা গ্রহণের জায়গায় নেই, পরিত্যাগ করেছে অর্গানিক প্রবণতা। কর্ণকুহরের কালো আর তার ফর্মের পেছনকার পটভূমি এই দুই মিলে নিস্তবদ্ধতা আরও বেশি ঘনীভূত করে তোলে চিত্রের আবহাওয়া। ‘সাইলেন্স’ এই ছবিগুলোর সাদা জমিন আশ্বাস প্রদান করে শুভ্রতার যা আমরা আদি শূন্যাবস্থার মধ্যে দিয়ে ফিরে পেতে পারি। ডোবার ভেতর নিজের প্রতিচ্ছবি, পাথরের কাছে, জঙ্গলের কাছে তিনি অনেক গল্প করেছেন, কিন্তু যার কোনো উত্তর নেই। তবু তাঁর গল্পবলা কিন্তু থেমে নেই। এই ছবির ধরনগুলোর ভেতর পূর্বেই বলেছি জাপানি ঐতিহ্যের ছাপের সাথে কখনো ইম্প্রেশনিস্ট কখনো অন্তর্গত এক্সপ্রেশন এসে মূর্ত হয়েছে। আলোর বিচ্ছুরণের মধ্যে রং ইথার বা কম্পন, টানটান সুতার ভেতর দিয়ে টেনশন এই সবের পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতিকে জৈবসত্ত্বার মধ্যে দিয়ে অনুধাবন করার প্রবণতা। মিনিমালিজমের ছোঁয়াও কোথাও কোথাও পরিলক্ষিত। এইসব ছবির মধ্যে ‘রেড গ্লাস ফলিং’, ‘ব্লোয়িং কালারর্স’, ‘রেড স্ট্রিং অব ডেসটিনি’, ‘এ থাউসেন্ড হ্যান্ড’ এবং ‘রেইনিং’ অন্যতম। ‘টু স্টোরি লাইন ফর এন ইন্সটলেশন’। এই ছবিতে পুড়ে ছাই হওয়া পাহাড় আর অন্য পাশে তিনটি ফিগারের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যঞ্জনা এবং ফিগারগুলো পলকা ভাব গল্পটাকে বিভাজিত করেছে এমন এক মাত্রায় যেটা ঠিক ইলাস্ট্রেশনধর্মী নয়। ‘সোয়ারিং ফ্যালাওয়ার্স’ মূলত মেটামরফোসিস ওয়ার্ক। প্রতীকায়িত ফুলের স্বচ্ছতা এবং এর জৈবগুণাগুণ নিয়ে আকাশে উড্ডীন শিশু। নিচে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধতার রেখা। ‘প্যাটেলস ইন দ্য এয়ার’ এই ছবিগুলোর আবহও তা-ই। পাপড়িগুলো আকাশে উঠে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে। বস্তুর থেকে বিষয়ের বিচ্ছেদ ঘটে যাচ্ছে। এইসব বাসনাগুলোতো শিল্পীর নিজস্ব ব্যাক্তিত্বকেই হাজির করে আমাদের সামনে। কালেকটিভ সেন্স এবং আনকনশাসনেসের ভেতর প্রায় প্রত্যেক জাপানি শিল্পীর ভেতরই কাজ করে হিরোশিমা নাগাসাকির স্মৃতি। সেখান থেকেই পেইন্টিংগুলোতে নিঃসঙ্গতা এবং পুড়ে যাওয়া পটভূমির উত্পত্তি। অনেকগুলো ছবির ভেতর পোর্ট্রেটগুলোই যার সাক্ষ্য বহন করছে।
‘হিয়ার ইজ দেয়ার-দেয়ার ইজ হিয়ার’ বা ‘এখানেই সেখানে-সেখানেই এখানে’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী চলছে ধানমণ্ডিস্থ বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে। বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সাথে বাংলাদেশের দর্শকদের পরিচিত করানোর উদ্যোগটি সত্যিই প্রশংসিত। ১৭ আগস্ট শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৫ আগস্ট ২০১৩ পর্যন্ত।
