মজমা

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৩, ১৯:২৯
জায়গাটা বড়ই পছন্দ রশিদ মিয়ার। গুলিস্তান বলে কথা। ১২ সন্ন্যাসীর পদভারে মুখরিত। সপ্তাহের দু-দিন এখানে মজমা বসায় রশিদ মিয়া। বেচাবিক্রি ভালো হয়। তবুও প্রতিদিন বসে না। বসতে পারে না। তার মতো একই পেশায় আরও অনেক লোক আছে। একটা সমঝোতার মাধ্যমে একেক দিন একেকজন বসে। আজ রশিদ মিয়ার সিডিউল। সময় বরাদ্দ দুই ঘণ্টা। এরপর আবার অন্যজন বসবে। যত তাড়াতাড়ি মজমাটা জমানো যাবে, ততই মঙ্গল। সহকারী হিসেবে চারজন লোক আছে রশিদ মিয়ার। একজন ভ্যানের ড্রাইভার হারুন। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর ডিউটি শেষ তার। এরপর অলস সময় কাটায়। কিছুক্ষণ পরপর চা-সিগারেট। মজমায় হারমোনিয়াম বাজায় যে ছেলেটি তার নাম মিস্টার। খুব ভালো বাজায়। গানের গলাও ভালো। ঢোল বাজানোর দায়িত্ব বাবরি চুলওয়ালা আবুলের। সেও ভালো বাজায়। বাজাবার সময় তালে তালে যখন মাথা নাড়ে, তখন বাবরি চুলগুলো দোল খায়। শরীরটাকে হেলেদুলে নাচায়। বড় সুন্দর লাগে দেখতে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাবু। অতুলনীয় কণ্ঠ। স্রষ্টা যেন আলাদা মাধুর্য দিয়ে রেখেছেন তার গলায়। সে যখন গানের সুর ধরে, তখন যে-কেউ একবার হলেও থমকে দাঁড়ায়। সংগীতের অ-আ কিছুই জানে না। অথচ যেকোনো সুর একবার শুনলেই অবিকল সে রকম গাইতে পারে। রশিদ মিয়া তাকে পিচ্চি বলে ডাকে। এ নামে ডাকার অবশ্য একটা কারণও আছে। বয়সের তুলনায় শরীরের গঠন খাটো আকৃতির। বয়স চোদ্দ-পনেরো হলেও দেখে মনে হয় নয়-দশ। ভ্যান গুলিস্তানে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে এসে থামে। রশিদ মিয়া বাবুকে উদ্দেশ করে বলে, ‘ওই পিচ্চি, নামা মালপত্তর সব নামা। তাড়াতাড়ি কর।’ বাবুকে উদ্দেশ করে মালপত্র নামাতে বললেও সকলে মিলেমিশেই মাল নামায়। মাল নামানো শেষ হলে রশিদ বলে, ‘পিচ্চি ধর। শুরু কর। আমি এক কাপ চা খাইয়া আহি।’ ‘ওস্তাদ, আমিও এক কাপ চা খাইতাম। গলাটা কেমন খুসখুস করতাছে।’ ‘অই পুংগির পুত, চা তোমার পুটকি দিয়া হান্দাইয়া দিমু। কাম থুইয়া খালি খাই খাই।’ ‘পদাইয়েন না ওস্তাদ।’ ‘না, তোমারে চুমা দিব। চা খাইবা, ট্যাকা দিব তোমার কোন বাপে?’ ‘বাপ তুইল্যা কথা কইয়েন না, ওস্তাদ। বাপ থাকলে আপনের কাছে আওন লাগত না। আর মাগনা চা খাইতে চাই নাই।’ ‘আরে হমন্দির পুত, বীচি মনে অয় বাত্তি অইয়া গ্যাছে? মাগনা যহন চাও নাই তয় দে ট্যাকা দে, দেহি বীচির ঝাল কত?’ ‘ট্যাকা থাকলে আপনের কাছে চাইয়া এত কতা হুনতাম না। আপনের কাছথন ট্যাকা দিয়া চা খাইওয়াইবেন।’ ‘ক্যান, আমি খাওয়ামু ক্যান? আমি কি তোমার বইনের জামাই লাগি?’ ‘কতা বালা কইরা কন ওস্তাদ। চা খাওনের ট্যাকা বেতন থাইক্যা কাইটা নিবেন।’ ‘মজমাডা আগে জমা, তারপর দেখমু কত চা খাইতে পারছ।’ রশিদ মিয়া চলে যায়। বাবু তার পথের পানে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আশপাশে তাকায়। ছোট একটা বাক্স হাতে নেয়। সঙ্গীদের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তৈরি হতে বলে। ছোট বাক্সটা মাটিতে রেখে তার সামনে হাঁটুভেঙে বসে বাবু। বাক্সের ঢাকনাটিতে কিছুক্ষণ পরপর বাড়ি দেয়। তাতে ঠকঠক শব্দ হয়। চলন্ত লোকজন ফিরে তাকায় তার দিকে। বাবু সুর ধরে—আ...হা... মাঝখানে সুর থামিয়ে কথা বলে। আবার সুর ধরে। এটা লোক জমানোর কৌশল তার। আ... হা... কী সাপে দংশিল লখাইরে... ও বিধির কি হইল। সুর থামিয়ে কথা বলে, ‘এই থাম থাম, আস্তে, আস্তে। সাবধান।’ ধীরে ধীরে একজন-দুজন করে লোক জমতে থাকে। বাবু আকৃষ্ট করার জন্য লোকের উদ্দেশে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করে। কখনো গানে সুর ধরে। আবার কথা বলে। আ... হা...। কী সাপে দংশিল লখাইরে... এই... আস্তে আস্তে, সাবধান। ভাইজানেরা একটু সইরা খাড়ান। গান শোনেন, সাপ দেখেন। কোনো সমস্যা নাই। আপনেরা যতক্ষুন আছেন, ততক্ষুন গান চলব। আমার হাতে এই যে বাক্স দেখতাছেন, এর ভিতরে আছে মা মনসা। মা-রে আমি লগে লগেই রাহি। কারণ মার শুভদৃষ্টি যার ওপর পড়ে, তার আর কিছু লাগে না। বাইর কইরা আপনে গো দেখাইতাছি। হয়তো বলবেন ওই ব্যাটা, এইডা তো সাপ! হ সাপ! তয় সাধারণ কোনো সাপ না। তুচ্ছতাচ্ছিল্যে এমনও বলবেন, সাপ তো সাপই। এর আবার সাধারণ-অসাধারণ কী? আছে, ভাইজান আছে। এইটা একটা অসাধারণ সাপ। আমার ওস্তাদ এই সাপটা আনছে কামরুপ কামাখ্যা থাইক্যা। অনেকে হয়তো বলবেন কামরুপ কামাখ্যা থাইক্যা আনুক, নাইলে আফ্রিকা থাইক্যা আনুক তাতে আমাদের কী? আছে; আপনাগো দরকার আছে এই সাপ। বলবেন কেন? তয় হোনেন। তবে প্রত্যেকের কাছে হাতজোড় কইরা, পায়ে ধইরা মিনতি করতাছি, প্রত্যেকে প্রত্যেকের পকেট সাবধান রাইখেন। জায়গাটার নাম গুলিস্তান। বারো ভূতের আছর এইহানে। হরেক রকম মানুষের চলাফেরা। যেইহানে ১০টা ভদ্দরলোক থাহে, সেইহানে দুই-একজন ডবল ভদ্দরলোকও থাহে। আপনেরা আমার গান শুইন্যা খুশিতে হাসবেন—হে... হে... হে...। আর ডবল ভদ্দরলোকরা পকেটে আঙুল হান্দাইয়া দিয়া কইব হো... হো... হো। পরে আমারে পিডাইয়া যদি আম-রক্তও বাইর কইরা ফালান, এক পয়সাও পাইবেন না। কাজেই পকেট সাবধান। সাপ দেখেন, গান শোনেন। আ... হা...। এই রাখ, রাখ, সাবধান। ওই যে কী সাপে দংশিল লখাইরে... অ্যা... ও বিধির কী হইল... যা কইতাছিলাম, ভাইজানেরা। এই সাপটা সাধারণ সাপ না। এর নাম সুতানালি। বেহুলার বাসরঘরে এই সুতানালিই লক্ষিনধররে কামড়াইছিল। এই সুতানালি আপনার ভবিষ্যত্ বলে দিতে পারে। গণনা করতে পারে ভাগ্য। আপনের মনের আশা পূরণ হইব কি হইব না, তা বইলা দিতে পারে। বলবেন—কীভাবে? কইতাছি, হোনেন—আপনি মনে মনে নিয়ত কইরা পাঁচ ট্যাকা দশ টাকার নোট হাতে রাখেন। যদি সুতানালি আপনের হাতে ট্যাকার ওপর নাইম্যা না আসে তবে বুঝবেন আপনের মনের আশা পূর্ণ হইব না। আর সুতানালি যা ছোঁয় না, তা আমার জন্য হারাম। আর যদি নাইম্যা আসে, তয় ওই ট্যাকা আমি নিমু। এহন কথা হইল—ট্যাকা নিয়া কি আমি খামু? আমার মায়েরে খাওয়ামু? আমার ভাইবোনরে খাওয়ামু? না কি আমার বউরে খাওয়ামু? দর্শকদের মাঝে হাসির রোল পড়ে। গুঞ্জন ওঠে—একটুখানি পোলা। নাকে টিপ দিলে এখনো দুধ বাইর হইব। মাল কত্ত চালু দেখছেন? নাক-মুখ-চোখ—এমনকি ‘ওইদিক’ দিয়াও কথার খই ফুটতাছে। একজন অন্যজনকে আঙুল ইশারায় ‘ওইদিক’ দেখায়। তা দেখে আরেকজনের মন্তব্য আরও সরস। মুখ থেকে মুখে ফুটপাতের ভাসা কথা ভেসে বেড়ায়। ইতিমধ্যে বেশ লোকসমাগম হয়েছে। ভিড়ের মধ্য থেকে বাবুকে উদ্দেশ করে একজন বলে, ‘আবে, ওই হালার পুত, বউয়ের কথা যে কইলি, ... গোড়ায় লোম জ্বালাইছে কি না চাইয়া দেখছস?’ জিহ্বায় কামড় দেয় বাবু। কান ধরে বলে, বেয়াদবি মাপ করবেন জনাব। আমি ভুইল্যা গেছিলাম এইটা গুলিস্তান। আমার ভুল হইছে। আমি এহনও পোলাপান। বিয়ার বয়সই হয় নাই। বউ পামু কই। জোসের ঠেলায় কইছি। সিলিপ অপ ট্যাঙ! মাপ কইরা দিয়েন। তয় যা কইতেছিলাম, জনাব। এই ট্যাকা নিয়া আমি কী করমু? এই ট্যাকা আমিও খামু না, কাউরে খাওয়ামুও না। এই ট্যাকা এই সাপের খাওনে খরচ করুম। দুধ-কলা কিনুম। তবে সবার কাছে যামু না। সুতানালির ছোঁয়া সবার ভাগ্যে জোটে না। দুই-চারজনের জোটে। তয় মনে রাখবেন, ট্যাকা দিলেই সাপ আপনার হাতে নাইম্যা আসব না। যদি আপনের মনের আশা পূরণ হয়, তবেই নামব। আর মনের আশা পূরণ না হইলে পাঁচ-শ ট্যাকা দিলেও সাপ নামব না। বিশ্বাস না হলে কোনো ভাই মাত্র দশটি ট্যাকা দিয়া মা মনসাকে পরীক্ষা করে দেখেন। আছেন কোনো বাপ-ভাই, কোনো বন্ধু, মাত্র দশটি ট্যাকা দিয়া পরীক্ষা করবেন আমার সুতানালিকে? রশিদ মিয়া মজমার পেছনে দাঁড়ানো। তিনি সব শুনছেন। বাঙালির চরিত্র তিনি জানেন। হুজুগের পাগল। কোনো একজন হাত ওঠালেই কেল্লাফতে। ঝাঁপিয়ে পড়বে বাকিরা। রশিদ মিয়া দলের একজনকে ইশারা দেয়। সে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হাত ওঠায়—আছি। আমি আছি। আমি পরীক্ষা করব তোর সুতানালিকে। ধন্যবাদ, ভাইজান। আমার এক ভাই আমার সুতানালিকে পরীক্ষা করতে আগাইয়া আইছে। আমি অনেক খুশি। আহেন ভাইজান, সামনে আহেন। লোকটি সামনে এগিয়ে আসে। পকেট থেকে এক-শ টাকার নোট বের করে হাতে রাখে। বাবু সাপ নিয়ে এগিয়ে যায় তার কাছে। বলে—হে সর্পকুলের রাজা, হে সুতানালি মা মনসার দোহাই, আমার এক ভাই তোমার দুধ-কলার জন্য এক-শ ট্যাকা দিতে চায়। সে বড় আশা করে আইছে। তুমি দেখো তার মনের আশা পূর্ণ হইব কি না? নামো, তার হাতে নাইম্যা আসো। তার দেওয়া সম্মান গ্রহণ করো। সাপের কাছে অনুনয়-বিনয় করে বাবু। কাকুতি-মিনতি করে নেমে আসতে বলে। সাপ নামে না। কারণ যখনই সাপটিকে হাতের ওপর নামায় তখন বাবু নাভিতে জোরে চিমটি কাটে। ব্যথায় সাপ ফিরে আসে। এভাবে বারবার লোকটির হাতের ওপর ছেড়ে দেয়। কিন্তু সাপ বারবারই ফিরে চলে আসে বাবুর হাতে। কিছুতেই লোকটির হাতে যায় না। বেশ কয়েকবার বাবুর কাকুতি-মিনতির পরও যখন সাপ লোকটির হাতের ওপর নামে না, তখন বাবু ফিরে আসে তার আগের জায়গায়। দর্শকদের উদ্দেশ করে বলে, ‘দেখলেন তো। একটা বোবা প্রাণী। অতি তুচ্ছ একটা প্রাণী। আমরা যাকে হেলাফেলার চোখে দেখি। ভদ্দরলোক এক-শ ট্যাকা দিতে চাইলেন। কিন্তু সুতানালি নিল না। দুঃখিত ভাইজান। আপনার মনের আশা পূরণ হইব না।’ লোকটি আরও একবার চেষ্টা করার অনুরোধ করে। বাবু আবার সাপ নিয়ে এগিয়ে যায় লোকটির কাছে। হাতের ওপর নামাতে চায় সাপটিকে। কিন্তু সাপ নামে না। জোর করে লোকটির হাতে সাপকে ফেলে দিলেও সে ফিরে আসে। বাবু বলে—দুঃখিত, ভাইজান। মাপ করবেন, হবে না। এইটা মানুষ না। মানুষের লোভ থাকতে পারে। কিন্তু সাপের নাই। তারচেয়ে অন্য কোনো ভাইয়ের কাছে যাই। এসব দেখে অন্য একটি লোক আগ্রহ দেখায়। তিনি একটি দশ টাকার নোট হাতে নেয়। বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘দেখো তো, বাবা আমারটা নেয় কি না।’ সাপ এই লোকটির হাতের টাকায়ও নেমে আসে না। যতবার চেষ্টা করে ততবারই ফিরে আসে। বাবু দুঃখ করে বলে, ‘মাপ করবেন, আপনার টাকাও নেবে না।’ এবার বাবুর গতি বাড়ে। ওভার চার্জ ব্যাটারিতে। মোটামুটি ধমকের সুরে বাবু জোর দিয়ে বলে, ‘এরপরও বিশ্বাস হয় না? দেখলেন তো দুই ভাই ট্যাকা দিতে চাইলেন কিন্তু সুতানালি নিল না। আপনার ট্যাকা নিব এরও কোনো গ্যারান্টি নাই। সুতরাং আপনেও চেষ্টা করে দেখতে পারেন।’ উপস্থিত লোকদের মনে বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। একে একে অনেকেই এগিয়ে আসে পাঁচ-দশ টাকা নিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, এরপর যতজন টাকা দিতে চেয়েছে, প্রত্যেকের টাকাই সাপ গ্রহণ করে। এ সুযোগে বাবু প্রায় তিন-চার শ টাকা পকেটস্থ করে। এরপর সাপ ও টাকা পকেটে রেখে বলে, ‘গান শোনেন। আইজক্যা প্রাণ ভইরা গান শোনামু আপনে গো। তয় আগে যা কইছিলাম, ওই কথাটা আবারও স্মরণ করাইয়া দিতে চাই। যার যার পকেট সাবধান। বাবু সুর ধরে—‘বিধি কলমে নাই কালি.../ আমারও কপালে এত দুঃখ লেইখ্যাছিলি রে.../ কলমে কি নাই কালি রে...’ এই সময়ে প্রবেশ করে রশিদ মিয়া। বাবুকে ধমক দিয়ে বলে, ‘ওই পিচ্চি থাম, থাম। বাকিডা আমি কই।’ বাবুর কাছ থেকে সুর কেড়ে নেয় রশিদ মিয়া। বলে, ‘কী সুন্দর সুর। কী সুন্দর কথা।’ ‘কথাডা কী? কলমে নাই কালি! কলমের কালি গেল কই? কীভাবে শেষ করলেন? কী লেইখ্যা শেষ করলেন কালি? মনে পড়ে? পড়ে না। এহন বিধির দোষ দেন? এই কালি কি বিধি শেষ করছে? না কি আপনের দোষে শেষ হইছে? কি, কথা কন না ক্যান? উত্তর দেন। কলমের কালি কীভাবে শেষ করলেন? ওই মিয়ারা, কথা কন।’ উপস্থিত লোকজনকে প্রশ্ন করে রশিদ মিয়া। ধমক দেয়। লোকজন কথা বলে না। দু-একজন একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। মনে মনে বলে, ‘ওই ব্যাটা, কলমে কালি নাই এই কথা তো আমরা কই নাই। কইছে তোর পিচ্চি। ধমকাইলে ওরে ধমকা, আমাগো ক্যান?’ লোকজন চুপ। কেউ কথা বলে না। রশিদ মিয়া এই সময়টির জন্য অপেক্ষা করে। এরপর বলে, ‘চুপ কইরা আছেন ক্যান? কন, উত্তর দ্যান। কলমের কালি গেল কই? কইতে পারেন না? নাকি কইতে শরম পাইতাছেন। তয় আমি কইয়া দেই। নতুন কলম। কিন্তু লেখনের খাতা নাই। কী করছেন? এই কলম দিয়া তহন ঘরের দেওয়ালে লেখছেন। লেখছেন মাটিতে, বেঞ্চে। বাথরুমে যে কত আল্লা মালুম। ভেজা লুঙ্গি চিপড়াইলে পোলাপান চিত্কার কইরা ওঠে—শোনতে পান? এইভাবে লেখতে লেখতে ব্যাটারি ফিউজ। এহন খাতা হাতে পাইছেন কিন্তু কালি শেষ। কিংবা কলমের মাথা ভোঁতা হইয়া গ্যাছে। খাতায় লেখতে চাইলেও পারেন না। কখনো কালি বাহির হয়, কখনো হয় না। আবার কখনো কালি দিয়া ছেতরাইয়া যায়। হাত নষ্ট হয়, খাতা নষ্ট হয়। লেখা আর হয় না। লেখার নামে ঠনঠন। খালি গোলপোস্ট পাইয়াও আউট থ্রো কর্নার—গোল আর হয় না। গোলের খেলায় গোল দিতে না পারলে কোনো মূল্য আছে? নাই। আমি পায়ে হাত রাইখ্যা কই—যদি তা-ই হয়, তবে বাজারে একটা কুত্তার মূল্য আছে কিন্তু আপনার নাই। উপায়-অন্তর নাই দেইখ্যা এহন গান ধরছেন। কী গান? বিধি কলমে নাই কালি/ আমারও কপালে এত দুঃখ লেইখ্যাছিলিরে.../ কলমে কি নাই কালিরে। নিজের দোষে দোষী হইয়া এখন বিধির দোষ দেন। লজ্জা করে না বিধির দোষ দিতে? না কি কালির সাথে সাথে বিবেক-বুদ্ধিও গিল্যা খাইছেন? কন, কথা কন। উত্তর দেন। জানি উত্তর নাই আপনাগো কাছে। আমার কাছে আছে। একটু অপেক্ষা করেন, আমিই এর উত্তর দিয়া দিব। গান শোনেন। তবে পকেটটা সাবধান। ওই পিচ্চি ধর, গান ধর।’ রশিদ মিয়া বিরতি দেয়। সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা। একটু পানি খায়। গলা শুকিয়ে গেছে তার। বাবু গান ধরে, ‘বিধি কলমে নাই কালি/ আমারও কপালে এত দুঃখ লেইখ্যাছিলি রে.../ কলমে কি নাই কালিরে। ’ গানের পরের কলিতে যেতে পারে না বাবু। হাত-ইশারায় তাকে থামায় রশিদ মিয়া। আবার শুরু করে, ‘কী যেন বলছিলাম? পাশ থেকে পিচ্চি মনে করিয়ে দেয়—কলমের কালির কথা। হ হ, কালি। কালি গেল কই? তার আগে বেয়াদবি মাফ করবেন। আমার একটা ভুল হইয়া গেছে। এই ভরা মজলিসে উপস্থিত দর্শক ভাইয়ের মধ্যে যারা হিন্দু তাদের প্রতি নমস্কার। খ্রিষ্টান ভাইদের গুড আফটারনুন। আর মুসলমান ভাইদের জানাই আসসালামু আলাইকুম। যা বলছিলাম, ‘কলমের কালি গেল কই। কীভাবে শেষ হইল? আপনেরা কেউ এর উত্তর দিতে পারলেন না। কিংবা পারলেও লজ্জা-শরমে কইতে পারতাছেন না। দু-একজন আবার কিছুই বোঝেন নাই, এমনও হইতে পারে। তাই আরও বুঝাইয়া কই। কলম বলতে এইহানে আপনের যৌবনকে বুঝানো হইছে। আর কালি হইলো...’ শেষের বাক্য বলার সময় রশিদ মিয়া সুর করে বলে। মুখ বিকৃত, চোখ বন্ধ এবং অদ্ভুত কসরত শরীরের। সঙ্গে কোমর দুলিয়ে মুখে শব্দ করে ই... ই... য়া। উপস্থিত দর্শকরা তাতে মজা পায়। তারা মিটিমিটি হাসে। মজলিসের চারপাশে গুঞ্জরণ। রশিদ মিয়ার মজমা জমে ওঠে।