শিল্পকর্মের মাধ্যমেই শিল্পীর পরিচয় তৈরি হয়। শিল্পস্রষ্টা মানুষটি অনেক সময় সৃষ্টির অন্তরালেই থেকে যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের চিরন্তন আগ্রহ থাকে ওই শিল্পীর প্রতি। থাকে তাঁর ব্যক্তিসত্তার সাথে যোগাযোগের নির্মোহ চেষ্টা। শিল্পীর সেই ব্যক্তিসত্তাকে তুলে ধরতেই কোনো কোনো শিল্পী আবার নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তেমনি বর্তমান প্রজন্মের আলোকচিত্রী ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি চেষ্টা করেছেন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিনের ব্যক্তিসত্তাকে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে। এজন্যই রংতুলির এই জাদুকরকে ক্যামেরার পিক্সেলের মাধ্যমে স্থিরচিত্রে ধারণ করে চলেছেন দীর্ঘ সাত বছর যাবত্, সুনিপুণ নিষ্ঠার সাথে। আর সেই স্থির চিত্রের উল্লেখযোগ্য প্রায় অর্ধশত আলোকচিত্র নিয়ে ‘শাহাবুদ্দিন :দ্য পেইন্টার, দ্য ফাইটার’ শিরোনামে এক প্রদর্শনী হয়ে গেল গত ৮ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে।
প্রদর্শনীতে সর্বমোট ৪২টি ফ্রেমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের ব্যক্তি জীবন; কখনও তাঁর কর্মের মাঝে, অবসরে, পারিবারিক আবহে কিংবা আটপৌরে জীবনাচরণে। ৪২টি ফ্রেমের মধ্যে ১১টি বাঁধাই করা হয়েছে কাচের ফ্রেমে। এদের মধ্যে ১০টি ছবির সাইজ হলো ২০ বাই ৩০ ইঞ্চি আর বাকি ছবিটি অনেকগুলো ছবির কোলাজ-সমৃদ্ধ। যার আকার ২০ বাই ৪৫ ইঞ্চি। প্রদর্শনীর অন্যান্য ছবিগুলোর সাইজ ৮ বাই ১২ ইঞ্চি। এ ছবিগুলো কালো মাউন্টে, কালো কাঠ ফ্রেমে আবদ্ধ। আলোকচিত্রী ইফতি জানাচ্ছিলেন, ৪২টি ফ্রেমের মূল কারণ হলো আমাদের স্বাধীনতার ৪২ বছরকে বোঝানোর জন্য। কারণ, শিল্পী শাহাবুদ্দিন একজন মুক্তিযোদ্ধা। আর তাই একজন যোদ্ধা আর শিল্পীর সত্তাকে সম্মান জানতেই এই ৪২টি ফ্রেমের অবতারণা করা হয়েছে।
আলোকচিত্রী তাঁর ক্যামেরার সেন্সরে শিল্পী শাহাবুদ্দিনকে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন্ন আঙ্গিকে। কখনো সরলতা, কর্মে নিমগ্ন, কিছুটা ছন্নছাড়া, কাজের প্রতি ব্যগ্রতার প্রতিমূর্তি হিসেবে কাচাপাকা মিশেলের বাবড়ি চুলের চিত্রশিল্পীর এরূপ স্থিরচিত্র দর্শকদের নিশ্চিতরূপে শিল্পীর প্রতি আগ্রহের মাত্রায় এক নতুন দ্যেতনা দান করেছে। ৮টি সাদাকালো ছবি বাদে প্রতিটি আলোকচিত্রেই রংয়ের মাধুর্য পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে রংয়ের প্রতি আলোকচিত্রীর যেমন দুর্বলতা প্রকাশিত হয় তেমনি চিত্রশিল্পীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও পরিলক্ষিত হয়। শিল্পী শাহাবুদ্দিন ষাট বছর অতিক্রম করলেও তার পরনে দেখা যায় লাল, সবুজ কিংবা গোলাপি রংয়ের পোশাক। এতে সহজেই অনুমেয় যে, শিল্পীর বয়স বাড়লেও মনে মনে তিনি আজও তরুণ; চেতনায় তারুণ্যদীপ্ত জয়োল্লাস। তাইতো আলোকচিত্রে দেখা যায়, তাঁর ভ্রমণসঙ্গী বা কর্মসঙ্গীর অধিকাংশই বয়সে নবীন। এক্ষেত্রে চিত্রশিল্পীর কাজের মধ্যেও রং আর তুলির আঁচড়ের পড়তে পড়তে খুঁজে পাওয়া যাবে তারুণ্যের জয়রথ।
আলোকচিত্রী ইফতি শিল্পী শাহাবুদ্দিনকে প্রকৃতির মাঝে নানা রূপে ফ্রেমবন্দি করেছেন। কখনো সবুজ গাছগাছালিময় পরিবেশে, কখনো বা নদীর তীর, নৌকার ছইয়ের ওপর আবার কখনো গ্রামীণ মেঠোপথে। একটি সিলিউট ছবিতে দেখা যায়, মাথার ওপর চাঁদ নৌকার ছইয়ের ওপর শিল্পী শাহাবুদ্দিন আর সাথে বিখ্যাত পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফার নাসির আলী মামুন। এমন মায়াময় পরিবেশে দুই মাধ্যমের দুই প্রথিতযশা শিল্পীকে ক্যামেরাবন্দি করে ইফতি আসলেই মুনশিয়ানার ছাপ রেখেছেন। অন্য দিকে চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিনের ছবি আঁকার স্টাইলটাও দর্শকদের ভাবনার জায়গা নাড়া দেবে নিশ্চিত। কেননা শিল্পী খালি গায়ে একটি শর্টপ্যান্ট পরে প্রায় নৃত্যরত অবস্থায় ছবি এঁকে চলেছেন বিশাল ক্যানভাসে। আলোকচিত্রের কোলাজের ছবিগুলো পর পর দেখলে মনে হবে যেন শিল্পীর ওপর কোনো ঐশ্বরিক শক্তি ভর করেছে। তাইতো তাঁর ক্যানভাসে গতিশীল ও পেশীবহুল অতিমানবীয় পুরুষের ছবি একে চলেন তুলির জাদুকরের মতো।
আলোকচিত্রী ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতির এটি পঞ্চম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। মূলত তিনি পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফার। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ প্রথিতযশা মানুষের পোর্ট্রেট করেছেন। এ প্রদর্শনীতে সেই দক্ষতার প্রতিরূপ দেখা যায়। তারপরও গ্যালারিতে ছবিগুলোর বিন্যাস/ কিউরেটিং-এর ক্ষেত্রে গতানুগতিক লিনিয়ার বা সরলীকরণ ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। যেহেতু বিষয় বা পোশাকে বেশকিছু ছবিতে সাদৃশ্য ছিল, তাই ক্লাস্টার/গ্রুপ আকারে ছবিগুলো বিন্যাস করলে দর্শকরা একটু ভিন্নতার স্বাদ পেতো। আর ছবির ক্যাপশন বা বর্ণনা কিংবা কোথায় কবে তোলা হয়েছে তা উল্লেখ থাকলে দর্শকরা আরও সহজভাবে বিষয়টি অনুধাবন করতে পারতেন। বিষয়বস্তুর নিরীখে ইফতির প্রদর্শনীর ছবিগুলোকে Aesthetically evaluative photograph-এর আওতায় ফেলা যায়। কেননা ছবিতে ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্যকে নান্দনিকতার মাধ্যমে আরও মহিমান্বিত, বিকশিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর এই গুণী শিল্পীর সাথে আমৃত্যু কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ইফতি। যাতে বিশ্বখ্যাত এই শিল্পীর কর্মময় ও সাফল্যমণ্ডিত জীবনকে তাঁর গুণগ্রাহীদের নিকট সঠিকরূপে উপস্থাপন করতে পারেন। ইফতি আর শাহাবুদ্দিন—দুই মাধ্যমের দুই শিল্পীর এই দ্বৈত রথে সাফল্যযাত্রা বেগবান থাকুক।
