মানুষের সত্তায় আত্মা হলো একটি শাসক শক্তি, যা মানুষের পুরো সত্তায় সদাসর্বদা নিজের কর্তৃত্ব গেড়ে রাখে। নিঃসন্দেহে এই শক্তিটা চিন্তা ও মস্তিষ্কের ওপরও বিজয়ী। মানবসত্তার বিভিন্ন অবস্থা তার আত্মাই নির্ণয় করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের অনুভূতিশীল অঙ্গসমূহকে তখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যায় যখন আত্মা এগুলোর বাস্তবায়ন করে। আর আত্মা যদি এসব গুণাবলি থেকে বঞ্চিত হয়, তখন অনুভূতিশীল অঙ্গসমূহ পূর্ণতার স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এই বাস্তবতার সত্যায়ন কুরআন এভাবে করেছে—“আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি”(সূরা বাকারা- ৭)। অন্তরে মোহর লেগে দেওয়ার কারণে তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে তাদের কান বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের চোখসমূহে কালো পর্দ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের অবস্থা এই হয়ে দাঁড়ালো যে, “তারা বধির, মূক ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসবে না” (সূরা বাকারা-১৮)। বাস্তব জিনিসটা যখন সে দেখে না, শুনে না, তা হলে সে বর্ণনা করবে কীভাবে? এই অবস্থা হলো মুমিনের জন্য খুবই হতাশাজনক। এই বিষয়টিকে কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, “বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়”(সূরা হজ-৪৬)। অর্থাত্ বাহ্যিক দৃষ্টিতে যেসব চক্ষু দৃষ্টিমান মনে হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সে চক্ষুগুলো সত্যকে দেখা, সত্যের অনুভূতি জাগা ও সত্যের চাহিদা পূরণ করা থেকে অক্ষম হওয়ার কারণে সে চক্ষুগুলোকে দৃষ্টিহীন বলে ভ্রম হয়। আসলে সে চক্ষুগুলো অঙ্গ হিসেবে দৃষ্টিহীন নয়। তবে মানগত দিক দিয়ে একেবারে অন্ধ ও বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ অন্তরের লুকায়িত চোখ যখন অন্ধ হয়ে যায়, বাহ্যিক ও চামড়ার চোখও তখন অন্ধ হয়ে যায়। বোঝা গেলো, মানবসত্তায় অন্তরের গুরুত্ব অপরিসীম। অন্তরে কোনো বিকৃতি সাধিত হলে বাহ্যিক অঙ্গগুলো পর্যন্ত তাদের কার্যকরিতা থেকে বঞ্চি হয়। সুতরাং এ কথা আমাদের নিশ্চিতভাবে মেনে নিতে হবে যে, যদি অন্তরের অবস্থা দুরস্ত হয়ে যায়, তা হলে শরীরের সমূহ অঙ্গের কর্মক্ষমতা পূর্ণতা লাভ করবে। এই বাস্তব সত্যাটিকে হাদীসে নবী সা. এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘নিশ্চয় শরীরে গোশতের এমন এক টুকরা আছে, যা সংশোধিত হলে; সমস্ত অঙ্গ সংশোধিত,আর নষ্ট হলে সমূহ অঙ্গ নষ্ট। সাবধান! সেই টুকরা হলো কলব বা অন্তর’ (সহীহ্ মুসলিম, কিতাবুল মুসাক্বান, হাদীস নং, ১০৭। সহীহ্ বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং.৫২)। যে কোনো ব্যক্তির অন্তরাবস্থা যখন ভালো হয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিত্ব প্রশংসার উপযোগী হয়। অন্তর যখন লোভ, অহংকার ও কুমনেবৃত্তির কালিমা থেকে মুক্ত হয় এবং ভালো কাজের আবেগ-উদ্দীপনায় ভরপুর হয়, তখন সে অন্তর নিজের অঙ্গসমূহের পথ ভালোর দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তখন মানুষ ‘সন্তুষভাজনের’ স্তরে পৌঁছতে পারে। যার দরুন সমাজে বয়ে যায় ভালোত্ব ও কল্যাণের জোয়ার। পক্ষান্তরে অন্তর যদি রোগাক্রান্ত হয়, তখন মনের সমূহ অপকর্ম তার মর্যাদার সামনে পর্দা টেনে দেয়। ফলে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায়। তখন সে ‘সর্বোত্কৃষ্টের’ উঁচু স্থান থেকে নেমে ‘সর্বনিকৃষ্টের’ অতল গহ্বরে পতিত হয়। অতপর ছোঁয়াচে রোগের মতো অন্তরব্যাধির এই জীবাণুগুলো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে সমাজ ও সমাজের সদস্যদেরকে আক্রান্ত করেই ছড়ায়। শুধু তাই নয়, বরং এই জীবাণুগুলো পুরো পৃথিবীকে আক্রান্ত করেই ক্ষান্ত হয়। চারিত্রিক পতন, আধ্যাত্মিক অধঃপতন, জীবনাচরণের কদর্যতা, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামি চিন্তাভাবনার অভাব এবং মন-মস্তিষ্কে কুবৃত্তি ও বস্তুবাদের আক্রমণের কারণে আমাদের অন্তরাত্মা ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাস্তবেই আজকাল শারিরীক রোগের চেয়ে রুহানী রোগের সংখ্যাই বেশি। রুহানী রোগের অবস্থা এই যে, খুব কম মানুষই তার কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে। উপরন্তু প্রত্যেক ব্যক্তি হাজারো রোগে আক্রান্ত। আবার প্রত্যেকটি রুহানী রোগ ক্যান্সারের মতো রোগীকে নিজের পাঞ্জায় বেষ্টিত করে ফেলেছে। রুহানী রোগ যখন ভয়ঙ্করভাবে মহামারীর আকার ধারণ করে ধর্মের শরীরকে খেয়ে শেষ করে দেয়, তখন রোগীদের আধিক্য ও রোগের কাঠিন্য অনুপাতে তার চিকিত্সার চেষ্টাও হতে হয় বিশালাকারে ও ব্যাপকভাবে। সেই ঘূর্ণিঝড়ের মুকাবিলা করতে হবে সগুরুত্বে এবং স্বতন্ত্র ভিত্তিতে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, শারীরিক রোগের চিকিত্সার জন্য যত হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে এবং প্রতিদিন হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে যেসব পরিকল্পনা দৈনন্দিন হয়ে চলছে, এর তুলনায় রুহানী রোগ থেকে আরোগ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা, ব্যবস্থা ও ক্লিনিক স্থাপন, বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো- যেসব কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠান থেকে রুহানী রোগের চিকিত্সা যথাযথভাবে হওয়ার কথা ছিলো, সেইসব কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠান থেকেই রুহানী রোগের বিষাক্ত জীবাণু সংক্রমিত হচ্ছে ধর্মের শরীরে। আজকের ব্যস্ততম বস্তুবাদী পৃথিবীতে প্রথমত রুহানী রোগের দিকে মনোযোগ দেওয়ার এবং তার ক্ষতি অনুভব করার সময়ই নেই কারো কাছে। দ্বিতীয়ত মনোযোগ দিয়ে যদি তার জীবাণু থেকে বাঁচতেও চায়, তা হলে প্রকৃত মানবের এই দুর্ভিক্ষের দিনে তার জন্য কোনো চিকিত্সকের সন্ধান পাওয়া যায় না, যে তার আশুআরোগ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে।
