দেশের জার্সিধারী তিনটি জাতীয় ক্রিকেট দল গত ২০ দিনের মধ্যে ১৫টি ম্যাচ খেলে ১৩টিতেই হেরেছে! নিকট অতীতকালে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এমন দুর্দিন আর দেখা গেছে কি না, বলা কঠিন! দেশের ক্রিকেট সমর্থক, বোদ্ধারা এই ফলাফলে মারাত্মক শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। গতকাল এই শঙ্কা, এই উদ্বেগ শোনা গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি, সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরীর কণ্ঠেও।
নির্বাচন প্রসঙ্গেই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাবের হোসেন চৌধুরী পরিষ্কার বললেন, ক্রিকেটের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখলে এটা জরুরি একটা পরিস্থিতি। নির্বাচন-ফিক্সিং-অবকাঠামো নিয়ে ব্যস্ত কর্মকর্তাদের তিনি মনে করিয়ে দিলেন, ‘নির্বাচন আমার কাছেও বড় ব্যাপার। কিন্তু ক্রিকেটের চেয়ে বড় নয়। ক্রিকেট ঠিক না থাকলে বোর্ডের কোনো গুরুত্বই নেই।’ গত পরশু বৃহস্পতিবারকে বলা যায়, এই ক্রিকেটীয় অর্থে বাংলাদেশের এক ‘ব্ল্যাক ডে’। প্রথম ম্যাচে ২০২ রানে হারের পর ইংল্যান্ড লায়ন্সের বিপক্ষে এদিন ১৯১ রানে হারল বাংলাদেশ ‘এ’ দল। এই নিয়ে সফরে ‘সাতে সাত’ ম্যাচ হারল তারা। একই দিনে সিঙ্গাপুরে চলমান এমার্জিং এশিয়া কাপে আরব আমিরাতের বিপক্ষে হেরে বিদায় নিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল। আবার এই সপ্তাহের শুরুতেই ইংল্যান্ডে শেষ হওয়া ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট থেকে ৫ ম্যাচের চারটিতেই হেরে ফিরে এসেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল!
এই পুরো পরিস্থিতিকে সাবের হোসেন চৌধুরী বলছেন, জরুরি বৈঠক ডেকে পর্যালোচনা করার মতো পরিস্থিতি। যদিও ক্রিকেট বোর্ড এইসব পারফরম্যান্স নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। কিন্তু সাবের হোসেন মনে করছেন, ‘রোজ দেখছি, নানা ধরনের মতবিনিময় করা হচ্ছে বোর্ডে। কিন্তু এই দলগুলোর পারফরম্যান্স নিয়ে মতবিনিময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এখন কিছুই থাকতে পারে না। বোর্ডের উচিত জরুরি বৈঠক ডেকে কেন এমন পারফরম্যান্স হল, তা নিয়ে আলোচনা করা।’
পরিস্থিতি যে এরকম জরুরি আকার ধারণ করেছে, সেটা সত্যিই। বিশেষ করে ‘এ’ দল ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলের পারফরম্যান্স রীতিমতো ‘পাগলাঘন্টি’ বাজিয়ে দেয়ার মতো সতর্কসংকেত দিচ্ছে। অনূর্ধ্ব-২৩ দল যে টুর্নামেন্টটিতে গিয়েছিল, সেখানে এশিয়ার চারটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ ছাড়া ছিল বাকি সব সহযোগি দেশগুলো। এরকম টুর্নামেন্টে অন্তত দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠাটা বাংলাদেশ যুব দলের কাছ থেকে কাম্য ছিল। আরব আমিরাতের কাছে হেরে সেটা পারেনি তারা।
‘এ’ দলের ব্যাপারটি আরও ভয়াবহ। এবার বাংলাদেশের হয়ে ১৫ সদস্যের যে ‘এ’ দল ইংল্যান্ড সফরে গেছে; তার ১৩ জনই জাতীয় দলে খেলেছে আগে-পরে। ইংল্যান্ডের ভিন্ন কন্ডিশন, শক্তিশালী লায়ন্স দল বলে সর্বশেষ দুটো হারের পক্ষে কিছু যুক্তি দাঁড় করানো যেতে পারে; তাও এরকম দুশ’ রানের ব্যবধানে হারের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। এর চেয়েও ভয়াবহ কথা প্রথম পাঁচ ম্যাচে বাংলাদেশের তারকাখচিত ‘এ’ দল হেরেছে পাঁচটি কাউন্টি দলের বিপক্ষে! একই ইংল্যান্ড থেকে শোচনীয় ফল নিয়ে ফিরেছে অনূর্ধ্ব-১৯ দল। প্রথমে স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আশা তৈরি করেছিল অনূর্ধ্ব-১৯ দল। কিন্তু পরে টানা চার ম্যাচ হেরে সে আশাও শেষ করেছে তারা। এই দলগুলোর হার নিয়ে প্রত্যেক দলেরই ম্যানেজমেন্টের নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। দেশে ফিরে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ রিচার্ড ম্যাকিন্স হারের জন্য কন্ডিশন, প্রস্তুতির অভাবকে দোষ দিয়েছেন। একইরকম নিজের ব্যাখ্যা কাল একটি সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন ‘এ’ দলের কোচ হয়ে যাওয়া কোরি রিচার্ডস। তিনিও কন্ডিশন ও অভিজ্ঞতার অভাবকেই দায় দিলেন।
কিন্তু এসব ব্যাখ্যার বাইরেও কিছু কথা আছে। ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাঠে খেলা না থাকা এবং পুরো বোর্ড ও সব বিসিবি কর্মীদের নির্বাচনমুখী হয়ে পড়াটা এইসব পারফরম্যান্সের একটা নেপথ্য কারণ।
কাল এই ধারণাটা সমর্থন করলেন সাবের হোসেনও। তিনি বললেন, ‘ক্রিকেট খেলাটা খুব মনোসংযোগের একটা খেলা। মাঠের বাইরের ব্যাপার খেলায় প্রভাব ফেলে। ফলে মাঠের বাইরে এতো বেশি ফোকাস তৈরি হলে সমস্যা। আর এখন তো মনে হচ্ছে, কারো ফোকাসই আসলে ক্রিকেটে নেই। মাঠে খেলা নেই, এদিকে নির্বাচকরা পর্যন্ত দেখি নির্বাচনী মতবিনিময়ে হাজির থাকেন! এটা হলে তো খুব মুশকিল।’
