নারীকে যেভাবে দেখে ভারত

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৪
ভারতের দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের শিকার তরুণীর জন্য লাখো মানুষ প্রার্থনা করেছে, বিক্ষোভ করেছে— তবু সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে সেই হতভাগ্য তরুণীর মৃত্যুর পর বার বার এ কথাই মনে হয়েছে, কেন ভারতের নারীরা এতোটা নিপীড়নের শিকার। দিল্লির সে ঘটনার বিচার না হতেই মানুষ আবার ধাক্কা খেল। সে আঘাতের ক্ষত না শুকাতেই মুম্বাইয়ে গণধর্ষণের শিকার হলো এক নারী ফটো সাংবাদিক। দিল্লির পর মুম্বাইয়ের এ ঘটনায়ও বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে মানুষ। ভ্রূণ হত্যা, জন্মের পর নারী শিশুকে হত্যার কারণে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাতে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। যারা বেঁচে যাচ্ছে তারা প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে বৈষম্য, কুসংস্কার ও সহিংসতার। ট্রাস্ট ল’ সংবাদ সংস্থার জরিপে জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে ভারতে নারীরা সবচে খারাপ অবস্থায় আছে; যদিও দেশটির সরকার দলীয় প্রধান নারী, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের স্পিকার নারী, দুটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও নারী। ব্যবসা-বাণিজ্য ও খেলাধুলায় বেশ কিছু নারী সুখ্যাতী অর্জন করেছেন। দেশের বাইরে চাকরি করতে যাওয়া নারীর সংখ্যাও বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে নারী নির্যাতনও। ২০১১ সালে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ২৪ হাজার। গত বছরের চেয়ে ধর্ষণ বেড়েছে শতকরা ৯ ভাগ। ধর্ষণের শিকার অর্ধেকের বেশি নারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণকারী নির্যাতিত নারীর পরিচিত। দেশের মোট ধর্ষণের ১৭ ভাগেরই বেশি ঘটে দিল্লিতে। শুধু ধর্ষণ নয়; পুলিশ রেকর্ড থেকে দেখা যায়, নারী অপহরণ ১৯ ভাগ, যৌতুকের জন্য হত্যা ২ ভাগ, শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন ৫ ভাগ বেড়েছে গত বছরের তুলনায়। সবচে আশংকাজনক ভাবে বেড়েছে নারী পাচার। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের হিসাবে প্রতিবছর ১০ কোটি নারী পৃথিবীতে নিখোঁজ হন। অর্থনীতিবিদ সিওয়ান এন্ডারসন এবং দেবরাজ রায়ের হিসাবে ভারতে প্রতিবছর ২০ লাখ নারী নিখোঁজ হন। প্রতিবছর ১ লাখের বেশি নারীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ভারতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যৌতুকের জন্য তাদের দেহে আগুন দেয়া হয়। এসব ঘটনা ভারতে নারীদের সারাজীবন নিগ্রহের প্রমাণ দেয়। অনেক নারীর পুরো জীবনই কাটে নানা হুমকির মুখে। নারীদের জীবন সুন্দর ও নিরাপদ করার জন্য ভারতের সমাজ ব্যবস্থার গভীর থেকে পরিবর্তন দরকার। ভারতের ব্যাপক এলাকায় বিশেষ করে উত্তর ভারতে পিতৃতন্ত্র ও নারী বিদ্বেষ গভীর শিকড় গেড়ে আছে। অনেকে বিশ্বাস করেন ভারতের রাজনীতিবিদরা নারী নির্যাতনকারীদের দ্রুত শাস্তির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি পূরণে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। গত ৫ বছরে বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনে ২৭ জন প্রার্থী ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা রয়েছে। ৬ জন আইন প্রণেতা হয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা রয়েছে। দিল্লিতে বাসে ধর্ষণের পর ব্যাপক বিক্ষোভ জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। হয়ত এসব ঘটনা ইতিহাসের একটি ক্রান্তিকালে ঘটেছে, যখন সরকার ও জনগণ নারী নির্যাতনের ব্যাপারে ঐকান্তিকভাবে ভাবতে শুরু করেছে। তবে এটিকে নতুন দিনের সূচনা এখনো বলা যাবে না।