বাংলাদেশে এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেছে কি না বলা মুশকিল—একই বিষয় নিয়ে জাতীয় দলের সবচেয়ে সিনিয়র তিন ক্রিকেটার প্রকাশ্যে ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সমালোচনা করেছেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ‘খেলোয়াড় বাছাই’ প্রক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও ওপেনার তামিম ইকবাল। এর মধ্যে তামিম ইকবাল বিসিবির ভূমিকা নিয়েও কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন।
সাধারণত এসব সমালোচনা কোনো ক্রিকেট বোর্ডই সহজে হজম করতে পারে না। বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে এই তিন ক্রিকেটারের কথাবার্তায় কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও কয়েকজন পরিচালক বলছেন, তারা অন্তত এই সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছেন। তারা এটুকু অন্তত মেনে নিচ্ছেন, খেলোয়াড় বাছাই প্রক্রিয়াটা সমালোচনারই যোগ্য।
সমস্যাটার সূত্রপাত হয়েছে চিরায়ত দলবদল পদ্ধতি বাদ দেয়ায়; যে পদ্ধতিতে খেলোয়াড় ও ক্লাব আলোচনার ভেতর দিয়ে ঠিক করতো পরবর্তী মৌসুমে তাদের ঠিকানা। এবার তার বদলে খানিকটা লটারি, খানিকটা নিলামের আদলে দলবদল হয়েছে ‘খেলোয়াড় বাছাই’ শিরোনামে। এই পদ্ধতিতে খেলোয়াড়দের টাকা-পয়সা বা পছন্দের দল ঠিক করার কোনো সুযোগ ছিল না। এই বাছাই প্রক্রিয়ার পরদিনই অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম বলেছেন, এটা এক বছরের জন্য বলে তারা মেনে নিয়েছেন। নইলে এ পদ্ধতি তার একেবারেই পছন্দ নয়।
একই দিনে ঢাকায় পৌঁছে বিমানবন্দরে সাকিব আল হাসান এই পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বিপিএলের মতো ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও পাওনা নিয়ে ঝামেলা হবে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সাকিবের এই কথাটার সঙ্গে একমত নন বিসিবি পরিচালকরা। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগ আয়োজক সংস্থা সিসিডিএমের প্রধান ও বিসিবি পরিচালক জালাল ইউনুস বলছিলেন, ‘একটা জিনিস ওরা বলছে যে, পেমেন্ট পাবে কি না। এখানে বলে দেয়া দরকার যে, ক্লাব ক্রিকেটের ইতিহাসে খেলোয়াড়রা পেমেন্ট পায়নি, এটা নেই। হ্যাঁ, হয়তো শতকরা দশ-পনেরো ভাগ পাওনা বাকি থাকে, সেটা পরের মৌসুমের আগেই সমন্বয় করে দেয় ক্লাবগুলো। আমরা এই অভিযোগ শুনে অবাক হয়েছি।
অবাক হলেও এসব প্রশ্ন তোলার কারণে বিসিবি পরিচালকরা ক্রিকেটারদের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছেন না। এমনকি তামিম ইকবাল যে ভাষায় ক্রিকেট বোর্ডের সমালোচনা করেছেন, সেটাও বোর্ড কর্মকর্তারা একটু সহনশীল ভাবে দেখতে চাইছেন। তামিম পত্রিকান্তরে বলেছেন, বিসিবি খেলোয়াড়দের পাশে থাকে না। বিপিএলের মতো প্রিমিয়ার লিগেও তারা দলের পক্ষ নিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে কথা বলতে বিসিবি পরিচালকরা একটু বিব্রতই হলেন। তবে তারা ব্যাপারটাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো কিছু ভাবতে চাইছেন না। বোর্ডের পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল ইসলাম ববি যেমন বলছিলেন, ‘আসলে এটা তো একেবারে নতুন একটা ব্যবস্থা। এখানে খেলোয়াড়দের ভালো-মন্দ জড়িত, ওরা সরাসরি ইনভলবড; তাই ওদের পরিষ্কার একটা বক্তব্য থাকতেই পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এতে দোষের কিছু দেখি না।’
প্রায় একই কথা বললেন জালাল ইউনুসও, ‘এই ব্যবস্থাটা করা হয়েছে এক বছরের জন্য। যেভাবে খেলোয়াড়দের পাওনা বেড়ে যাচ্ছিল, ক্লাবগুলো এবার আসলেই পারছিল না। ক্লাবগুলোর তো ওইভাবে স্পন্সর বা বিজ্ঞাপন নেই। তাই আমরা সাময়িক এটা চালু করেছি। এটা ঠিক যে, এই ব্যবস্থায় কিছু খেলোয়াড় নিজেকে বঞ্চিত মনে করতে পারে। এই ব্যবস্থায় কিছু খেলোয়াড়ের আর্থিক ক্ষতি তো অবশ্যই হয়েছে। আর এসব নিয়ে খেলোয়াড়দের কথা বলার অধিকার তো আছেই।’
বোর্ড পরিচালক হিসেবে এই প্রসঙ্গে কথাই বলতে চাইলেন না ইসমাইল হায়দার মল্লিক। তবে আবাহনীর কর্মকর্তা হিসেবেও তিনি মানলেন যে, খেলোয়াড়দের এসব কথা বলার অধিকার আছে। তবে মল্লিক একই সঙ্গে মনে করেন, এই ‘প্লেয়ার বাই চয়েস’ ব্যবস্থায় মাঝারি ও নিচু সারির খেলোয়াড়রা উল্টো উপকৃতই হয়েছেন।
ব্যবস্থাটা শেষ পর্যন্ত ভালো হোক আর মন্দ; এটা স্থায়ী করার ইচ্ছা কারোরই নেই। খেলোয়াড়রা কিছুতেই চান না, এই ব্যবস্থা এক বছরের বেশি চলুক। আর কর্মকর্তারাও কথা দিয়েছেন, এটা এক বছরের বেশি চলবে না।
তবে জালাল ইউনুস বাস্তবতাটা মনে করিয়ে দিলেন, ‘খেলোয়াড়দেরও একটু সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা থাকতে হবে। যেভাবে কিছু খেলোয়াড়ের চাহিদা তৈরি হচ্ছিল, তাতে এক একটা দলের খরচ তিন-চার কোটি টাকা হয়ে যেত। ক্লাবগুলোর তো এরকম আয়ই নেই। ফলে খেলোয়াড়রা যুক্তিযুক্ত আচরণ করলে এই সিস্টেম আর দরকার হবে না। আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদেরই ভাবা দরকার, একটা ক্লাব কতো আর দিতে পারে।’
