শ্রদ্ধাঞ্জলি

যাঁর কলমে সম্মোহন

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৩, ১৯:১৫
প্রয়াত লেখক আহমদ ছফার মাধ্যমে নাজিম উদ্দিন মোস্তানের নৈকট্যলাভের সুযোগ হয়েছিল। আমার সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হয়েছিল তা বলার আগে আহমদ ছফার সঙ্গে তাঁর কীভাবে পরিচয় হয়েছিল সেটার কিঞ্চিত্ বয়ান করলে বোঝা যাবে তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা করেছিলেন। বক্তৃতাটি করেছিলেন তাঁর আবিষ্কৃত তত্ত্বের ওপর। পরের দিন নাজিম উদ্দিন মোস্তান বক্তৃতাটির ওপরে দৈনিক ইত্তেফাকে একটি সংবাদ করেন। আহমদ ছফা সেই বক্তৃতাটি শোনেননি, কিন্তু মোস্তানের লেখা সংবাদটি পড়ার তাঁর সুযোগ হয়েছিল। সংবাদটি পড়ে তিনি অবাক হয়ে ভেবেছিলেন বাংলাদেশে কি এমন সাংবাদিক আছেন যিনি বিজ্ঞানের কঠিন তত্ত্বটি এত সহজভাবে পরিবেশন করতে পারেন? আহমদ ছফার মতে, অ-তে অজগরকে যেভাবে বোঝানো হয় ঠিক সেভাবে প্রফেসর সালামের তত্ত্বটি তিনি সহজভাবে বোঝাতে পেরেছিলেন। এমন একজন কামেল মানুষের সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত আহমদ ছফা স্থির থাকতে পারেননি। তিনি মনে করেছিলেন, এখনি গিয়ে তাঁকে সালাম করে আসা দরকার, নইলে তাঁকে অপমানিত করা হবে। যে ভাবা সে কাজ, তিনি ছুটে গিয়েছিলেন ইত্তেফাক অফিসে। অফিসের এক কোনায় তিনি টেবিলে ঝুঁকে রিপোর্ট লিখছিলেন। আহমদ ছফা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন। মোস্তান যখন খাড়া হয়ে বসলেন, তাঁর শরীর এবং কাপড়চোপড় এমনভাবে ছফার নজরে এল—এ ধরনের একজন মানুষকে তিনি ঘরের কাজেরলোক হিসেবেও রাখবেন না। কিন্তু আহমদ ছফা তাঁর চোখে অন্যকিছু দেখেছিলেন, যে চোখ কোনো সাধারণ মানুষের থাকতে পারে না। প্রথম দেখাতে মোস্তানের সঙ্গে ছফার বন্ধুত্বের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যেটা ছফার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। বন্ধুত্বের খাতিরে হোক কিংবা মোস্তানের প্রতি শ্রদ্ধার বশে হোক আহমদ ছফা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ বইটি তাঁকে উত্সর্গ করেছিলেন। আহমদ ছফার মতো করে আমি নাজিম উদ্দিন মোস্তানকে আবিষ্কার করিনি। আহমদ ছফা নিজেই আমাকে মোস্তানের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন আমি এসএসসি পরীক্ষায় বসিনি। হালকা-পাতলা-লম্বা মানুষটিকে প্রথম দেখায় আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। পরিবারের সঙ্গে মেশার সুযোগটা আপনাআপনি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমি তাঁকে কাকা বলে ডাকতাম। আমি বয়সে তাঁর পুত্রতুল্য ছিলাম, তারপরেও তিনি আমাকে ‘তুমি’ না বলে ‘আপনি’ বলতেন। ইতিমধ্যে আহমদ ছফা আমার ভেতরে লেখালেখির বীজটা বপন করে দিয়েছিলেন এবং তার চারাও গজিয়েছিল। কিন্তু এ চারাটিকে আলো-বাতাস-পানি দিয়ে বড় করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন নাজিম উদ্দিন মোস্তান। মোস্তান ওই সময় গরিবি হালে একটি পত্রিকা চালাতেন। ওই পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজে। পত্রিকাটির নাম ছিল ‘সাপ্তাহিক রাষ্ট্র’। ওই পত্রিকায় আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার তখনও ছাত্রত্ব ঘুচেনি। আমি যখনই সময় পেতাম, চলে যেতাম। পত্রিকা অফিসটি ছিল শুক্রাবাদের তাঁর ভাড়া বাড়িতে, যেখানে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। আমরা যারা পত্রিকায় কাজ করতাম তাদের তেমন বেতন ছিল না। আমাকে পাঁচশ টাকা দেয়া হতো। এটাকে বেতন বলা তো যাবে না, হাতখরচও না। টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিল না। আমরাও টাকার লোভ করতাম না। আমার উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর সঙ্গে থেকে কাজ শিখে নেওয়া। রাষ্ট্র পত্রিকাটি নাজিম উদ্দিন মোস্তানের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। তাঁর চাকরিক্ষেত্র ইত্তেফাকে যতটুকু সময় দেওয়ার দরকার তা দিয়ে পত্রিকাটির পেছনে তিনি লেগে থাকতেন। গভীর রাতে ইত্তেফাক অফিস থেকে ফিরে এসে নিজের পত্রিকার জন্য একনাগাড়ে লিখতে লেগে যেতেন। নাওয়া-খাওয়া-ঘুমের ধার ধারতেন না। সময় কোনদিকে বয়ে যেত তিনি টের পেতেন না। রাত জাগার কারণে মাঝে মাঝে দেখতাম তাঁর চোখ দুটি টকটকে লাল হয়ে আছে। শরীরের দিকে তাঁর কখনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তিনি লিখে যেতেন আমরা কয়েকজন মিলে তা কম্পিউটারে টাইপ করতাম। এখন যে আমি টুকটাক সম্পাদনার কাজ করি সেটা মোস্তানের কল্যাণে। রাষ্ট্র পত্রিকায় বাইরের খুব কম লেখকই লিখতেন। প্রায় সবই তাঁর নিজের লেখা। সব লেখায় তো আর নিজের নাম বসানো যেত না। তাই তিনি লেখক হিসেবে অনেকের নাম ব্যবহার করতেন। প্রতি সংখ্যায় আমার নামে দু-একটি লেখা থাকতই। প্রথম প্রথম আমার নামে লেখা ছাপছে দেখে খুশি হতাম। পরে পরে টের পেতে থাকলাম, আমার জন্য এরচেয়ে বিড়ম্বনা পৃথিবীতে আর নেই। একদিন আমি মোস্তানকে বললাম, কাকা, আপনি আমার নামে আর লেখা ছাপবেন না। আমাকে বাইরের লোকের কাছে নানা কথা শুনতে হয়। মোস্তান খুব পান খেতেন। পানের পিক ফেলার জন্য একটা পাত্র তাঁর পাশে সবসময় থাকত। তিনি তাঁর মুখে জমে থাকা পানের পিক পাত্রে ফেলে বললেন, নিজে লিখেন না কেন? নিজে না লিখলে আমার লেখা আপনার নামে ছাপা হবে। কারে কী বলা, তিনি আমার নামে লেখা ছেপে যেতে থাকলেন। দেশের উন্নয়ন এবং অর্থনীতির ওপর লেখা তিনি বেশি লিখতেন। আহমদ ছফার বাসায় তিনি প্রায়ই যেতেন। আহমদ ছফা নানাজনের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। কিন্তু মোস্তানকে ওসবে কোনোদিন অংশ নিতে দেখিনি। তিনি পাশের রুমে বসে আহমদ ছফার কথোপকথন দাঁড়ি-কমাসহ লিখে যেতেন। ওটাই তাঁর একটা লেখা হয়ে যেত। ওই লেখাটা আমরা রাষ্ট্র পত্রিকায় দেখতে পেতাম। তিনি দ্রুত লিখে যেতে পারতেন। যে কারণে কোনো কথা তাঁর কলম থেকে বাদ পড়ত না। অদ্ভুদ এক লেখনিশক্তি ছিল তাঁর! এক কলম থেকে লিখে সপ্তাহে একটি সংখ্যা প্রকাশ করা চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ মোস্তান তা-ই করতেন। সবচে মজার ব্যাপার হলো তাঁর মনে যা চাইত তিনি তা-ই করতেন। পিজি হাসপাতালে আমার এক আত্মীয় ক্যান্সারে ভোগে চিকিত্সা নিতে আসে। আমাকে তাঁর সঙ্গে প্রায় পনের দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়। আমি দেখলাম, এ হাসপাতালে কত রকম অনিয়ম। যে-সমস্ত খাবার রোগীদের দেওয়া হয় তা একেবারে নিম্নমানের। আমি হাসপাতালে থেকে পুরো ব্যাপারটি নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেললাম। তারপর লেখাটি নিয়ে রাষ্ট্র অফিসে এলাম। পত্রিকার নির্বাহী পদে সমাসীন মোস্তানের মেয়ে মিলি। আমি তাঁকে দেখালাম লেখাটা। তিনি বললেন, এ লেখা পত্রিকায় ছাপা যাবে না। এ লেখা ছাপা হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষেপবে। আমি ব্যাপারটি মোস্তান সাহেবকে দেখালাম। তিনি বললেন, লিখে যদি ক্ষেপানোই না গেল তাহলে সেটা লিখে লাভ কী? এটা আমরা অবশ্যই ছাপব। কিন্তু আপনার দায়িত্ব হবে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ড এবং ডাক্তারের চেম্বারে কিছু পত্রিকা রেখে আসা। আমি মনে মনে বললাম, এই তো আর এক ঝামেলা। পত্রিকা আমাকে পাঠাতে হয়নি, তিনি লোক মারফতে নিজেই হাসপাতালে পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন। তার দুই-একদিন পর দেখা গেল, রোগীদের অনেকে মানসম্মত খাবারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে। মোস্তান রাষ্ট্র পত্রিকার পেছনে অর্থ, শ্রম, সময় এমনভাবে খরচ করেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের জীবনটাও সোপর্দ করতে হয়েছিল। রাষ্ট্রকে সমস্ত কিছু বিলিয়ে দিলেও তার পেছনে নিয়োজিত থেকে তাঁকেও সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল। ফলে নানামুখী চাপের মুখে পড়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছিলেন এবং স্ট্রোক করেছিলেন। তিনি প্যারালাইজড হয়ে গেলেন। তারপরেও তিনি ইত্তেফাকের চাকরি ছাড়েননি। রাষ্ট্র পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেল, মোস্তান অসুস্থ। আহমদ ছফা আমাকে পাঠালেন পত্রিকাটা আবার প্রকাশ করা যায় কি না, তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। আহমদ ছফা নিজেই পত্রিকাটার ভার নিতে চেয়েছিলেন। আমি গিয়ে মোস্তানকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ছফা ভাইকে বলবেন আমার জন্য এক শিশি বিষ পাঠিয়ে দিতে। তাঁর কথা, যে জিনিস মরে গেছে, তাকে আবার টেনে তোলা কেন? আরও একবার তাঁকে কাঁদতে দেখেছিলাম, আহমদ ছফা যেদিন মারা গেলেন। কী কান্না তাঁর! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের সামনে কুঁজো হয়ে বসে ছোট শিশুটির মতো করে কাঁদছিলেন। অনেক স্মৃতি তাঁর সঙ্গে আমার। আমি সেইসব ভুলব কীভাবে? বারবার মনে মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে আরেকবার এতিম হয়ে গেলাম।