অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে শাহানূর মামুনের জল প্রদর্শনী

জলরংয়ের ভাষায়

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৩, ১৯:১৭
তারুণ্য ছুটে চলে সামনের পথে। পথ আগলে রাখা দায়। হয়তো এভাবেই তরুণের হাতে সৃষ্ট শিল্পকর্ম লাভ করে অমরত্ব। গুরুশিল্পী জয়নুল আবেদিনের জন্মভূমি ময়মনসিংহে শাহানূর মামুনের জন্ম, বেড়ে ওঠা। নদী, জল, আকাশ আর প্রকৃতির রং বদলের খেলায় মেতে থাকতেন শাহানূর। তাঁর আঁকা ছবি তাই প্রকৃতিকে নিয়ে। বর্ণের মূর্ছনায় গড়ে ওঠা প্রকৃতির আকাশ ক্যানভাসে সেজে ওঠে। প্রকৃতির রূপ বদলায় ক্যানভাস বদলায়। এই নগরের মানুষ আর সারি সারি স্থাপনা শিল্পীর দৃষ্টি এড়ায় না। নগর ঘুরে জমতে থাকা স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে ক্যানভাস গড়েন। প্রকৃত নাগরিক হতে হলে গায়ে চড়াতে হয় সাহেবি বেশাভূষা, শিল্পীর কাছে সেটা খুব গুরুত্ব পায়নি। অ্যাকাডেমিক রীতির অঙ্কনে কুশলতা দেখিয়ে শিক্ষাপাঠ সমাপনের পর্যায়ে শাহানূর উপলব্ধি করেন রংয়ের সাথে জলের সম্পর্ক। জল রংয়ে তিনি মনোযোগী হয়ে অবিরাম চর্চা করে গেছেন। এ প্রদর্শনীর ৬৭টি কাজ তার সাক্ষ্য দেয়। কিছু কাজে একঘেয়ে ভাব রয়ে গেলেও এক দেখায় শাহানূরকে বোঝা যায়। বাস্তবধর্মী জলরং ছবি আঁকায় অনুশীলনই একমাত্র পথ। প্রদর্শনীর কাজে অনুশীলনের একাগ্রতা খুঁজে পাওয়া যায়। এ প্রদর্শনীর কাজ প্রসঙ্গে শিল্পী বলেন, ‘প্রকৃতির রং-রেখার সাথে আমি একাত্ব হয়ে যাই। ছবি আঁকার জন্যে নারায়নগঞ্জ, ঢাকার সদরঘাট, ওয়াশপুর, চাঁদপুর, সেন্টমার্টিন, ছেঁড়া দ্বীপ, বান্দরবানসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আমি যাই।’ প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার কারণে ছবিতে প্রকৃতির সত্য প্রকাশ পেয়েছে। জল রংয়ের বাইরে এ প্রদর্শনীতে ৭টি সিরামিকের শিল্পকর্ম রয়েছে। চারুকলা অনুষদে অধ্যয়নকালে শাহানূর সিরামিককে বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সিরামিকে করা কাজগুলো জ্যামিতিক আকৃতিতে গড়া। জ্যামিতিক আকৃতিতে মানুষের অবয়ব ও রংয়ের ক্ষেত্রে বেছে নিয়েছেন গাঢ় রং। সিরামিক নিয়ে খুব বেশি সময় কাজ করেননি। তাঁর কাজগুলোকে আমরা অ্যাকাডেমিক পর্যায়ের কাজ বলে ধরে নিতে পারি। নগর-সভ্যতা গড়ে ওঠা ও বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জীবনাচরণও পাল্টেছে। এই নগরের বিগত চেহারা পাল্টে গেলেও পুরোনো ঢাকা শিরোনামের কাজে ভগ্নপ্রায় বিল্ডিং আর গলি ঘুপচির আলো-আঁধারির খেলা ছবিতে পাওয়া যায়। ওল্ড ঢাকা শিরোনামের কাজগুলোতে পুরোনো ধাঁচের বিষয় বর্ণনার সাথে রংয়ের ক্ষেত্রে অতীত স্মৃতির চিহ্ন অব্যাহত রেখেছেন। শাহানূর মামুন নগরের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে কখনো খেই হারান। রিকশা তাঁর ছবিতে প্রয়োজনীয় হয়ে ধরা দেয়। ঢাকা রিকশার নগরী। রিকশার সৌন্দর্যে ঢাকা প্রাণ ফিরে পায় আবার রিকশা আমাদের যন্ত্রণা দেয় খানিকটা। ঢাকার ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে গড়া ওল্ড ঢাকা শিরোনামের ছবিগুলো এক সুন্দর ঢাকাকে চিনিয়ে দেয়। শীতলক্ষ্যার তীরে ছবি আঁকতে গিয়ে নৌকায় নদী পার হয়ে আসা মানুষের সাথে কথোপকথন হয়। মানুষের জটলায় রং হয়ে যায় একমাত্র অবলম্বন। এখানে সবুজ খানিকটা ম্লান। গাছের আড়ালে থাকা স্থাপনাগুলো বাস্তব ঢংয়ে এঁকেছেন শিল্পী। ‘রিভার সাইড অব পদ্মা’ ছবিতে আকাশ উজ্জ্বল জলরংয়ের রেখায় ঘর, গাছ, মানুষ হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। এ প্রদর্শনীর কাজগুলোতে মনে হয়, একটি স্থির লক্ষ্যের দিকে শিল্পীর যাত্রা। পাহাড়, নদী, মানুষ আর সমতল ও পাহাড়ি জনপদের ভূ-দৃশ্য—সবকিছুতেই অবিকল আঁকার ঝোঁক দেখা যায়। জলের ছবিতে টলটলে জল আর পাড়ে থাকা ঘরবাড়ির রং এসে জলের রংয়ে মিশে যায়। রোমা, বান্দরবান, ল্যান্ডস্কেপ ইন নড়াইল, সেন্টমার্টিন, বহ্মপুত্র, রেইন, এক্সপ্রেশন অব নেচার ছবিতে বাস্তবে দেখা বিষয়গুলোর সাথে যোগ করেছে স্মৃতিভাণ্ডারে থাকা প্রকৃতির মুহূর্তগুলো। শাহনূর মামুনের এটি প্রথম একক প্রদর্শনী। গত ২৩ আগস্ট শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হবে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর।