দেশের পোশাক শ্রমিকদের তথ্য ভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগে গড়িমসি করছে বেশিরভাগ কারখানা কর্তৃপক্ষ। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ তথ্য ভাণ্ডার তৈরির জন্য চলতি মাসের ৩০ তারিখ (গতকাল শুক্রবার) সময় বেঁধে দেয়। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত মাত্র ২৬২টি কারখানা তথ্য ভাণ্ডার তৈরির জন্য বিজিএমইএ’র কাছে শ্রমিকদের তথ্য ও অর্থ জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ২৩৯টি কারখানার প্রায় ৩ লাখ শ্রমিকের তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। অথচ বর্তমানে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কারখানা চালু রয়েছে। আর সব মিলিয়ে এ খাতে কমপক্ষে ৩৬ লাখ শ্রমিক কাজ করে। ফলে যথাসময়ে এই উদ্যোগটি সফল করা যাচ্ছে না। কিন্তু প্রতিটি কারখানার শ্রমিকদের তথ্য সকল কারখানায় ও বিজিএমইএ’র কাছে থাকার বিষয়ে চাপ রয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) ফেরত পাওয়ার কর্মপরিকল্পনার মধ্যেও স্থান করে নিয়েছে এই ইস্যুটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেশিরভাগ কারখানা কর্তৃপক্ষই বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না। তারা বিজিএমইএ’র কাছে সময় বাড়ানোর জন্যও আবেদন করেনি। এই অবস্থায় তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করতে অপারগ সদস্য কারখানার সেবা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে বিজিএমইএ। সমপ্রতি সদস্য কারখানাগুলোর কাছে এ সংক্রান্ত একটি বার্তা পাঠিয়েছে বিজিএমইএ। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, যে সব কারখানা যথা সময়ে তথ্য ভাণ্ডার তৈরিতে ব্যর্থ হবে তাদের ইউডি সেবাসহ (শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিজিএমইএ’র সনদ) অন্যান্য সকল সেবা বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে যথাযথ কারণ দেখিয়ে সময় বাড়াতে পারবে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম।
তথ্য ভাণ্ডার তৈরির কাজে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন বিজিএমইএর পরিচালক মিনহাজুল ইসলাম। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ২৬২টি কারখানা প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৩৯টি কারখানার তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ শ্রমিকের তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য ভাণ্ডার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থদের সেবা বন্ধ করে দেয়া হবে মর্মে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে যে সব কারখানা যথাযথ কারণ দেখিয়ে সময় চাইবে তাদের ক্ষেত্রে এক বা দুই সপ্তাহ সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যেক কারখানায় শ্রমিকদের তথ্য ভাণ্ডার তৈরির কাজটি করছে বিজিএমইএ। তথ্য ভাণ্ডারে শ্রমিকদের নাম, ঠিকানা, বয়স, কর্মস্থল, যোগ্যতা, কাজের পর্যায়, হাতের ডিজিটাল ছাপসহ বেশ কয়েকটি তথ্য থাকবে। ফলে যে কোন শ্রমিককে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বিজিএমইএ’র একটি কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে এই তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। আর প্রতিটি কারখানার কাছে থাকবে ওই কারখানার শ্রমিকদের তথ্য। তথ্যভাণ্ডারে অন্তর্ভুুক্তির জন্য শ্রমিকের সংখ্যাভেদে কারখানাগুলোর কাছ থেকে ৭৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। তবে কোনো সদস্য কারখানা যদি এককভাবে কাজটি করতে যায়, সেক্ষেত্রে ব্যয় হবে প্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি।
বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, দেশের গার্মেন্টস খাতের অস্তিত্বের স্বার্থে সময়মতো তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। এক্ষেত্রে গড়িমসি করে কোন কারখানা পার পাবে না। বাধ্য হয়েই আমাদের কঠোর সিদ্ধান্তে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এটি সফল হলে এ খাতটির ওপর পর্যবেক্ষণ অনেক সহজ হবে। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
গত বছরের নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক নিহত হন। এসব শ্রমিকের একটি বড় অংশ পুড়ে অঙ্গার হয়েছে। ফলে তাদের আত্মীয়-স্বজনের পক্ষেও লাশ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ওই সময়ই শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা হবে বলে ঘোষণা আসে। যদিও পরে এই আলোচনা থেমে যায়। তবে এর ৫ মাস পর রানা প্লাজা ধসে ১১শ’ ৩২ শ্রমিকের লাশের মধ্যে অন্তত ৩০০ শ্রমিকের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। কোন লাশের একাধিক দাবিদার আসে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে কোন লাশের দাবিদারই নেই। ডিএনএ টেস্টের ফাঁদে পড়ে এটি এখনো ঝুলে আছে। ফলে তাদের প্রকৃত স্বজনরা এই ক্ষতিপূরণও নিতে পারছে না। কিন্তু শ্রমিকদের যথাযথ তথ্য ভাণ্ডার সংরক্ষিত থাকলে এই সমস্যাটি থাকত না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নতুন করে আবার আলোচনায় আসে ইস্যুটি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার কর্মপরিকল্পনার মধ্যেও স্থান করে নিয়েছে বিষয়টি।
এই অবস্থায় রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের তথ্য ভাণ্ডার সংরক্ষণের বিষয়টি আবারো আলোচনায় আসে। চাপের মুখে থাকা বিজিএমইএ এর পর গত ২০ মে শ্রম মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তথ্য ভাণ্ডারের কাজ শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। সে অনুযায়ী সংগঠনের সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম সব সদস্যকে তথ্য ও টাকা জমা দেয়ার নির্দেশ দেন।
বিজিএমইএর সমন্বয়ে তথ্য ভাণ্ডার তৈরি ও বাস্তবায়নের কাজ করছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি ও সিসটেক লিমিটেড।
