সংসদ সদস্যদের আচরণ আইন পাসের তাগিদ

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪১
জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনেই সংসদ সদস্যদের জন্য একটি আচরণ আইন বা বিধিমালা পাস করার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজন। সামপ্রতিক সময়ে সংসদের ভিতরে এবং বাইরে কোনো কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য, আচরণ ও কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই আইনের প্রয়োজনীয়তা, সময়োপযোগিতা ও যথার্থতা প্রতীয়মান হয়েছে বলে তারা অভিমত দেন। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি আইনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বলা হয়, সুনির্দিষ্ট কোনো আচরণবিধি না থাকার কারণে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ বেপরোয়া আচরণ করেন, এমনকি অন্যের প্রতি হুমকি কিংবা অস্বস্তির কারণও হয়ে দাঁড়ান। এ অবস্থায় যথোপযুক্ত আচরণবিধি প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। অনুষ্ঠানে বলা হয়, প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে শাস্তির বিধানও রাখতে হবে এবং সেটি প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে স্পিকারের হাতে। সুশাসনের জন্য নাগরিক - সুজন ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার সভাপতিত্বে আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক মন্ত্রী সরদার আমজাদ হোসেন, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শহিদুজ্জামান সরকার, সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সি এম শফি সামি, সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক সংসদ সদস্য হুমায়ুন কবির হিরু, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এটিএম শামসুল হুদা বলেন, যত দিন ‘রুল অফ ল’ বা সত্যিকার আইনের শাসন বাস্তবায়ন না হবে ততদিন দেশে সুশাসন আসবে না। তাই গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে সংবিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সকল পর্যায়ে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করা না গেলে নতুন নতুন আইন কিংবা আচরণবিধি তৈরি করে কোনো লাভ হবে না। তিনি বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সংসদ সদস্যরা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো স্থায়ী কমিটিতে থাকতে পারবেন না। অথচ আমরা দেখি যে, রিয়েল এষ্টেট ব্যবসায়ী এমপিরা পূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য। তাদের কারণে রাজধানীর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তাই সংসদ সদস্যদের জন্য অনুসরণীয় একটি আচরণবিধিমালা থাকা দরকার। তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় জনপ্রশাসনের ওপর সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে যা বেআইনি। সংবিধান লঙ্ঘন করে এটা করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধ না হলে আইন বা আচরণবিধির কোনো ফল মিলবে না। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনসভা বা সংসদ হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। আর সংসদীয় গণতন্ত্রের চরিত্র এবং গুণগত মান নির্ভর করে সংসদ সদস্যদের নিজেদের চারিত্রিক গুণাবলী, মান ও আচরণের ওপর। একইভাবে সংসদের মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যা নির্ভর করে মূলত তাদের সুনাম-দুর্নামের ওপর। তাই সংসদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে সংসদ সদস্যদের আচরণ সংযতকরণ ও নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এ কারণেই, বিশেষত আইন প্রণেতাদের সদাচরণ নিশ্চিত করার জন্য একটি সংসদ সদস্য আচরণ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। তিনি জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনেই এ ধরনের একটি আইন বা আচরণবিধিমালা পাসের জন্য তাগিদ দেন। মো. শহিদুজ্জামান সরকার বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালীবিধির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তারপরও প্রয়োজন হলে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ ধরনের একটি আইন বা আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে। তবে ভাল ও যোগ্য লোকেরা বেশি বেশি সংখ্যায় সংসদে নির্বাচিত হয়ে এলে সদস্যদের গড় আচরণজনিত সমস্যা দূর হবে। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের ক্ষমতা রয়েছে কোনো সদস্য অসদাচরণ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের। কিন্তু বিগত সময়ে কখনোই কোনো স্পিকারকে এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা যায়নি। অথচ অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেই বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যদি তাত্ক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে স্পিকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন তাহলে নতুন আচরণবিধি আইনের প্রয়োজন হতো না। যেহেতু স্পিকার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না, সে কারণেই এ ধরনের একটি আইন দরকার। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের জাতীয় সংসদের অধিকাংশ সদস্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দিন দিন এই প্রবণতা বাড়ছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। বহার করে সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে ব্যবসা করবেন এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।