২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাকে হামলা চালায়। অভিযোগ ছিল তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু ওই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সেই তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাঁর প্রথম নির্বাচনী প্রচারণার সময় বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধ ভুল ছিল। ইরাকের পর আফিগানিস্তানে এবং পরবর্তীতে লিবিয়ায় অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো। কিন্তু এই তিনটি দেশের মধ্যে ইরাকে এখনো সামপ্রদায়িক সহিংসতা বিদ্যমান। দেশটিতে নিজ সৈন্যদের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হলেও সহিংসতা বেড়েই চলছে। এজন্য বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সিরিয়া হামলা চালানোর আগে ইরাক পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেয়ার আহবান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমত, সিরিয়া যুদ্ধে জড়ানো ঠিক হবে না। সিরিয়া এবং ইরাকের ক্ষেত্রে অনেক মিল রয়েছে। আর অভিযোগও একই। আফগানিস্তান এবং লিবিয়া থেকে সিরিয়া ভিন্ন। যদিও সিরিয়া সরকার রাসায়নিক হামলার কথা অস্বীকার করেছে। এমনকি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন যে, আসাদ সরকার এই হামলা চালায়নি। ইরাকে গত ১০ বছর ধরে যুদ্ধ করতে হয়েছে। আমেরিকান ও অন্যান্য দেশের প্রায় ৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। যুদ্ধে জড়ালেও স্থল হামলা করা ঠিক হবে না। ইরাকে সংঘাত বন্ধে এক লাখ ৬৮ হাজার সৈন্য প্রয়োজন ছিল। আর বর্তমানে পেন্টাগনের হিসাব মতে, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের নিরাপত্তায়ই দরকার প্রায় ৭০ হাজার সৈন্য। এখানে রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে চিন্তা করার অনুরোধ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, ইরাকে হয়তো সাদ্দাম হোসেনকে সহজে সরানো গেছে। কিন্তু সংঘাত এখনো বন্ধ হয়নি। দেশটি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। যদিও হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জে কার্নি বলেছেন, সিরিয়ায় বর্তমান শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য নয়। তাই সিরিয়া থেকে বের হওয়ার কৌশল বাতলানোরও প্রয়োজন নেই। ইরাকে একসময় আল-কায়েদার অবস্থান ছিল না। কিন্তু ২০০৬ সালের মধ্যে সেখানে আল-কায়েদা তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে। আর সিরিয়ায় আল-কায়েদার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এখানে এর শাখা আল-নুসরাত রয়েছে।
তৃতীয়ত, সিরিয়ায় হামলার পরবর্তী অবস্থার জন্য অবশ্যই প্রস্তুত হতে হবে। গত জুলাইয়ে ইরাকে সামপ্রদায়িক সহিংসতায় অনেক নিহত হয়েছে। যা ২০০৬ ও ২০০৭ সালের চেয়েও অনেক বেশি। সিরিয়ার এই সামপ্রদায়িক সংঘাত আরো বড়। এখানে আসাদের বংশ আল-আওলাতি, শিয়া, সুন্নি, কুর্দস রয়েছে। রয়েছে খ্রিস্টানও। প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার এই দেশটিতে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সহজে সম্ভব নয়। এখানকার সম্প্রীতি বিনষ্ট করা খুবই কঠিন। সরকার বিরোধীদের বিশেষ করে সুন্নিদের বিরুদ্ধে আড়াই বছর ধরে যুদ্ধ করলেও আল-আওলাতি ও খ্রিস্টানদের আসাদকে সমর্থন দেয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই, এমনকি পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের মধ্যেও। তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে এর ওপর।
চতুর্থত, কেবল সামরিক দিকটিকে গুরুত্ব দিলে হবে না। সাদ্দাম এবং গাদ্দাফির মতো আসাদকে হয়তে সরানো সহজ হবে। ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেক দেশের জনগণ বিক্ষোভ শুরু করে। মিত্র দেশগুলোতেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়। জাতিসংঘকে তোয়াক্কা না করে বুশ প্রশাসন ইরাকে হামলা করে। অন্য দেশ কি ভাবলো সেটাকে গুরুত্ব দেননি বুশ। সেই ইরাককে স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। বর্তমানে সিরিয়ায় হামলায় রাশিয়া, চীন বিরোধিতা করেছে। ব্রিটেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন চেষ্টা চালালেও পার্লামেন্টে হামলার পক্ষে বিরোধীদের সমর্থন পাননি। জার্মানি এবং কানাডা না করে দিয়েছে।
আরব লীগ এবং ওআইসি রাসায়নিক হামলার নিন্দা জানালেও সামরিক হামলার বিরোধী। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিমা বিমানবাহিনী সিরিয়ার সামরিক শক্তি অবসানে দেশটির জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে সিরিয়াও এর আগে দু’বার মার্কিন বিমান ভূপাতিত করেছিল। বিমানের মাধ্যমে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সরাসরি প্রতিপক্ষের বিমান হামলা হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিমান চালকদের নিজস্ব আত্মরক্ষার কৌশল ও প্রযুক্তি রয়েছে। বিমান প্রতিরক্ষার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গী সামরিক জোটের নৌ-হামলার জবাব দিতে সিরিয়ার অস্ত্রাগারে তুরুপের তাসের মতো রয়েছে উপকূলভিত্তিক অ্যান্টি শিপিং মিসাইল। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া থেকে আনা সুপারসনিক অ্যান্টি শিপিং মিসাইল ‘তোমাহক’। ন্যাটো ব্যুহে এর পরিচিতি এসএস-এন-২২ নামে। তবে সিরিয়ার জন্য চিন্তার বিষয় এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ‘তোমাহকের’ আওতার বাইরে অবস্থান নিতে পারে।
তুরস্কে হামলা চালিয়ে এ পথে হাঁটতে শুরু করতে পারে আসাদ বাহিনী। একইভাবে জর্ডানে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর উপর হামলা করতে পারে। আরেকটু আগ বাড়িয়ে পারে ইসরাইলে ব্যালেস্টিক মিসাইল ছুঁড়ে দিতে। লেবাননভিত্তিক শিয়া নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী সংগঠন হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই বলেছে, আসাদকে হুমকি দেয়া হলে তারা ইসরাইল হামলা করবে। ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবে সিরিয়া ইসরাইল ও পশ্চিমা দেশসমূহে হামলা চালাতে হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনকে কাজে লাগাতে পারে।
পঞ্চমত, ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে নজর দিতে হবে ওবামা প্রশাসনকে। ওবামা তার প্রথম নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধ ভুল ছিল। লিবিয়ায় হামলার সময় বলেছিলেন, সেখানে নৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান নিতে হয়েছে এবং হামলা করতে হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে। সৈন্য নিহতও হচ্ছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার কারণে সিরিয়ায় বেসামরিক নাগরিকের হতাহতের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে।
যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র: সিরিয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়ানোর পেছনেও কারণ রয়েছে। গত দু’বছর ধরে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চললেও ওবামা প্রশাসন কার্যত কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু এখন করতে হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার জবাব না দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রসহ সারাবিশ্বের জন্য হুমকি। আসাদ সরকার মনে করবে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারাবিশ্বের হুমকি প্রত্যাখ্যান করা যায় এবং এটা পরবর্তীতে আরো হামলাকে উত্সাহিত করবে। উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের জন্য এই হামলা একটা অশনি সংকেত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামার শঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র ইসরাইল, তুরস্ক, জর্ডান ও ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য বিপজ্জনক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে সিরিয়া। আর এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকি। আর ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র। তাই তাদের দুই দেশের মূল লক্ষ্য বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করা।
রাশিয়া এবং চীন কেন সিরিয়ার পক্ষে: রাশিয়ার দাবি, আসাদ সরকার এই মুহূর্তে রাসায়নিক হামলা চালাবে না। আল-কায়েদার শাখা আল-নুসরাহ গ্রুপ এই হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলায় অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। রাশিয়া ও চীন কেন সিরিয়ার পক্ষ নিচ্ছে বা সিরিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে তা নিয়ে বিশ্লেষণী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন) অনলাইন। রাশিয়া দু’টি কারণে সিরিয়াকে সমর্থন দেয়। একটি অর্থনীতি এবং অন্যটি আদর্শ।
সিরিয়ায় অস্ত্র সরবরাহকারীদের মধ্যে বড় দেশ রাশিয়া। সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রাশিয়া ও ইউরোশিয়া প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক জেফরে মানকোফে জানান, সিরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পে চুক্তির পরিমাণ ৪শ’ কোটি মার্কিন ডলারের ওপরে। তিনি জানান, ২০০৯ ও ২০১০ সালে বছর প্রতি সিরিয়ার কাছে ১৬ কোটি ২ লাখ মার্কিন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ জেট নিয়ে সিরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ৫৫ কোটি মার্কিন ডলার অর্থের চুক্তি আছে। সিরিয়ার তারতুস নৌ-বন্দরে রাশিয়ার নৌঘাঁটি রয়েছে। আদর্শগতভাবে রাশিয়ার মূল নীতি হচ্ছে সিরিয়া ও তার আশপাশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত রাখা। রাশিয়ার বিশ্বাস- বিপ্লব, যুদ্ধ আর শাসকের পরিবর্তন স্থিতিশীলতা বা গণতন্ত্র আনতে পারে না। তাছাড়া ভূ-মধ্যসাগরে নিজের নৌ-উপস্থিতিকে অটুট রাখতে রাশিয়া শুধু প্রেসিডেন্ট আসাদকে সমর্থন দিচ্ছে না, এর পেছনে রয়েছে এনার্জি চুক্তি বা ‘সরকার পরিবর্তনে’ পশ্চিমা প্রভাবকে মোকাবিলা করা। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি রোগোজিন টুইটারে বলেন, বানর যেভাবে গ্রেনেড নিয়ন্ত্রণ করে তেমনিভাবে পশ্চিমারা ইসলামী বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে।
সিরিয়ার সঙ্গে চীনের মূল সম্পর্ক অর্থনীতির। ইউরোপিয়ান কমিশনের মতে, ২০১০ সালে চীন সিরিয়ায় রফতানিকারকদের মধ্যে তৃতীয় স্থান লাভ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ ইন্সটিটিউট দ্য জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের ২০১০ সালের প্রতিবেদন মতে, সিরিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে দেখছে চীন। কিন্তু এর পেছনে আরও বড় কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। লিবিয়ার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না চীন। সিরিয়ার ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করছে চীন।
