বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ব্যাপক সচেতনতা এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন বক্তারা। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে মাদকের উত্স বন্ধ ও মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অভিভাবক, পরিবার, নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনের সঙ্গে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভার প্রধান অতিথি ছিলেন কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা.আনোয়ারা সৈয়দ হক। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্রাইম এন্ড অপারেশন যুগ্ম পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের মনোরোগ ও মাদকাসক্তি চিকিত্সা বিশেষজ্ঞ ডা. এম এ মোহিত কামাল। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানম।
অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, সমাজে যে মাদকের ব্যবহার বাড়ছে সেদিকে রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসনের দৃষ্টি নেই। মাদকাসক্ত হাসপাতালে সাইক্রিয়াটিস্ট নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এদিকে দৃষ্টি নেই। বাবা-মা সন্তানের মনের খবর রাখছি না। সন্তানকে প্রতিযোগিতায় পরীক্ষায় প্রথম হবার জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকে। এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার কারণে সন্তানের উপর অকারণ চাপ দেয়া হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে পরিবারের সদস্যদের। একজন ঐশী কীভাবে এত হিংস্র হয়ে উঠল এই বিষয়টি সমাজ ও পরিবারের সদস্যদের উপলব্ধি করতে হবে। সন্তানদের সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, চিত্রকলা এসবের বোধ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি আমরা। এভাবে তাদের নৈতিক আদর্শ থেকে সরিয়ে রাখছি। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, আমরা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক একটি অস্থিরতার মধ্যে বাস করছি। সমপ্রতি যে সব ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে আমরা স্তম্ভিত। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে আমাদের সন্তানকে হত্যাকারী হতে বাধ্য করছি।
অধ্যাপক ড. মো. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, ঐশীর ঘটনা আমাদের একটি মানসিক চাপ ও শঙ্কা তৈরি করেছে। বাবা-মার প্রতি সন্তানের থাকবে ভালোবাসা—এই বেসিক ফেব্রিকটা ভেঙে গেলে বোঝা যায় সমাজে একটা পরিবর্তন ঘটছে। নিয়ন্ত্রিত সমাজ থেকে উন্মুক্ত, পুঁজিবাদী, বিশ্বায়িত সমাজের দিকে যাচ্ছি। নগরায়নের এই স্বাধীনতায় কীভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেখানে মাদকের সম্পর্কটা ভাবতে হবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মাদকের উত্স বন্ধ করতে প্রশাসনের যেমন ভূমিকা রয়েছে তেমনি স্থানীয় নাগরিক সমাজের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার থেকেও এবিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই সময়ে পরিবারের সকল সদস্যের মানবিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে হবে।
যুগ্ম পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান বলেন, মাদক অন্যান্য বড় অপরাধের উত্স। আমাদের সমাজ ও প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এটা বন্ধ করতে হবে। আমাদের সন্তানকে মাদককে না বলার শক্তি অর্জনের জন্য পারিবারিক প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষা বাড়াতে হবে।
ডা. এম এ মোহিত কামাল বলেন, আমরা নৈরাশ্যবাদী নই, আমরা আশাবাদী। সন্তান কেন বাবা-মায়ের বিরুদ্ধ পক্ষ হয়ে যাচ্ছে—এই বিষয়টি ভাবতে হবে। মাদকাসক্ত সন্তানকে দোষারোপ করা যাবে না, দোষারোপ করলে সন্তান বাবা-মাকে আপন ভাবতে পারবে না। বাবা-মাকে তখন সহমর্মী হয়ে সন্তানের পরিস্থিতিকে অনুভব করতে হবে।
আয়শা খানম বলেন, সমাজের বিবেক জাগ্রত হোক। বর্তমানের বিশ্বায়িত পরিস্থিতিতে আমরা পোশাকটা পরেছি, কিন্তু আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতির মধ্যে সেটা সমন্বয় করছি না। আমাদের প্রত্যেককে নিজের জায়গায় থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন, দায়বদ্ধ ও দায়িত্বশীলভাবে দাঁড়াতে হবে।
সভায় উপস্থিত অভিভাবকদের মধ্যে দু’জন অভিভাবক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ‘কান পেতে রই’ এর হেলপ লাইন কো-অর্ডিনেটর রোজিনা হোসেন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
