বর্তমান লেখায় আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্য-উপার্জনের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কয়েকটি ঝোঁক শনাক্ত করার চেষ্টা করব। ঝোঁকগুলো তাঁর ব্যক্তিগত অভিলাষ, শখ, সাধ, স্বপ্নের একেকটি ছোট ছোট অধ্যায়। এই অধ্যায়গুলো মিলে তাঁর ব্যক্তিগত সমুদ্রজলে উথালপাথাল ঢেউয়ের জন্ম দিয়ে গেছে। আমরা দেখব, সেই ঢেউগুলো কখন কোন পরিবেশে তাঁর গায়ে এসে তোলপাড় করেছে।
ঝোঁক শনাক্তকরণের আগে ফয়সালা করে নিই এক তাত্ত্বিক বিভাজনের। ইনসটিংক্ট ও ইনটিলেক্ট, দুইয়ের নিকটস্থ বাংলা-অর্থ যথাক্রমে প্রবণ ও উপার্জন; লেখক এই দুই ঝোঁক ও আত্মতার আলোকে টেক্সটের নিজস্ব রূপ সৃষ্টি করেন। লেখকের সহজাত আচারে বিশেষ মাত্রার কিছু ইনসটিংক্ট জোরালোভাবে দৃশ্যমান। পুনশ্চ লেখকের মানসবিকাশে অনন্য মাত্রার ইনটিলেক্ট তাঁর সহজাত আচারে প্রজ্ঞার সহাবস্থান সৃষ্টি করে। এই বিচারে মোটাদাগে লেখকের তিন ধারা : কোনো-কোনো লেখক ইনসটিংক্টপ্রধান, কেউ ইনটিলেক্টশাসিত, কেউ আবার দুুইয়ের মিলনে অনন্যসাধারণ। আবদুল মান্নান সৈয়দ তৃতীয় ধারার শিল্পী। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে-বড় ঢেউটি তাঁকে ওলটপালট করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সে-তাঁর হূদয়বান সত্তা। তাঁর জীবনের প্রায় সব টেক্সট আবেগী, সংরাগী ও ক্ষিপ্রতাগামী। এসবের নেপথ্যের কারণ তিনি হাড়েমজ্জায় কল্পনাপ্রবণ। অন্যদিকে পাঠ, শ্রমনিষ্ঠতা, নিবিষ্টতা তাঁর লেখক-সত্তার বিশেষ উপার্জন। মান্নান সৈয়দ ‘আমার বিশ্বাসে’ বইয়ে অকপটে বলে গেছেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই আমি অসম্ভব কল্পনাপ্রবণ; আমার কল্পনা ঈশ্বর বা প্রকৃতির দান, তার জন্যে কোনো চেষ্টা করতে হয়নি আমার। কিন্তু বুদ্ধি, মনন, চিন্তাচর্চা এসব আমার নিজস্ব উপার্জন।’ জীবনের চেয়ে শিল্পকে কম ভালোবাসেননি তিনি। কখনো-কখনো জীবনের চেয়ে কিছু মাত্রায় বেশি বৈকি। অতিমাত্রায় ব্যস্ত লেখক ছিলেন। সমকালীনদের মধ্যে তাঁকে ব্যস্ততম লেখক বললে কেউ বিরূপ হবেন না নিঃসন্দেহে। লেখার জন্য সময়ের একটি ফোঁড়ও ফুরিয়ে যেতে দেননি।
মান্নান সৈয়দ স্কুল-জীবন থেকেই ছিলেন খুব শান্ত নির্জন স্বভাবের। সময় কাটাতেন অনেকটা একাকী। ছিলেন কিছুটা দলছুট। কিছুটা আত্মগোপনকারী কিশোর। তাঁর এই আত্মগোপনকারী স্বভাবের ভেতর লুকিয়ে ছিল এক গভীর আবেগী সাহিত্যিক মন। স্কুলে পড়ার সময়ই সাহিত্যিক হওয়ার কিছু বৈশিষ্ট্য তাঁর স্বভাবে প্রতিভাত হয়েছিল। কলেজে উঠে সেই প্রতিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে। এক-এক করে সতীর্থ ও পূর্বজের স্বীকৃতি তাঁকে প্রবল আত্মবিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে যায়। এরপর তাঁর লেখার ট্রেন চলতে শুরু করে অবিরল ধারায়। কোনো স্টেশনে বিরতি না-নিয়ে ইঞ্জিন তার বগি নিয়ে চলল নানা দিকে এঁকেবেঁকে শাখায়িত হয়ে। বলা চলে, লেখায় অবিরল নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য না-থামা এক ট্রেনের নাম মান্নান সৈয়দ।
মান্নান সৈয়দের সবচেয়ে বড় ঝোঁক তিনি রাতদিন-সকালদুপুরসন্ধ্যা, যখন পেরেছেন দুচোখে পড়েছেন, দুহাতে লিখতে বসেছেন। রাতে হঠাত্ ঘুম ভেঙে গেলে পুনর্বার ঘুমের জন্য ব্যতিব্যস্ত হননি, বরং লিখতে আর বই পড়তে পড়তে কাটিয়ে দিয়েছেন রাতের নির্জনতা। লেখার সূত্রপাত করেন ষোল-সতের বছর বয়স থেকে। নতুনভাবে নিজস্ব ভাষায় নতুন কিছু লেখার চিন্তা সব সময় তাঁর মাথায় ঘিরে থাকত। সময়ের প্রতিটি বিন্দুকে তিনি সাহিত্যের কাজে লাগিয়ে বিপুল আনন্দ অনুভব করতেন। সাহিত্য-শিল্পের নিমগ্নতায় একেবারে বিভোর হয়ে থাকতেন। ফলে অগণন বিষয় ও চিন্তা তাঁর মাথা থেকে কলমের ডগায় চলে আসত অনায়াসে।
মান্নান সৈয়দের সাহিত্যবোধের এক বড় ঝোঁক তাঁর ডিসকোর্স। ভাষা নিয়ে নিজস্ব একটি ডিসকোর্সে পৌঁছে যাওয়া, নতুনত্বে ও নিরীক্ষায় ডুবে থাকা, প্রচলিত সাহিত্যধারায় আলাদা কিছুর আমদানি করা কিংবা যত বিতর্কই সৃষ্টি করুক, মানবমনের অবচেতনে লুকানো যৌনতা ও জীবনবিভ্রমের ছবি তাঁর লেখার মধ্যে নান্দনিক কুশলতা দিয়ে উপস্থাপন করা ছিল প্রথম জীবনের বড় আকর্ষণের কেন্দ্রভূমি। একসময় শিল্পবোধই ছিল জীবন, পরে শিল্প এসেছে জীবনের হাত ধরে সমান্তরাল রাস্তায় হেঁটে হেঁটে।
সব বিষয়ে, সব ধারায় ঝুঁকে থাকাও তাঁর বড় অভিলাষ ছিল। গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-সমালোচনা-নাটক-উপন্যাস-চিত্রকলাসহ আধুনিক সকল সাহিত্য-উদ্ভাবনার ভেতর তিনি সৃষ্টির আঁচড় দিয়েছেন। ১৯৪৩ সালের ৩ আগস্ট তাঁর জন্ম, লিখেছেন ষোল-সতের বছর বয়স থেকে, পৃথিবী-বিচ্ছিন্ন হয়েছেন ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। যোগ-বিয়োগের হিসাবে ৬৭ বছরের জীবনে তিনি ৫০টি বছরই সাহিত্যের পথে নিবেদন করেছেন। অর্ধশত বছরের লেখক-জীবনে প্রণয়ন করেছেন প্রায় দেড় শতাধিক বই। খুব কম নয়। সাহিত্যের জন্য নিষ্ঠাবান, নিরবচ্ছিন্ন ও প্রবল আন্তরিকতায় নিবেদিত ছিলেন বলেই বইয়ের সংখ্যা ও একইসঙ্গে প্রতিটি বইয়ের গুণের বিচারে তিনি তাঁর সমকালে অতুলনীয় কাজের নিদর্শন রাখতে পেরেছেন।
মান্নান সৈয়দ ছিলেন সৈয়দ-পরিবারের একমাত্র লেখক, সেজন্য বাবার লেখা অনেক ডায়েরি তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। এসব ডায়েরির নির্বাচিত অংশ একদিন প্রকাশেরও সাধ মনে ধরেছিলেন তিনি। সেই অভিলাষ আর পূরণ হলো কোথায়!
মান্নান সৈয়দের ব্যক্তিগত ফ্যাশানেও ছিল বিশেষ ঝোঁক। তিনি ছিপছিপে গড়নের লম্বাটে মানুষ ছিলেন। পোশাকেআশাকে তিনি ছিলেন বেশ নায়কোচিত। ষাটের দশকে অনেক লেখক-শিল্পীকে দেখা যেত মাথায় লম্বা কেশ রাখতে। মান্নান সৈয়দ ষাটের সন্তান হয়ে লম্বা কেশ রাখার এই ফ্যাশানকে আমৃত্যু গ্রহণ করেছেন। রংবেরংয়ের প্যান্ট-শার্ট-টাইয়ের বিন্যাসে মাথার লম্বা চুলের ফ্যাশান তাঁর অবয়বে বিশেষত্ব তৈরি করেছিল। বিভিন্ন দোকান থেকে পছন্দমাফিক তৈরি শার্ট ও পাঞ্জাবি কিনতেন। প্যান্ট বানাতেন নিউমার্কেটের অ্যাপোলো দোকান থেকে। খুব উজ্জ্বল রংয়ের পোশাকেই তাঁকে বেশি দেখা যেত। শিক্ষিত ঢাকাবাসী যখন হালকা রংয়ের পোশাক পরে নিজেদের স্মার্টনেস প্রদর্শন করার কথা ভাবতেন, মান্নান সৈয়দ বিপরীতে কড়া রংয়ে নিজেকে ভিন্ন মাত্রা দিতে ভালোবাসতেন। এটার কারণ হতে পারে, নিজেকে চিরকাল রংয়ের কড়াকড়ির ভেতর দিয়ে তারুণ্যময় রাখা কিংবা আর সবার চেয়ে নিজের ফ্যাশানকে আলাদা করা। হাতে ব্রেসলেট পরার অভ্যাস ছিল তাঁর। কেউ ব্রেসলেট উপহার দিলে ভীষণ খুশি হতেন। শেষ বয়সে মাথার কেশে স্বল্পতা দেখা দেওয়ায় নানান রংয়ের হ্যাট আর ক্যাপ পরতেন। জীবনের শেষ দশ-পনেরটি বছর তাঁকে হ্যাট-ক্যাপেই বেশি দেখা গেছে। মান্নান সৈয়দ সৈয়দ-পরিবারের সকল সদস্যের প্রিয়মুখ ছিলেন। রসপূর্ণ কথা বলে খুব হাসাতেন পরিবারের সকলকে। খেলাধুলার প্রতিও তাঁর ঝোঁক কম ছিল না। ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতেন। কেরামও খেলতেন ভালো। ঠাট্টার ছলে মাঝে মাঝে বলতেন, লেখক না হলে তিনি খেলোয়াড় হতেন।
আড্ডার প্রতি ছিল তাঁর নিত্যঝোঁক। তিনি বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা শহর চষে বেড়িয়েছেন। আড্ডার কেন্দ্রভূমি ছিল নিউমার্কেটের তিনকোনা মাঠ, এখন যেখানে মসজিদ হয়েছে। এই মাঠে ষাটের আরও লেখকের সঙ্গে বিকেল-সন্ধ্যা-রাতের আড্ডায় মেতে থাকতেন মান্নান সৈয়দ। তাঁর শিক্ষায়তন ছিল রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল, নবাবপুর হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রাবস্থায় সাইকেলে চড়ে বেড়াতেন তিনি। রিকশা ছিল তাঁর অন্যতম পছন্দের বাহন। ঢাকার আশপাশে পত্রিকা অফিসে, সরকারি-বেসরকারি অফিসে, ছাপাখানায়, কেনাকাটায় মার্কেটে, দর্জির দোকানে, রেস্তোরাঁয়, বইয়ের মার্কেট আজিজ সুপার কিংবা নিউমার্কেটে সর্বত্রই যাতায়াত করার জন্য তিনি রিকশাকে করেছিলেন নিত্যবাহন। রিকশার প্রতি তাঁর অদ্ভুত ঝোঁকও ছিল। তিনি কখনো ভাড়া ঠিক করে রিকশায় উঠতেন না। রিকশায় ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নেওয়া অপছন্দ করতেন। প্রায়শই বেশি ভাড়া দিয়ে খুশি করে দিতেন রিকশাওয়ালাকে। অবশ্যি জীবনের শেষ কয়েকটি বছরে প্রিয়বাহন রিকশাকে পরিহার করতে হয়েছে। হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে শেষপর্যন্ত চড়তে হয়েছে প্রাইভেট কারে।
খাওয়াদাওয়ার মধ্যে মান্নান সৈয়দ গোশত বেশি পছন্দ করতেন। হালুয়াও ছিল তাঁর প্রিয়খাদ্য। ফলের মধ্যে কমলালেবু খেতেন বেশি। খুব বেশি চা খেতেন, অগুনতি কাপ। রংয়ের চেয়ে দুধ চা বেশি খেতেন। অল্পবয়সে একসময় সিগারেটও খেয়েছেন। ওই বয়সে নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় ডাক্তার ধূমপান থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাই চিরকালের মতো ধূমপান পরিহার করেন। ডায়েরিমূলক রচনায় তিনি কয়েক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, সিগারেট খেতে পারতেন না বলে আফসোসও ছিল তাঁর।
মান্নান সৈয়দ গান বেশি শুনতেন রবীন্দ্র-নজরুলের পাশে বেঠোফেনের আচ্ছন্ন সুর। বেঠোফেন নিয়ে পড়াশোনাও করেছেন অনেক। বেঠোফেনে মত্ত থেকেছেন জীবনের বেশ কিছুটা কাল। বেঠোফেন ছিল তাঁর প্রিয় মানুষ। বেঠোফেনের জীবনবৃত্তান্ত পড়ে একসময় মুগ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মন দিয়ে পড়েছেন—‘বেঠোফেন : দি কম্পোজার অ্যাজ হিরো’। আবৃত্তি পছন্দ করতেন মান্নান সৈয়দ। নিজের লেখা নিজে আবৃত্তি করতেন। শুদ্ধ উচ্চারণে সুস্পষ্ট ধ্বনি প্রয়োগে কথা বলতেন তিনি। বক্তৃতায় ভাষণে তিনি সুললিত কণ্ঠে প্রমিত উচ্চারণে নিজের মেধা ও সৃষ্টিশক্তিকে মেলে ধরতেন। আড্ডায় আলাপেও তিনি সুস্পষ্ট ধ্বনি উচ্চারণকে গুরুত্ব দিতেন। আড্ডায় তাঁর বাক্যালাপ কোনো আড়ষ্টতা তৈরি করত না, বরং প্রমিত বাক্য প্রয়োগ ও উচ্চারণও যে খোলামেলা আলাপের দরোজা উন্মুক্ত করে দিতে পারে—এক-মান্নান সৈয়দ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
মান্নান সৈয়দ নিজের নাম অ্যাম্বুশ করা লেখা প্যাডে লিখতেন বেশি। ব্যবহার করতেন কালির কলম বা জেলপেন। লেখার পর নানা রংয়ের কলম দিয়ে স্তবক, যতিচিহ্ন, আন্ডারলাইন-ইটালিক-ঊর্ধ্বকমা ইত্যাদি যা প্রয়োজন মনে করতেন দাগিয়ে দিতেন। শুদ্ধসুন্দর পাণ্ডুলিপি তৈরি করা ছিল তাঁর আরেক অভ্যাস। বানান সংশোধনেও তাঁর আয়ত্ত প্রশংসীয় ছিল। নিজের পাণ্ডুলিপি ও লেখার প্রুফ সংশোধন নিজে করতে পছন্দ করতেন। পত্রিকায়, ছাপাখানায় কিংবা প্রকাশনালয়ে গিয়ে-গিয়ে নিজের বইয়ের প্রুফ দেখতেন। সবমিলিয়ে মান্নান সৈয়দ রুচিবান, পরিশ্রমী, খুঁতখুঁতে, আবেগী ও আমুদে মানুষ ছিলেন। অকারণ অহংকার তাঁর মেধা ও সৃষ্টিপ্রবাহ ঢেকে দেয়নি, বরং যাকে যখন ভালোবেসেছেন, হূদয় খুলে দিয়েছেন।
মান্নান সৈয়দ নিজে ছোটকাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। ছোটকাগজের প্রতি তাঁর নেশার প্রাবল্য দেখা গেছে পুরো আশির দশকজুড়ে। লেখার আমন্ত্রণ দাবি করে ছোটকাগজগোষ্ঠীর যাঁরাই তাঁর কাছে গেছেন, কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছেন—এমন জানা যায়নি। কাগজের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য ছোটকাগজগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের বিপুল উত্সাহ দিয়েছেন তিনি। শুধু আশির দশক কেন, নব্বই থেকে আমৃত্যু তিনি ফোল্ডার প্রকাশ করে নিজের সাম্প্রতিক সাহিত্যসহ নিজপ্রয়াসে আবিষ্কৃত তরুণ প্রতিভার লেখা ছেপে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন নিঃস্বার্থভাবে।
মান্নান সৈয়দের সাহিত্যপাঠ ছিল অপূর্ব, মেধা ছিল অসামান্য, ভাষা ছিল দখলে; সবার উপরে তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অভূতপূর্ব। যখন যা লিখেছেন, যে শাখায় লিখেছেন, নিজস্বতার সাক্ষ্য রেখেছেন অবিস্মরণীয়ভাবে। শুধু লেখা নয়, বক্তা হিসেবেও তিনি ঈর্ষণীয় ধীশক্তি ও চৌকষ বিশ্লেষণের পরিচয় দিয়েছেন। যে ধারার ভেতর বুঁদ হয়ে কাজ করেছেন তিনি সে ধারাকেই তখনকার জন্য শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন।
তাঁর বড় ঝোঁক ছিল সমকালের ঊর্ধ্বে ওঠা। সমকালের আলোবাতাসের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠলেও তিনি ছিলেন সমকালভেদী মানুষ। এই কারণে বিতর্কের ঝড়েও পড়েছেন কখনো কখনো। অনেকেই ঐতিহ্য আর গতানুগতিকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে ফেলেন। এলিয়েট ঐতিহ্যকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আর গতানুগতিকতাকে যতদূর সম্ভব বর্জন করেছেন। মান্নান সৈয়দ সেই জায়গাটি ধরেছেন শক্তভাবে। তিনি ঐতিহ্যের বিস্তার বাড়াতে গিয়ে আধুনিকতার তত্ত্বতালাশ করেছেন, ফলে গতানুগতিকতা তাঁর চেতনা থেকে পরিহূত হয়েছে। গতানুগতিক ধুলোবালির মধ্যে থাকেননি বলে অনেকের কাছে তিনি দুর্বোধ্য।
আবদুল মানান্ন সৈয়দের শনাক্তপ্রবণ মাথা ছিল। সাহিত্যের টুলস বা কলকবজা সম্পর্কে তাঁর ধারণা এতটাই করায়ত্ত ছিল যে যেকোনো লেখার অঙ্গসৌষ্ঠব খুলতে গিয়ে তাঁকে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হতো না। তিনি বলতেন, সাহিত্যের জন্যই সাহিত্যমূল্যায়ন জরুরি। পূর্বজ ও সমকালীন সাহিত্যকে ক্রমাগত বিশ্লেষণ করে সাহিত্যের রূপবৈচিত্র্য নির্ণয় ও নির্ধারণ জরুরি বলে তিনি বিবেচনায় এনেছেন ক্লাসিক, আধুনিক ও হালপর্বের অগণিত লেখকের সৃষ্টিসম্ভার। বাংলা ছন্দ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ ছিল অতুলনীয়। এক্ষেত্রে ছান্দসিক আবদুল কাদিরের পর আবদুল মান্নান সৈয়দের নাম উল্লেখ করা যায়।
মান্নান সৈয়দের আরেক ঝোঁক ছিল চিত্রকলার দিকে। তাই আর্ট কলেজে পড়ার সাধ জেগেছিল তাঁর। খুব অল্প বয়সে ছবি আঁকার নেশা চাপে মান্নান সৈয়দের। বাসনা ছিল আর্ট কলেজে পড়বেন। পরিবার-সদস্যের ব্যাপক সমর্থন না-পাওয়ায় সে-বাসনা ভেস্তে গেছে। আত্মস্বীকৃতিমূলক রচনার এক জায়গায় এ-ও বলেছেন, বাবা বাধ সাধায় তাঁর আর আর্ট কলেজে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পড়ার সুযোগ হলো না। তবে তিনি দুধের সাধ অনেকটা ঘোলে মেটালেন। জীবনের উপার্জনের একটি বড় অংশ আর্টের জগদ্বিখ্যাত শিল্পীদের বই কিনে কিনে জমাতেন। তাঁর বাড়ির এক বিরাট কাঠের আলমারিতে ঠাসা এই মূল্যবান সংগ্রহ। মার্ক শাগাল, সালভাদোর ডালি, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, গোয়াসহ ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজমের নানা বইয়ে ভরে আছে তাঁর আলমারি। বইগুলো শখের বশে কিনেছেন এমন নয়, শিল্পপাগল মনের টানেই তিনি জীবনের সঞ্চয় দিয়ে এই বইগুলো কিনেছেন। বইয়ের মলাটের ভেতর ঢুকলে দেখা যায়, তিনি শুধু ছবি দেখার জন্য বইগুলো সংগ্রহ করেননি। প্রতিটি বইয়ে তাঁর অন্তরঙ্গ পাঠ ছিল। বইয়ের পাতার পর পাতা পেন্সিল দিয়ে দাগানো। আর্টকে তিনি ছেলেবেলা থেকে ভালোবাসতেন, তার সাক্ষ্য তিনি দিয়ে গেছেন বই কিনে বইয়ের পাতায়-পাতায়।
রংবেরংয়ের কলম কিনতেন আর ছবি আঁকতেন মান্নান সৈয়দ। ফ্যাশনেবল দামিদামি কলমে ভরে থাকত তাঁর লেখার ঘর। পাবলো পিকাসোর প্রতি ছিল তাঁর অনিরুদ্ধ প্রেম। ১৯৮০-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি আঁকেন পাবলো পিকাসোর প্রতিকৃতি। ইচ্ছে ছিল তাঁর ওপর একটি বই করবেন। একটি আলাদা খাতাও তৈরি করে তা ভরে তুলেছিলেন লেখায়। বন্ধু আন্ওয়ার আহমদ পিকাসোর ওপর বই করবেন বলে তাগাদাও দিয়ে আসছিলেন কয়েকবার। কিন্তু সেই বই আর বের করা হয়নি। সেই প্রকাশক আর লেখক দুজনই এখন লোকালয় থেকে বহুপথ দূরে, একজন আগে আরেকজন পরে! আহা রে দুনিয়া!
আর্টে পড়ার অনুমোদন না পেলেও বাবা শেষপর্যন্ত ছেলের প্রধান ঝোঁক কোন দিকে তা ধরতে পেরেছিলেন। তাই এবার আর বাধা হয়ে দাঁড়ালেন না তিনি। ছেলের বাংলায় পড়ার ইচ্ছাকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন। ছেলের সাহিত্যসম্ভাবী চেতনাকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন বলে বাবা আর অরাজি ছিলেন না ছেলের বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ায়। তাই ঢাকা কলেজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐহিত্যবাহী বাংলা বিভাগে পড়ার সৌভাগ্য থেকে তিনি আর বঞ্চিত হননি।
মান্নান সৈয়দের স্বপ্ন ও সাধ্যের একেবারেই পরিপূরক হয়ে দেখা দিয়েছিল সেসময়ে দুর্দণ্ড দাপটে আবির্ভূত চার পত্রিকা—স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, কণ্ঠস্বর ও সমকাল। এই চার সেরা কাগজ তদানীন্তন তরুণ লেখকদের স্বপ্নসাধ পূরণের বাহন হয়ে উঠেছিল। মান্নান সৈয়দ ষাটের সে-আমলের সন্তান। এই চার পত্রিকাই সাহিত্যে তাঁর শক্তি ও সম্ভাবনাকে শনাক্ত করতে বিরাট অবলম্বন হয়ে উঠেছিল। তিনি সে-আমলের ছোটবড় সকল কাগজে লিখতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।
মান্নান সৈয়দের ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল। কলেজ-জীবনে একসময় নিজে থেকেই অনেক নোট করতেন। নোটে দুঃস্বপ্নের কথা লিখতেন। কিশোর বয়সে অনেক দুঃস্বপ্ন তাঁর মধ্যে ভর করেছিল। মনে করতেন, এই দুঃস্বপ্নগুলো নোট করে রাখলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। সত্যি তা-ই হতো! তিনি হালকা হতেন দুঃস্বপ্নের নোট জমা করে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সারাটা জীবন তাঁকে কর্মব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ডায়েরি লেখার আগ্রহ প্রবল থাকলেও স্থির ও শান্ত হয়ে কখনো তা লিখে উঠতে পারেননি। যা লিখেছেন নিঃশ্ছিদ্র কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে।
চিকিত্সাবিজ্ঞানের কাঁটাছেঁড়ায় মান্নান সৈয়দের ব্যক্তিগত আস্থা ছিল না কখনোই। শেষের দিকে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তার এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেদিকে সায় ছিল না তাঁর। ফলে হূদরোগ ধরা পড়ার কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের শূন্য করে চলে গেলেন।
মান্নান সৈয়দ সর্বোপরি হূদয়বাদী মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর জীবনের প্রতিটি অব্যর্থ-অল্পব্যর্থ ঝোঁক তাঁকে তাঁর নিজ বৈশিষ্ট্যে সমকাল থেকে পৃথক করেছে। আজ তিনি নেই, তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টির ঢেউগুলো আমাদেরও আবেগে সঞ্চার করে এক-অনিয়ন্ত্রিত তুফান।
