এবার ঈদের ছুটিটা শহর থেকে অনেক দূরে, গভীর জঙ্গলে লেকের পাড়ে কটেজে কাটাব। এই সিদ্ধান্তে বেঁকে বসল আমার ছোট মেয়ে অর্জিতা। কারণ, সে টরন্টোতেই ঈদ করবে বান্ধবীর সাথে। বড় মেয়ে খুবই এক্সাইটেড, অন্য রকম হবে ঈদের আনন্দটা। আর অপি দুই মেয়ের মাঝমাঝি। অর্জিতাকে আমরা ম্যানেজ করতে পারলাম না। পরে জাদুমন্ত্রের মতো মুহূর্তের মধ্যে পটিয়ে ফেলল অনাদি। একেই বলে বোনে বোনে খাতির। তারপর প্রায় সারারাত চলে তাদের প্রস্তুতি, গোছগাছ। জামা-কাপড়, জুতো, লেপটপ, চার্জার থেকে শুরু করে আমাদের ঔষধপত্র লাগেজে ভরার ধুম চলল। কারণ, সাত-আট দিনের অবকাশ।
সকাল ১১টায় আমরা বড় বড় দুইটা লাগেজ নিয়ে হৈ চৈ করে ২২তলা থেকে নামতেই লিফটে এক বাঙালি মহিলা বললেন, কী ভাই, ঈদে দেশে যাচ্ছেন বুঝি? আমাদের যাত্রাটা অনেকটা সে-রকমই ছিল।
বাসার থেকে মাত্র দু-মিনিটের দূরত্ব ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ে। তাই আমাদের প্রথম যাত্রা শুরু হলো জার্নি বাই ট্রেনে। ট্রেনে করে লাস্ট স্টপিজ কিপলিং স্টেশনে নামার সাথে সাথেই মুনির ভাইয়ের ফোন। ‘দুলাল ভাই, আপনারা কোথায়?’ তিনি পার্কিংলটে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আমি বললাম, ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্য আমাদের দেখতে পাবেন। অবশেষে আমরা তাঁর গাড়িতে চড়ে বে সাইট কটেজের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। দুই মনিরের সৌজন্যে দুই গাড়িতে আমরা দশজন যাচ্ছি। টরন্টো থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টার পথ। কানাডার নর্থ-ইস্ট অন্টারির টাবোরমরি একটি পর্যটন এলাকা। টাবোরমরির পানি পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং বিশুদ্ধ পানি। এক দিকে বিশাল হিরণ লেক আর অপর দিকে জরজিয়ান বে অর্থাত্ জরজিয়ান উপসাগর। মাঝে নদী-নালা-ঝরনা, পাথর-পাহাড়, বন-জঙ্গলের অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে নান্দনিক টবোরমরি। খুবই ছোট্ট শহর। সামারে পর্যটকদের ভিড়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। হোটেল-মোটেল-পার্কিং-ঘোরাঘুরিতে স্পট পরিপূর্ণ থাকে। আর শীতকালে পরিণত হয় বরফে ঢাকা এক মৃত শহর বা গ্রামে। গ্রাম বললাম এজন্য যে, ছোট্ট মূল শহর টবোরমরি ছাড়া পুরো এলাকা গ্রামের মতোই। সবধরনের নেওটয়ার্ক, স্কুল-কলেজ, ব্যাংক, অফিস ইত্যাদি বাণিজ্যিক শহরের ছোঁয়া নেই বললেই চলে। তবে হোটেল-মোটেল-কটেজে-মিউজিয়ামে ভরতি। সামারে জমজমাট। আর শীতকালে বিশাল এলাকায় মাত্র পাঁচশ (মতান্তরে নয়শ) লোক বসবাস করে। এখানে পুলিশফাঁড়ি নেই। দেড় ঘণ্টার দূরত্বে শহর থেকে প্রতিদিন পুলিশ টহলে আসে। লাইন্স হেডে একটি মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত হাইস্কুল। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও খুব কম। সপ্তম শ্রেণী থেকে পড়তে হলে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে হো ইন সাউন্ট সিটিতে যেতে হয়। টবোরমরিতে নামমাত্র হাসপাতাল, তাও ওয়াকিং ক্লিনিকের মতো। রয়েল ব্যাংকের মাত্র তিনটি শাখা আছে। যা শীতকালে সপ্তাহে ২-৩ দিন খোলা থাকে। এ যেন কানাডার এক অজ পাড়াগাঁ।
তবে ৫৩ নং হাউর বোম্যান রোডে অবস্থিত আমাদের বে সাইড কটেজে ওয়াইফাই ছিল। কিন্তু তা খুবই স্লো। তিন স্তরবিশিষ্ট ডুপ্লেক্স কটেজের ভেতরটা দারুণ সুন্দর। আর বাইরে চারদিকে ঘন বন। সামনে লেকের শাখা। ঠিক হিরণ লেকের মোহনায় এই কাঠের কটেজ। পা ঝুলিয়ে বসলেই পানি, হাত বাড়ালেই জল। রাতে শরত্চন্দ্রের ঘনকালো অন্ধকারে আমরা ফায়ার ক্যাম্প করে বারবিকিউ করলাম। ওসব নিয়ে কবিতা না লিখে কি থাকা যায়?
‘কটেজের গুড়ালিতে পপের মতো চুমু খাচ্ছে লেকের জল
জল আর বাতাসের যৌথ কথোপকথনে মেতেছে বনপরি।
হাতগুলো জিরাফের মতো লম্বা হয়ে ভিজে জলজোছনায়
স্কটল্যান্ডের স্কস গ্লাসে মাতলামো করে ক’টুকরো বরফবন্ধু।
পাথর ঘষা ফায়ার ক্যাম্পে জ্বলসে ওঠে লাল ফ্রকের স্তন।
আগুনের যৌবন দেখে লোভী হয়ে ওঠে আকাশের অন্ধকার’।
কটেজের ওপাড়ে একটি পাহাড়ি দ্বীপ। পাড়ের বাসাবাড়ি বা কটেজগুলো মনে হয় মায়াবী নিবাস, মনে হয় পরিদের বসতবাড়ি, কুমারী পাড়া। সবুজে ঘেরা প্রত্যেক কটেজ থেকে ধাপে ধাপে নিচে নেমে গেছে আঁকাবাঁকা বা প্যাঁচানো অথবা সোজা সিঁড়ি। ঘাটে ঘাটে ছোট ছোট বোট। শিল্পীদের তুলিতে তা হবে আরও অতুলনীয়!
এখানে এসে মন্ট্রিয়লের সেই প্রেইরি নদীর পাড়ে ঘন অরণ্যের আলো-ছায়া-রোদ-বৃষ্টির ভেতর বোয়া দ্য লিয়েজ কটেজে রাকীব-মনিকাদের তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উত্সব আর নির্মল জমজমাট আড্ডার কথা মনে পড়ল।
মোহাম্মেদ মুনিরুজ্জামান মানে আমাদের স্বপন ভাই আরও দুই বার টবোরমরিতে এসেছিলেন। তাঁর নখদর্পণে সবকিছু। তিনি জানালেন, এবার ইউরোপে ভেকেশনে না গিয়ে এখানে এসেছেন। কারণ, এলাকাটা তাকে খুব টানে। ফ্লোরিডার একটা স্বাদ আছে আর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য খুবই মুগ্ধকর।
দ্বিতীয় দিন আমরা শহর দেখতে (পক্ষান্তরে গ্রাম) বেরোলাম। হাজার বছরের ইতিহাস ধারণ করে আছে এই টবোরমরি। তবে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে একশ কুড়ি বছর ধরে। সেই তুলনায় আধুনিকতার ছাপ নেই। এখানে সচেতনতার সাথে ইচ্ছাকৃতভাবেই গ্রামীণ ভাবটা ধরে রাখা হয়েছে। যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট না হয়। আগে দ্বীপগুলো ব্যক্তিমালিকানায় ছিল। পরিবেশ রক্ষার কারণে সরকার তা কিনে নিয়েছে।
আমরা লাইন্স সেন্টার সাইডের গভীর জঙ্গলে হাঁটতে গিয়ে তার অনেক দৃষ্টান্ত দেখতে পেলাম। ঘন বনের ভেতরের সবকিছু অরক্ষিত। কোথাও সামান্য কোনো ধরনের পরিবেশ-ভারসাম্যের ছাপ নেই। পর্যটকেরা যাতে পথ ভুলে অন্য দিকে না যায়, তাই একটু দূরে দূরে গাছে গাছে নীল চিহ্ন দেওয়া। কোথাও কোথাও লেখা—‘নিজের দ্বায়িত্বে ভ্রমণ করুন’। যথারীতি ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর আমরা গভীর অরণ্যে পথ হারালাম। ফলে আমাদের আর বন পেরিয়ে শেষ প্রান্তের ওয়াটার স্পট দেখা মাটি হয়ে গেল। অগত্যা ফেরার পালা। কিন্তু পথপ্রদর্শক মুনির ভাই উল্টো পথ দিয়ে ফিরে আসার জন্য সামনে এগোতে থাকলেন। দুপুর বেলায় সূর্যের আলো থাকা সত্ত্বেও ঘন সবুজের নিচে শীতল ছায়া-ছায়া অন্ধকার। পাতা আর মাটির মেশানো ভ্যাপসা গন্ধ। পাতা পরে পচে স্তূপ হয়ে আছে। পড়ে আছে তৃণমূল, গাছ, গাছের শেকড়, ডালপালা, লতাপাতার শাখা-প্রশাখা। গর্ত, উঁচুনিচু, আঁকাবাঁকা অদ্ভুত পথ। মনে হচ্ছে, এ পথে হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা পদচিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন। মুছে যাওয়া সামান্য স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে। তা-ই অনুসরণ করে হাঁটছি। একটা বনমোরগ ঝাঁপ দিয়ে ডেকে উঠল। ভয়ে ভীতু অপি আমাকে জড়িয়ে ধরল। একটু পর আমার পা পড়ে গেল পাতা-ঢাকা গর্তে। মনে হলো, চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছি। একটা গাছের ডাল ধরে উঠলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমরা সবাই ক্লান্ত। ঘামছি। কিন্তু পথ ফুরাচ্ছে না। মনে হলো, আমরা দ্বিতীয়বারের মতো পথ হারাচ্ছি। আমাদের সহযাত্রী ঈভন তার সেলফোন অন করে গুগোলে সার্চ দিয়ে দিকনির্দেশনা যাছাই করল। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ফিরে এলাম। তবে এমন গভীর বনের দুঃসাহসিক, বিপজ্জনক, ঝুঁকিপূর্ণ এবং উত্তেজনাপূর্ণ হাঁটার অভিজ্ঞতাটা মনে রাখার মতো।
অমাবস্যার ঘনকালো রাতে কটেজের সামনে লেকের পাড়ে দ্বিতীয় দিন মদ্যপানের সাথে ফায়ার ক্যাম্প করতে করতে দুই মনির ভাইয়ের আড্ডায় প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ, আসাফউল্লাহ রেজা, গোলাম সারওয়ার, কবরী, ইকবাল হাসান, লুত্ফর রহমান রিটন, কাউসার খান, সিদ্ধার্থ হক, ফারুখ ফয়সল থেকে শুরু করে হাসিনা-খালেদার বিষয় ঘুরে ফিরে চলে আসল। আমাদের আড্ডার মাঝে চুপচাপ শান্ত ঈভন বসে আছেন। ঈভন বাংলা বোঝেন না। কিন্তু ধর্ম, রাজনীতি, বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের আড্ডার বিষয় তিনি টের পাচ্ছেন। আমরা মাঝে মাঝে তা অনুবাদ করে দিচ্ছি। বিনয়ী নম্র ঈভন সেভাবেই আমাদের সাথে চমত্কার সাড়া দিচ্ছেন।
পরদিন গেলাম ভিজিটর সেন্টারে। বাঁদিকে সৈকত। আর ডানদিকে দশতলা উঁচু টাওয়ার, নেটের সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠলে মাথা চক্কর দেয়। হাই প্ল্যাটো টাওয়ারের চূড়ায় পুরো মালভূমি টবোরমরি দেখা যায়। চারিদিকে জল আর জল। মাঝে মাঝে দ্বীপ-দ্বীপান্তরের ছড়াছড়ি। এখানে বড় বড় দ্বীপের সংখ্যা কুড়িটি। আর ছোট দ্বীপের সংখ্যা তার দু-তিন গুণ। কিন্তু তা গণনায় ধরা হয় না। কারণ, শীতকালে ছোট দ্বীপগুলো বরফে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে এবং জলোচ্ছ্বাসের সময় ১৫/২০ ফুট ঢেউয়ে ডুবে যায়।
আমরা ভিজিটর সেন্টারের শেষ প্রান্তে গেলাম। যাবার পথে পাশের ওয়াশরুমে দেখি, পানি নেই। পানি ফ্ল্যাশ করার বদলে কাঠের ছোট ছোট গুড়ি ব্যবহার করতে হয়—কারণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। শেষ প্রান্তে উঁচু পাহাড়। অনেক নিচে লেক, গাছ আর পাথরের সমন্বয়ের এক অপূর্ব জায়গা। কানাডার পাঁচটি লেকের কোনোটিকেই লেক মনে হয় না, যেন সাগর, উপসাগর। আমরা পাথরের স্লট পেরিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। এত উঁচু নিচু, এবড়ো-থেবড়ো পথ, হাঁটা খুবই বিপজ্জনক। কখনো লাফ দিতে হচ্ছে, কখনো বা বসে বসে হাঁটতে হচ্ছে। একটু অসতর্ক হলেই যেকোনো সময় পা স্লিপ করতে পারে। খুব সতর্কের সাথে এগিয়ে গেলাম। হিমালয়ে ওঠার মতো। যদিও আমরা হিলারি-তেনজিন নই। পাহাড়ের নিচে সি-বিচ। কেউ আড্ডা দিচ্ছে, কেউ খালি গায়ে রোদ পোহাচ্ছে। স্বল্প পোশাকে ডানাকাটা পরিরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলে। জলপরিরা সাঁতার কাটছে। আর পাহাড়ের ওপরে শত শত দর্শনার্থী। ক্লিক-ক্লিক করছে ক্যামেরা। আমরা পাহাড়ের গুহায় দেখতে পেলাম একটি গর্ত। গর্তের ফাঁক দিয়ে লেক দেখা যায়। আরও দূরে গিয়ে দেখি, উঁচু পাহাড়ের ভেতর একটি সুড়ঙ্গ পথ নিচে নেমে গেছে। একটি বালক সাপের মতো সুর সুর করে নিচে লেকের কাছে সি-বিচে নেমে গেল। নানান দেশের নানা বয়সি পর্যটকে মুখরিত পুরো এলাকা। একটি বাঙালি পরিবারের বাংলা কথা শুনতে পেলাম।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
