বেঙ্গল গ্যালারিতে শুরু হচ্ছে সৈয়দ ইকবালের ১৫তম একক প্রদর্শনী

মুখে মুখে ফেরে জ্যোত্স্নাবিমুখ মুখ

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৩১
সৈয়দ ইকবালের ছবিতে স্মৃতি আছে। স্মৃতির পাঠোদ্ধার আজ নিজের কাছেই পাল্টে যাচ্ছে পরিবর্তিত অবস্থার রূপরেখায়। সাজানো সৌন্দর্যের থেকেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের চিন্তারাজির স্তরক্রম। মানুষ ও পাখি বাস্তবে আলাদা কিন্তু ভাবের ভেতর তারা এক। পাখির বাসনা ঢুকে গেল মানুষের স্বভাবে আর মানুষের স্বভাব পাখির ভেতর। পাখি যেন বলে দেয় মানুষের চিন্তার ইতিহাস। বাংলাদেশের অনেক পেইন্টারের কাজে আছে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’র দৃশ্যায়ন। খাঁচা সেইখানে থাকে। শব্দের স্থূল অর্থ ধরে নেয়ার বিপদ এইটা। শিল্পীকে তো কেবল রূপের দিকে দৃষ্টি দিলেই চলে না, শব্দের মধ্যে দিয়ে যে রূপ আসছে, আসছে কিছু অরূপের ধারণা, সেদিকেও খেয়াল রাখার বিষয়। ইকবাল এই দিকটায় সচেতন আছেন। তাঁর সম্পর্কে প্রথম কথা এই, তিনি বিষয়বস্তুকে ভেতর দিক থেকে যেমন দেখেন, তেমনি দেখেন বাইরের দিক থেকেও। এই কারণেই তাঁর ছবির ভাষা স্বচ্ছ এবং বর্ণিল। তাঁর পাখির সাথে বিষয়বস্তুর সম্পর্ক পারস্পরিক। সাইকো-বায়োলজিক্যালি যাকে শনাক্ত করা যায়। ‘লাবণ্য অ্যান্ড আই, ফ্লাই অ্যান্ড ফ্লাই’। লাবণ্য এবং শিল্পী দুইজনই অভিন্ন। তাদের বাসনা অভিন্ন। তাদের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পাখা আছে। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আরেকটি শ্বেত পাখি। ছবির পরিবেশ যেন পুরোটাই কসমোলজির ভেতর ঢুকে যাছে। আরেকটা ছবি যেটার নাম কিনা ‘ফ্লাগবার্ড’, বাংলাদেশের পতাকার রং, পতাকাসদৃশ পাখি উড়ে যাচ্ছে। কোনো গাইড নেই। দিগভ্রান্ত। পাখি নিয়ে ইকবালের চিন্তাভাবনা আরও বিবিধ। ‘মুভ উইথ আওয়ার ফ্রিডম-৩’ ছবিতে মানুষের পিঠ আরোহী মানুষ। লাল জমিন। প্রায় মধ্যরেখায় স্থির কিন্তু গতির উদ্গমন আছে মাটি থেকে শূন্যে পা বিচ্ছিন্ন করার মুহূর্ত। এই হচ্ছে স্বাধীনতা আর তার মুক্তির বাসনা। নিজের অধীনতায় আসার গল্প নেই। কিন্তু ইচ্ছা আছে। আমাদের জাতিসত্তার অবস্থান এই। ত্রিশঙ্কু। এগিয়ে যাবার জন্যে আমরা ফ্লাই করতে চাই আর এক্ষেত্রে আমাদের সহায়ক শক্তি আমাদের মিথ এবং জীবন-যাপনের ভেতর এর প্রভাব। ‘রান, রান মাই এঞ্জেল’-এও পাখির প্রভাব। ট্র্যাডিশনাল ইলাস্ট্রেশন এইখানে মুখ্য হয়ে উঠতে পারেনি। ‘তুমিই ১৯৭১’ ছবিতেও সব থেকে সংবেদনশীল ফর্ম হচ্ছে পাখির। কিন্তু চাঁদাকৃতি ছাড়া পাখির ফর্ম এবং রংয়ের ব্যবহারে রোমান্টিক আবহই তরঙ্গায়িত হচ্ছে। ‘টিয়ার্স অব নেচার’, নেচার উইথ ব্লাক ডট’, ‘ইভ’, ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’, এমনকি ‘তুমিই-১৯৭১’-এর কাজে তান্ত্রিকতার প্রভাব এসেছে। ফর্মের দিক থেকে মণ্ডলাকৃতির হলেও রংয়ের ব্যবহারে শাক্ত রূপ ফুটে উঠেছে। কালো এইখানে কালির ফর্মে এবং বিন্দু যেন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। ‘মেমোরি অব লাভ-২, ৩, ৪’ ছবিতে আরও বেশি প্রস্ফুটিত হয়েছে যন্ত্র বা ডায়াগ্রাম। সবই ত্রিভুজাকৃতির। তন্ত্রে এই ত্রিভুজাকৃতিকে আমরা কালির প্রতীক হিসেবে ব্যবহূত হতে দেখি। এবং এর ওপরে কিছুটা খালি জমিন রেখে প্রতিষ্ঠিত বিন্দু। ত্রিভুজ ফর্মের ভেতর মানব-মানবীর প্রেম, পোজিশন এবং বিবিধ মুদ্রা। বিন্দুর তিন দিক ঘিরে বাক্য এবং তার ঠিক ওপরেই বর্ণমালা। এবারের প্রদর্শনীর বিভিন্ন কাজে নানান মাত্রায় স্তরক্রমের প্রয়োগ ঘটেছে। এই সিরিজের ছবিগুলোর মধ্যে ‘লর্ড কৃষ্ণ উইথ রেড-১১’ এবং ‘রাধা ইন বৃন্দাবন-৩’ পৌরাণিক চরিত্র রাধাকৃষ্ণ এবং বৃন্দাবন-লীলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা। অন্ধকার ঝোপের মতো কৃষ্ণের মুখাবয়ব। বাঁশি আছে। টেক্সচার, ফর্ম এবং কালার। টেক্সচারই যেন ছবিটিতে মাস্তানি করেছে। এবারকার ছবিগুলোতে টেক্সচারের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কতক ক্ষেত্রে ফর্মের উপস্থিতি ছাড়াও কেবল রং ও টেক্সচার (যা রেখায় রূপান্তরিত হয়েছে) দিয়ে ছবির গঠন সম্পন্ন হয়েছে। লোহা ঝালাই করার পরে যে টেক্সচারের সৃষ্টি হয়, সেসব মিলে রেখা। ‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ’, ‘সোল বার্ড’ এবং ‘ডুবসাঁতার’—এসব ছবিতে নীলের ব্যবহার রোমান্টিক, রং-রেখায় রূপান্তরিত হয়ে অনেকটাই রিলিফ হয়ে আসছে। আছে মেটামরফোসিস উপাদান। মানবীর উড্ডান দৃশ্য আর ডানা দুটো প্রজাপতির। সাদামাটা জীবন থেকে কালারফুল ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান। মাইন্ড দ্য গ্যাপের হলুদ রেখা, যা অনেকটাই সংকেত হিসেবে এসেছে। ‘সোল বার্ড’ আর্টলাইন ফর্ম সাদা পাখি এবং নারীর অবয়ব সংকেত এবং শীতল আবহ নিয়ে তিনভাগে বিভাজিত জমিন। ভেতরাংশে চড়া নীল সারফেসের ভেতর গভীরতা সৃষ্টি করেছে। যেখানে কল্পনা অবাধে ভ্রমণ করতে পারে। পাখি ও মানবীর মুখ ফেলে দৃষ্টি প্রবেশ করে সারফেসের অতলে যেন ‘আকাশের ওপারে আকাশ’। পরের ছবিতে পাখিই ক্রমশ মানবীর মুখের আদলে হাজির হচ্ছে। ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’ এবং ‘লেনিন নেভার ডাই’ চিন্তার দিক থেকে কাছাকাছি। রেখা টেক্সচার এবং বিবিধ ছোট ছোট সাংকেতিক ফর্ম মিলে এই পেইন্টিং শেষ পর্যন্ত একটা ইমেজ। ত্রিভুজাকৃতির নিদের্শনামূলক চিহ্ন শেষ হয়েছে আরকেটি উল্টানো ত্রিভুজাকৃতি পর্যন্ত এবং যার ওপরে অবস্থান করছে বিন্দু। প্রথমেই বলেছি, এই ফর্ম শক্তি আরাধনার প্রতীক। শক্তির দিকে প্রত্যাবর্তন। বিভিন্ন লেয়ারে রেখা ও ছোট ছোট ফর্মের সমন্বয়ে আবছা পোর্ট্রেট এবং স্টার যা একাধিক হয়ে গতি সৃষ্টি করে বের হয়ে যেতে যাচ্ছে ক্যানভাসের বাইরে। স্টার এই ইমেজ যা ইতিমধ্যেই সম্পর্কিত হয়েছে কমিউনিস্ট হিরোদের সাথে। পাশেই ক্রুশবিদ্ধ যিশুর প্রতিকৃতি যেখানে লেলিনের দৃষ্টি এখনো তীক্ষ্ম। টেক্সচার দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ইকবাল মূল ফর্ম তৈরি করেন এবং আউট লাইন দিয়ে দর্শককে ছবির বক্তব্য ধরিয়ে দেন, ‘রবীন্দ্রনাথ উইথ রেড’ ছবিটি যার উদাহরণ। ওপর থেকে নিচে বেশ কতগুলো লেয়ারে সাজানো হয়েছে সাভার ট্র্যাজিডির ছবিগুলো। যেরকমটা আমরা দেখেছি সরাসরি—বিভিন্নভাবে চাপা পড়া, ছিটকে যাওয়া দেহাংশ, রং, পাশের ভেঙে যাওয়া পিলারের বের হওয়া রডের পরিহাস। ছবিটিতে ঠিক তেমন কড়া রংয়ের ব্যবহার করা হয় নাই। ধ্বংস বোঝাতে তিনি সারফেসকে রক্তপাতের ক্ষেত্রভূমি হিসেবে গড়ে তোলেন নাই। ‘ডুবসাঁতার’ ছবিগুলোতে কখনো মাছ আবার কখনো পাখির আদলে মানুষের অবয়ব। কখনো হাত হয়েছে ডানা বা পাখার মতো। কোনো ছবিতে হাতে আঁকা চোখ, চাঁদ এবং পাখি। লতানো স্বভাব এবং স্ট্রোকের চমত্কার ব্যবহার রয়েছে। ‘মাইন্ড স্কেপ’, ‘রিদমিক অগ্নিলা’, ‘দুর্গা’ ছবিগুলোর গঠনপ্রকৃতি অনেকটাই কান্দিনেস্কির ছবির মতো। অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমে কখনো কালার, কখনো রংই মুখ্য হয়েছে। কল্পনা এবং মরমির অবাধ বিচরণ সে কারণেই এখানে সহজে খেলা করতে পেরেছে। ‘কালার ফ্রম দা সোল’ শিরোনামে ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর শুরু হবে শিল্পী সৈয়দ ইকবালের ১৫তম একক প্রদর্শনী। শেষ হবে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩।