প্রতি মুহূর্তের আমার যে যাপিত জীবন, কেবল উপরিতলের প্রাত্যহিক গতানুগতিক ভাসমান যে জীবন, তা থেকে বের হয়ে এসে জীবন-প্রশ্নের দিকে পৌঁছাবার যে তাগিদ নিজের মধ্যে অনুভব করি, সেই অনুভবই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কবিতা। আমার বেড়ে ওঠা নদ-নদীর কূলে কূলে—ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, শীতলক্ষ্যাঘেরা ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা অসম্ভব সুন্দর এক স্থান ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁয়ে। জন্মেই দেখেছি বিশাল আকাশ, জ্যোত্স্নামাখা প্রান্তহীন মাঠ, বর্ষার জল-জঙ্গল। এই দেখা কখন যে খুলে দেয় আমার মনের জানালা... সেই জানালাপথে আলো আসে, হাওয়া আসে, প্রজাপতি, গঙ্গাফড়িং, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে, প্রকৃতির গান আসে, সুর আসে, আর আসে মানুষ... এ সমস্ত কিছু কখন যে আমাকে ভাবুক করে তোলে আমি টেরই পাইনি।
কবিতা হচ্ছে আমার কাছে সেই দুরন্ত কিশোরী—যে একই সঙ্গে স্মার্ট এবং সহজিয়া, যার সঙ্গে আমি অনুভব করি অলৌক এক আত্মীয়তা, যার আছে কাছে টানার দুর্বার আকর্ষণ, সমাহিত এক রূপ... মাঝে মধ্যে মনে হয়, কবিতা যেন মহাবিশ্বের এক কৃষ্ণগহ্বর... রহস্যে ভরা মহাবিস্ময়! আমার কবিতায় সময়কে ধরার একটা চেষ্টা থাকে, একজন কবিকে শেষ পর্যন্ত সময়কে ধরে, সময়োত্তীর্ণ একটা স্থানে পৌঁছাতে হয়। এ এক ঘোরের জগত্... কল্পনার নিজস্ব এক জগত্ আমার, যে কল্পনা সমস্ত জগত্-জীবনকে ব্যাপ্ত করে ছেয়ে থাকে। কবিতা আমার কাছে এক রহস্যময় খেলা, এক অসাধারণ আনন্দের জ্বালা যা অনিঃশেষ। এ এক মহা বিষয় যা আমার কাছে বিষয়হীন অবিরাম ব্যঞ্জনার ঢেউ...
প্রথম মৃত্যু, দ্বিতীয় জীবন
চারপাশে এত সবুজ! সুন্দর বেঁচে থাকা
আগে শুধু দেখতাম, এখন অবলোকন করি
শুধু দৃষ্টি ছিল, পেয়েছি এখন স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি
ঘুরে বেড়িয়েছি জীবন-পাঠশালায়, শুধু পড়তাম
এখন কেবল পড়ি না, পাঠ করি প্রতিটি প্রাণ-প্রকৃতি
কতইনা বোকা ছিলাম, বুঝতে চাইতাম সবকিছু
এখন শুধুই অনুধাবন করতে চাই মানুষ জীবন...
প্রথম মৃত্যু, দ্বিতীয় জীবন—সামান্যই কাজ
স্বপ্নের চাষাবাদ, চিহ্ন রেখে যেতে চাই আগামীর পথে...
০০০
দৈহিক প্রপঞ্চ
পৃথিবীর প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ আমার গভীরে ভাবের ঝড় তোলে
বংশী সঙ্গী অনুভূতি বহির্ভূত রাখালি জীবন, তবু কেন রাধা!
জগতের যত প্রাণী উদ্ভিদ দৈহিক লক্ষ্যবস্তু, প্রকৃতিতে বিদ্যমান
এসো এই বিমূর্ত রহস্য অরণ্যে, জ্যোত্স্না তলে স্পর্শনীয় বস্তু...
রম্যবনে বিষ্ণুর প্রবল রমণ-ইচ্ছা, রা অর্থ লাভ, ধা অর্থ ধাবমান
রাধিকা কামাতুর কৃষ্ণের দিকে ধাবমান, এদিকে রাধিকারমণ
প্রেমেমত্ত ভাদ্র-রোহিণী নক্ষত্রের শিশু প্রবল উত্তাপে সৃষ্টির সুখ—
বৃন্দাবনলীলা... কুঞ্জবনে চন্দ্রালোকিত অরণ্যে
নতজানু ব্রজকিশোর রাধিকার সান্নিধ্যে, প্রেম-মিথুন
কানুবিনে বিরজা, দুঃখে প্রাণত্যাগ করে নদীরূপে প্রবাহিত...
কালাচাঁদকে পাবার জন্য গোপীদের কাত্যায়ন ব্রত...
সমর্পিত গোপীরা কৃষ্ণ সান্নিধ্যে, মিটিমিটি হাসে পরিত্যাক্ত বস্ত্র
এই সমস্ত নারীই তবে শ্যামচাঁদের অনুপ্রেরণা, কংস বধের!
০০০
ও পানসি, পন্থের দিকে চাইয়া
এবারও আষাঢ় অতিথি হয়েই এলো!
শ্রাবণ নিয়েছে বিদায়, ডুবসাঁতারে
পানকৌড়ি ভাদ্রের দেহে উথালপাথাল
নৌকার অচিন গলুইয়ে তখনো হাওয়া...
আমিতো চাইনি এমন, তবুও এলে
প্লাবন, জলীয়বাষ্পের তীব্র হাহাকার...
শরত্ এলেই বুঝি মুছে যায় বর্ষার স্মৃতি!
০০০
ভাবনার ভাস্কর্য
আউলা হাওয়া ঢেউ তুলেছে বাউলা মনে
চলে এসো সখি আজ রাতেই মনের বিছানায়...
মন যে উড়াল পঙ্খী, হূদয় আসমান তার জায়নামাজ—প্রেমই প্রার্থনা...
জীবন এগিয়ে চলে প্রস্থানের রেখা এঁকে, জোয়ার ভাটায়
তোমার অন্ধকার, আমার অন্ধকার—দুই অন্ধকার মিলে একাকার!
দুষ্ট মেয়ে, ওসব বলতে নেই। তখন যে—সে আমি না, অন্য কেউ...
উড়ন্ত পাখির ছায়া কতটা আর স্থায়ী হয়!
প্রতি মুহূর্তের নাগরিক আপোষকামী জীবনে—
কেউ কেউ তবু নস্টালজিয়ায় ভোগে...
