দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও এখন ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। অথচ এক সময় মৌলভিত্তি, উচ্চহারে লভ্যাংশ ঘোষণা এবং আয় বিবেচনায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে ধরা হতো। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ব্যাংকিং খাতের শেয়ার ছিল বিনিয়োগকারীদের চাহিদার শীর্ষে। আর এখন শেয়ারবাজারে ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফেসভ্যালুর কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ব্যাংকিং সেক্টরের মুনাফা কমার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ এ শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো অতিমাত্রায় আয় করলেও ২০১১ ও ২০১২ তে এসে এ খাত থেকে অর্জিত আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ার কারণে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে। এতে ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর আয় কমে গেছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর প্রশাসনিক খরচ বেড়ে গেছে। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর আমদানি-রফতানির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর এলসি কমিশনসহ এ সংক্রান্ত সব ধরনের অর্জিত আয় কমে গেছে, যা মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি বছর তার আগের বছরের তুলনায় বেশি কুঋণ অবলোপন (রাইট-অফ) করতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। বেশি পরিমাণ অবলোপন ব্যাংকের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে হলমার্কসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ব্যাংকের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের শেয়ারের দর পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ৭টি ব্যাংকের শেয়ারের দর অভিহিত মূল্যের কাছাকাছি দরে নেমে এসেছে। ১০ থেকে ১২ টাকা দরে লেনদেন হচ্ছে এসব ব্যাংকের শেয়ার। এর মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের শেয়ারের দর অভিহিত মূল্যেরও কম দরে বেচা-কেনা হচ্ছে। ১২ থেকে ২০ টাকার মধ্যে অবস্থান করছে ১৪টি ব্যাংকের শেয়ারের দর। মাত্র ৮টি কোম্পানির শেয়ারের দর ২০ টাকার ওপরে। দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দর বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬ টাকা দরে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের দরই তুলনামূলকভাবে কম। শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলোর ১৮টি খাতের মধ্যে মূল্য-আয় (পি-ই) অনুপাতে ব্যাংকিং খাতটি এখন সর্বনিম্ন অবস্থানে। সর্বশেষ আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক মূল্য আয়-অনুপাত ১৫ দশমিক ২২ হলেও ব্যাংকিং খাতের এ অনুপাত হচ্ছে ৮ দশমিক ৮০। অর্থাত্ বাজারের সার্বিক মূল্য-আয়ের তুলনায় ব্যাংকিং খাতের অনুপাত প্রায় অর্ধেক। এ হিসাবে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি সার্বিকভাবে অন্যান্য খাতের তুলনায় অর্ধেক। কিন্তু তারপরও এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের বিষয়টি ডিএসইর সার্বিক লেনদেনের মাধ্যমেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাজার মূলধন বিবেচনায় এ খাতটি শেয়ারবাজারের শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু বাজারের লেনদেনের দিক থেকে এটির অবস্থান এখন ৬ষ্ঠ অথবা সপ্তমে নেমে গেছে। অথচ ২০১২ সালের জানুয়ারি-জুলাই এবং চলতি বছরের একই সময়ে ডিএসইর লেনদেন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং খাত। কিন্তু চলতি বছরে এ খাতটি শুধু শীর্ষ স্থানটিই হারায়নি একেবারে তলানিতে নেমে গেছে। গত জুলাই মাসে ডিএসইর লেনদেনের মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে ব্যাংকিং খাতের। বিপরীতে জ্বালানি খাতে লেনদেন হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৫ শতাংশ।
ব্যাংকের শেয়ারের চাহিদা এতটাই কমে গেছে যে, দুটি ব্যাংকের রাইট শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে অবলেখনেও (আন্ডাররাইটিং) ব্যর্থ হয়েছে ইস্যু ম্যানেজার। অবলেখন ব্যর্থতার কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ব্যাংক দুটির রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন বাতিল করে দিয়েছে।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে আগামীতেও সহসা ভালো মুনাফা করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতি ঘটলে দেশের বিনিয়োগ ও শিল্প বাণিজ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। যা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের আয়কে সরাসরি প্রভাবিত করবে। তাই বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ার থেকে ভালো লভ্যাংশ পাওয়ার আশা করতে পারছেন না। তারা বলছেন, নানা কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত এখন সংকটের মুখে পড়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে অনেক ব্যাংক বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করেছে, সেসব ঋণ এখন কু-ঋণে পরিণত হয়েছে। পুনঃতফসিলিকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নিয়মের কারণেও খেলাপী ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া শেয়ারবাজার ধসের কারণে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের একটি বড় অংশ লোকসানে রয়েছে। উপরন্তু আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ধস, বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণেও ব্যাংকের আয় কমে গেছে। একদিকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া অপরদিকে আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমনকি কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। তাছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে সহসাই উত্তরণের সম্ভাবনাও স্পষ্ট নয়। তাই ব্যাংকের শেয়ারের প্রতি আগ্রহও কম। তবে দীর্ঘমেয়াদের জন্য এ খাতে বিনিয়োগ লাভজনক হতে পারে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
