বাফুফের সব চেষ্টাই বিফলে গেল

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৩
এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে লক্ষ্য রেখে বাংলাদেশের ফুটবল যেভাবে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল তা হলো না। সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো দূরের কথা জাতীয় দল এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল যে এখন মুখ দেখানোই দায়। প্রতিযোগিতার ‘এ’ গ্রুপে চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আর আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। তার নিচে ভুটান। এবার কাঠমান্ডুতে ফুটবল ডুবল। অথচ এ বাংলাদেশই নাকি কাতার বিশ্বকাপকে লক্ষ্য করে ফুটবল খেলছে। অথচ ১৯৯৯ সালে এই কাঠমান্ডুতেই সাফ গেমসের ফুটবলে স্বর্ণপদক জয় করে উত্সবে মেতেছিলেন বাংলাদেশের জুয়েল রানা, আলফাজ, বিপ্লব, হাসান আল মামুন, মিন্টু, মাসুদ রানা, মনোয়ার, মুন্নারা। একই মাটিতে তাদেরই উত্তরসুরী মামুনুল ইসলাম, মামুন খান, সোহেল রানা, লিংকন, আরিফুল ইসলাম, জাহিদ, এমিলিরা কাল দেশে ফিরলেন মাথা নিচু করে। বাফুফে সভাপতি ও সাবেক তারকা খেলোয়াড় কাজী সালাহউদ্দিন উপমহাদেশের ফুটবলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য ডাচ কোচ লোডইউক ডি ক্রুইফ ও তার সহকারী হিসেবে রেনে কোস্টারকে এনেছিলেন। দুই ডাচ দাবি করলেন ফিটনেস কোচ লাগবে। এরপর বললেন গোলকিপিং কোচ আনতে হবে। দুটোই মেনে নিলেন বাফুফে সভাপতি। এসব দাবির সাথে ক্রুইফদের অন্য যত রকম আবদার সবই মেনে নেয়া হয়েছিল, শুধু সাফে সাফল্য পাওয়ার আশায়। কিন্তু সাফ থেকে ক্রুইফের দল লজ্জা নিয়ে ফিরল। ক্রুইফের ভুল পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের ‘কমিটমেন্টের’ অভাব আর সামর্থ্য না থাকার কারণেই মূলত সাফে বাংলাদেশের ফুটবলের এই করুণ হাল। নেপালে তিনটি ম্যাচ দেখে মনে হলো দলের বর্তমান খেলোয়াড়দের অনেকেরই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর যোগ্যতা নেই। ৪৫ মিনিট একই তালে খেলতে পারেননি ফুটবলাররা, হাঁপিয়ে উঠেন, দম নেই। নয় সপ্তাহ ডাচ কোচরা তালিম দিলেন, কিভাবে খেলতে হবে। অথচ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেন ক্রুইফের ছাত্ররা। তাহলে কি শেখানো হলো এতোদিন। নেপালের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের খেলা দেখে নেপালীরাও অবাক হয়েছেন। চিনতে পারছিলেন এ কোন বাংলাদেশ খেলছে। কেননা এ বছরের মার্চেই তো বাংলাদেশ ২-০ গোলে হারিয়েছিল নেপালকে। পাঁচ মাসের ব্যবধানে সেই একই মাঠে নেপালের কাছে লজ্জা পেতে হলো। নেপালের বিরুদ্ধে স্ট্রাইকার এমিলিকে তার পজিশনে না রেখে অনভিজ্ঞ স্ট্রাইকার ওয়াহেদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ক্রুইফ। ডিফেন্ডার মিশুকে মাঝমাঠের দায়িত্ব দিলেও ব্যর্থ হন খেলোয়াড়টি। এমন করে ক্রুইফ পরীক্ষা চালিয়েছেন তিন ম্যাচেই। তারই খেসারত দিতে হয়েছে দলকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও একই ভুল করেছেন তিনি। তার খেলোয়াড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। জাহিদকে মাঠে নামিয়ে তার কাছ থেকে খেলাটা আদায় করে নিতে পারেননি কোচ। এই ম্যাচেও বদলি হিসেবে খেলতে নেমে ওয়াহেদকে স্ট্রাইকিং পজিশনে দিয়ে এমিলিকে নিচে নামিয়ে আক্রমণভাগকে দুর্বল করে দেন। এক সময় মামুনুল ইসলামকে যখন নামিয়েছেন তখন আর কিছু করার ছিল না। এসব ভুল সিদ্ধান্ত দলকে ভুগিয়েছে। তিন ম্যাচের একটিতেও ৯০ মিনিট খেলার মতো শারীরিক সামর্থ্য ছিল না খেলোয়াড়দের, সেটা প্রমাণ হয়েছে। বাংলাদেশের ফুটবলারদের শারীরিক সামর্থ্য সীমিত। ডাচ কোচ হয়তো সেটা বুঝতে না পেরে অনুশীলনে চাপ বাড়িয়েছিল। তাতে ভেঙ্গে পড়েছেন ফুটবলাররা। ক্রুইফের প্রাথমিক দলে ডাক পাওয়া অনেকই ছিলেন ইনজুরিতে। আবার ভালো খেলেও অনেকে ডাক পাননি। তাহলে প্রাথমিক দলের তালিকা কার তৈরি করা। কয়েকজন ফুটবলার ইনজুরি লুকিয়ে দলে থেকেছেন। সেটা ধরতে পারেননি ক্রুইফ ও তার স্টাফরা। একজন খেলোয়াড় দৌড়ালেই তো বুঝতে পারার কথা তিনি ফিট নাকি আনফিট। ক্রুইফ বলেছেন, ডিভিডিতে ইটালীর ম্যাচ দেখে ডিফেন্ডারদের শিখতে হবে কিভাবে ডিফেন্স সামাল দিতে হয়। তাহলে নয় সপ্তাহে কোচ কি শিখিয়েছেন। ভালো ভালো অনেক ফুটবলার জাতীয় দলে ডাক পাননি। কেন এমনটা হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার। খেলোয়াড়দের মধ্যে কমিটমেন্টের অভাব ছিল। তারা নাকি পা বাঁচিয়ে ফুটবল খেলেছেন। কারণ ইনজুরি হলে চলমান দলবদলে ক্লাবগুলোর কাছে পারিশ্রমিক পাবেন না। খেলোয়াড়রা দেশে ফিরেছেন। তারা এখন ক্লাবগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হবেন। এই সময় ইনজুরি হলে পারিশ্রমিক নেমে যাবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় দল নেপালে থাকাকালীন ক্লাবগুলো ঢাকা থেকে ফোন করে খেলোয়াড়দের জানিয়ে দিয়েছিল, ‘ভালো খেলবে। তবে ইনজুরি যাতে না হয়। তাহলে তোমাকে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।’ রেজাল্ট না পাওয়ায় এখন অনেক কথাই বেরিয়ে আসছে। এটা বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন কিছু নয়। সব কিছু ছাপিয়ে আবার নতুন করে ফুটবল এগিয়ে যাবে এটা প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু ভুল পরিকল্পনায় চললে বার বার মুখ থুবড়ে পড়তে হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। চোখের সামনে কাঠমান্ডু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ বলে দিল পিছিয়ে থাকা নেপাল ফুটবল এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। এমন অবস্থান নিয়ে কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলে যাওয়ার স্বপ্নটা পূরণ করার আগে উপমহাদেশের ফুটবল পাড়ি দিয়ে এশিয়ার ফুটবলে ভালো অবস্থান তৈরি করতে হবে।