হাবিবুল বাশার : ‘মার্শালের যোগ্যতা নিয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। সে আরেকবার প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলেই লম্বা ইনিংস খেলার প্রবণতাটা আছে তার। দারুণ ফর্মে আছে। মার্শালকে আমরা যোগ্য মনে করি বলেই তাকে শ্রীলঙ্কা সফরে রাখা হয়েছে। তাকে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলানো হবে কি না, সেটা তো সময় বলবে।
একটা সময় ছিল বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়দের অনুশীলন ম্যাচ দেখার জন্যও মাঠে দর্শকের ভিড় জমে যেত। ‘সামান্য’ অনুশীলন ম্যাচেও দারুণ সিরিয়াস হয়ে স্লেজিং করতেন, আবেদন করতেন খেলোয়াড়রা; আগুন ঝরানো বল করতেন চোখ ধাঁধানো ব্যাটিং করতেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দৌরাত্ম্যে অনুশীলন ম্যাচেরও সেই উত্তেজনাটা হারিয়েই যেতে বসেছিল। কিন্তু জাতীয় দলের দুই নির্বাচন সাক্ষ্য দিচ্ছেন, খুলনায় অন্তত তিন দিনের জন্য হলেও ফিরে এসেছিল সেই উত্তেজনা, সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
দীর্ঘদিন ক্রিকেটের, বিশেষ করে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচের বাইরে থাকার পর খুলনায় বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া তিন দিনের অনুশীলন ম্যাচে ব্যক্তিগতভাবে প্রাপ্তি নিতান্ত কম নয়। কিন্তু এই ম্যাচ দেখে ফেরা দুই নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও হাবিবুল বাশার বলছেন, সেসব ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ছাপিয়ে এখানে আসলেই বড় হয়ে উঠেছিল ম্যাচের আবহটা।
ম্যাচ নিয়ে কথা উঠতে খুলনার ‘হোম বয়’, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার নির্দিধায় দীর্ঘকাল পর একটি ‘ফলপ্রসূ’ অনুশীলন ম্যাচ দেখার কথা বলে দিলেন, ‘ইদানিং অনুশীলন ম্যাচগুলো খেলার জন্য খেলাই বেশি হয়ে থাকে; সেই সিরিয়াসনেস সাধারণত থাকে না। কিন্তু এই ম্যাচটাকে আমি বলবো অসাধারণ ফলপ্রসূ একটা ম্যাচ। তিন দিন ধরে প্রত্যেক খেলোয়াড় প্রতিটা ডেলিভারিতে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মতো সিরিয়াস ছিল। স্লেজিং হয়েছে, সিরিয়াস আপিল হয়েছে। আমি ক্রিকেটারদের নিবিড় অংশগ্রহণ দেখে মুগ্ধ।’
এই ব্যাপারটাকে খুব গুরুত্ব দিলেন আরেক সাবেক জাতীয় দল তারকা ও নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীনও। তিনি বলছেন, এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা নিয়ে একটা ম্যাচ খেলা জরুরি ছিল খেলোয়াড়দের জন্যই, ‘সেই জিম্বাবুয়ে সফরের পর থেকে ছেলেরা আর বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেলেনি। ফলে এরকম কম্পিটিটিভ একটা ম্যাচ ওদের দরকার ছিল। যদিও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজের আগে প্রিমিয়ার লিগের বেশ কিছু ম্যাচ হয়ে যাবে। তারপরও আমি নিশ্চিত যে, এই ম্যাচটার একটা সুফল আমরা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাবো।’
হ্যা, এই তিন দিনের ম্যাচ আয়োজনের একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল মাথায় নিউজিল্যান্ড সিরিজটা থাকা। অক্টোবরের ২ তারিখেই ঢাকায় চলে আসবে নিউজিল্যান্ড। শীর্ষ তিন তারকাকে রেখে বাংলাদেশ সফরে আসা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজের রেকর্ডের কারণেই স্বাগতিকদের ওপর প্রত্যাশার চাপ থাকবে। সে চাপ মেটাতে পারবে কি না বাংলাদেশ, সেটা সময় বলবে। তবে অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় সিরিজের জন্য দল নিয়ে এই প্রস্তুতি ম্যাচ থেকে ভাবনার অনেক খোরাক পেয়েছেন নির্বাচকরা।
মিনহাজুল ভাবনার কথাটা পরিষ্কার করেই বলে দিলেন, ‘মার্শালের ব্যাটিংটা অসাধারণ লেগেছে, সৌম্য ছেলেটাও ভালো ব্যাটিং করেছে। রাজ্জাক আবারও লংগার ভার্সনে ভালো বল করেছে। এরা সবাই আমাদের বিবেচনাতেই আছে। ফলে আমাদের জন্য কাজ করাটা আরও আনন্দের হচ্ছে।’
বিশেষ করে মার্শাল আইয়ুব আর আব্দুর রাজ্জাকের পারফরম্যান্স নির্বাচকদের যে ভাবাবে, সেটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। তবে মার্শালের ব্যাপারে কথা বলার সময় একটু ‘কিন্তু’ রেখে দিলেন হাবিবুল, ‘মার্শালের যোগ্যতা নিয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। সে আরেকবার প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলেই লম্বা ইনিংস খেলার প্রবণতাটা আছে তার। দারুণ ফর্মে আছে। মার্শালকে আমরা যোগ্য মনে করি বলেই তাকে শ্রীলঙ্কা সফরে রাখা হয়েছে। তাকে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলানো হবে কি না, সেটা তো সময় বলবে। তবে আমাদের শুরু থেকে দল নির্বাচনের নীতি পরিষ্কার—কাউকে নিতে হলে একটু প্রস্তুত হওয়ার সময় দেব। আবার একবার দলে নিলে তাকে মানিয়ে নিতেও সময় দেব।’
মার্শালের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা যেমন সুযোগ পাওয়া না পাওয়ার, নিজেকে প্রমাণ করা না করার; রাজ্জাকের ক্ষেত্রে তা নয়। রাজ্জাক অবিসংবাদিতভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ওয়ানডে বোলার। কিন্তু সমস্যা হল, তার টেস্টে যথেষ্ট সুযোগ না পাওয়া এবং ধারাবাহিক হতে না পারা। এতোদিন যে কারণেই হোক, সেটা হয়নি। এখন হয়তো হবে। নির্বাচকরা স্বাভাবিকভাবেই এতো আগে কিছু বলতে রাজী নন। তবে রাজ্জাককে নিয়ে নিজের মুগ্ধতাটা লুকালেন না হাবিবুল।
নিজের সাবেক এই সতীর্থ সম্পর্কে বললেন, ‘আমি রাজ্জাককে জাতীয় দল, খুলনা, প্রিমিয়ারে সতীর্থ হিসেবে, নির্বাচক হিসেবে সেই শুরু থেকে দেখছি। একটা কথা এই ম্যাচের পর বলতে পারি—সে এখন অন্য এক রাজ্জাক। রাজ্জাক সবসময়ই ভালো; তবে এখন সম্ভবত সে তার সেরা অবস্থায় আছে। এখন সে অনেক পরিণত, অনেক দায়িত্বশীল এবং অনেক বৈচিত্র্যময় এক বোলার।’
নির্বাচকদের এই কথায় রাজ্জাক নতুন করে স্বপ্ন তো অন্তত দেখতে পারেন।
