এমনিতেই নেপালের কাঠমান্ডুতে ট্রাফিক জ্যাম নেই। তার উপর গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শহর ছিল আরো ফাঁকা। সেইসাথে রাজনৈতিক কর্মী ধরপাকড়ের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার প্রধান বিরোধী দল হরতাল ডাকায় কাঠমান্ডু ছিল কোলাহলহীন নির্জন এক শহর। দোকানপাট বন্ধ। শপিং মলগুলোতে লাউড স্পিকারে বাজছে নেপালী ব্যান্ড সঙ্গীত। সেখানে তরুণ-তরুণীরা নানা রংয়ে- ঢংয়ে আনন্দ করছিলেন। নেপালে নারী উত্সব শুরু হয়েছে। নারী উত্সব উপলক্ষে বিবাহিত মেয়েরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় যাচ্ছিলেন বাবার বাড়ি। এরই মাঝে শহরটিতে চলছে অষ্টম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ যার গ্রুপ পর্যায়ের খেলা শেষ হয়ে গেছে। আজ রবিবার অনুষ্ঠিত হবে নেপাল ও আফগানিস্তানের মধ্যকার প্রথম সেমিফাইনাল। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় শুরু হবে খেলাটি। আগামীকাল দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মালদ্বীপ ও ভারত মুখোমুখি হবে। গত আসরেও এই দুই দল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় এবং ভারত জিতেছিল।
নেপাল ও আফগানিস্তানের মধ্যকার এ সেমিফাইনালকে ঘিরে কাল কাঠমান্ডুর সর্বত্রই ছিল আলোচনা। কারণ নেপালিরা নিজেদের মাঠে স্বপ্নের ফাইনাল খেলতে চায়। ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ এশিয় ফুটবল আসরটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ নাম ধারণের পর এই নেপালেই বসেছিল প্রথম আসর। অথচ গত সাতটি আসরের ফাইনালে উঠতে পারেনি নেপাল। এ নিয়ে তিনবার সাফ চ্যাম্পিয়নশীপের সেমিফাইনাল খেলছে নেপাল। এটাই এখন পর্যন্ত নেপালীদের বড় সাফল্য।
গোয়ায় ১৯৯৯ সালের সাফে প্রথমবার সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল নেপাল। দ্বিতীয়বার ২০১১ সালে দিল্লীতে সাফের গত আসরের সেমিফাইনালে উঠলেও আফগানিস্তানের কাছে বিদায় নিতে হয়। ম্যাচের শেষ ক্ষণে, অতিরিক্ত সময়ে গোল হজম করে নেপালের স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। দুই বছর পর আবার সেই নেপাল সেমিফাইনালে। আবার প্রতিপক্ষ সেই আফগানিস্তান। তাই এটি স্বাগতিকদের প্রতিশোধ পালাও।
এবার নেপালের শক্তিটা একটু বেশিই। কারণ ঘরের মাঠে খেলা। ১৮ হাজার আসনের দশরথ স্টেডিয়ামে ঠাঁই নেয় অন্তত ২৫ হাজার দর্শক। গোলকিপার কিরণ কুমার, সাগর থাপা, সন্দিপ রায়, রাজু থামাং, ভারত খাওয়াস, অনিল গুরুংদের অন্যতম প্রধান শক্তি দর্শক। সবাই যখন নেপাল নেপাল বলে একসাথে আওয়াজ তোলেন, তখন খেলোয়াড়দের সাহস যেন বেড়ে যায়। এই ভয় আফগানদের। যে কারণে আফগানিস্তানের কোচ ইউসুফ কারজার বলেছেন, ‘আমরা সেমিফাইনালে নেপালকে চাইনি। চেয়েছিলাম ভারতকে। ভারতের চেয়ে নেপাল ভালো খেলছে।’
নেপালী দর্শকদের নিয়ে বিপক্ষের যত ভয়। নেপাল গোল হজম করে পিছিয়ে থাকলেও দর্শকরা এক মিনিট নীরব থাকে না। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রেসবক্স কিংবা গ্যালারি থেকে মাঠ অনেক দূরে। কিন্তু দশরথে গ্যালারি থেকে মাঠ প্রায় হাতের নাগালে। দর্শক আওয়াজ তুলে প্রতিপক্ষ ফুটবলারদের মাথা খারাপ করে দিতে চায়। স্বাভাবিক খেলাটা নষ্ট করে দেয়। রেফারিকে ভুল করতে বাধ্য করে। এই পরিবেশে আফগান ফুটবলারদের ভাল ফল করতে চাইলে কান বন্ধ রেখে খেলতে হবে। আফগান কোচ বলেছেন, ‘যতকিছুই হোক নেপালকে হারিয়ে আমরা সেমিফাইনালে উঠতে পারব।’ আফগানিস্তান ৩-০ গোলে ভুটানকে, ৩-১ গোলে শ্রীলংকাকে হারায় এবং মালদ্বীপের সাথে গোলশূন্য ড্র করে।
নেপাল গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ দারুণ খেলেছে। ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে কোনো ম্যাচ হারেনি। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে ২-০ গোলে, দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষ মুহূর্তে ইনজুরি টাইমে গোল হজম করলে ম্যাচটা ১-১ গোলে ড্র হয়। শেষ ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে ২-১ গোলে হারে নেপাল। নেপাল তিন ম্যাচে পাঁচ গোল দিয়ে দুই গোল হজম করেছে। তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাঁচটি গোলই এসেছে স্ট্রাইকারদের কাছ থেকে। সেটপিস হচ্ছে নেপালের গোল পাওয়ার অন্যতম বড় অস্ত্র। উপমহাদেশে নেপালের ফুটবলের ধরনটাই বদলে দিয়েছেন পোল্যান্ডে জন্ম নেয়া মার্কিন কোচ জ্যাক স্টিফেনস্কি। ছয় মাস আগে দায়িত্ব নিয়ে এই ব্যক্তিটি ‘জোনাল মার্কিং’ ফুটবল খেলাচ্ছেন। প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন কুয়েত, বাহরাইন। সেখান থেকে এসে সাফে একই গ্রুপে বাংলাদেশ ও ভারতকে হারিয়ে চমক দিয়েছেন স্টিফেনস্কি। নেপালি দর্শকদের কাছে তিনি এখন শ্রদ্ধার পাত্র। তিনিও বিশ্বাস করেন এবার আর সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হবে না। ট্রফি তুলে ধরবেন ১১ সেপ্টেম্বর রাতে। তবে এই কোচ নেপালের মিডিয়া থেকে খেলোয়াড়দের দূরে সরিয়ে রেখেছেন। কথা বলতে দিচ্ছেন না। যা বলার সাফ অভিযান শেষ করে বলবেন।
দুই দলের মধ্যে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচ ম্যাচে নেপাল তিনটিতে জয়ী হয়। আফগানিস্তান একটি জয় পায় এবং অপর খেলাটি শেষ হয় ড্রয়ে।
টিকিটের দাম বাড়লো
স্পোর্টস রিপোর্টার, কাঠমান্ডু নেপাল থেকে
সেমিফাইনাল ম্যাচ উপলক্ষে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের টিকিটের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। আজ নেপাল- আফগানিস্তান ম্যাচের প্রথম সেমিফাইনালে গ্যালারির টিকিট মূল্য ৫০০ এবং ভিআইপি টিকিট মূল্য এক হাজার রুপি করা হয়েছে। এরপরও টিকিটের চাহিদা নাকি বেড়েই চলেছে। গ্রুপ পর্বের খেলায় গ্যালারির টিকিট মূল্য ছিল ৩০০ এবং ভিআইপি ৭০০ টাকা। তারপরও অনেক দর্শক টিকিট পাননি। বাড়ি ফিরে গেছেন। কালোবাজারে টিকিট বিক্রি করতে গিয়ে স্টেডিয়ামের সামনে অনেকে মহিলা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন।
