আগামী নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কি হবে? সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদ শেষের ৯০ দিন আগে-না পরে, এমপিরা পদে থেকে নাকি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করবেন-এসব প্রশ্নের সদুত্তর না পেয়ে একাধিক আচরণবিধি প্রস্তুত রাখছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেক্ষেত্রে সংবিধানের ১২৩ (৩) এর উপ-ধারা (ক) অথবা (খ) এবং বিদ্যমান বিধিকে বিবেচনায় রেখে আচরণবিধি প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আলোকে প্রণীত বর্তমান আচরণবিধি সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ নয়। এ কারণে নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের কথা থাকলেও আগামী অক্টোবরের আগে কমিশন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না। প্রয়োজনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আচরণবিধি প্রণয়নের কথা ভাবছে কমিশন। এছাড়াও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে এমপিরা নির্বাচন করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে আইনী দিক পর্যালোচনা করে নথি প্রস্তুতি করছে ইসি সচিবালয়। একাধিক নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রধান দুই জোটের পরস্পর বিরোধী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ জানিয়েছিলেন, নির্বাচন আয়োজনে দুই ধরনের প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। সেই দুই ধরনের প্রস্তুতি কি তা স্পষ্ট করেননি তিনি। তবে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী অথবা রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন হতে পারে-এই চিন্তা মাথা রেখে সিইসি দুই ধরনের প্রস্তুতির কথা বলেছেন।
নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ জানিয়েছেন,সংবিধান অনুযায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে না পরের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে তা কমিশনের কাছে পরিষ্কার নয়। বিষয়টি জানার পরপরই আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে।
ইসির দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, আচরণবিধি প্রণয়নের আগে এমপিরা ও জেলা পরিষদের প্রশাসকরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন-কিনা তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর (চ্যাপ্টার-৩, ইলেকশন) ১২ অনুচ্ছেদের তৃতীয় ধারায় বলা আছে, কেউ সরকারের কর্মে লাভজনক পদে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। আর এমপি পদ লাভজনক হলে তারা কেউ আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ইতিমধ্যে কমিশনের সচিবালয় থেকে এমপি ও জেলা পরিষদের প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আইনী দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেবে। প্রয়োজনে লাভজনক পদের বিষয়ে সুপ্রীমকোর্টের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এর আগে গত জুলাই মাসে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেন নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের প্রচারণার সুযোগ রেখে ওই নির্বাচনী আচরণবিধির খসড়া তৈরি করা হয়। পরে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়। পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, এ ধরনের কোন আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়নি। গত ২৭ আগস্ট কমিশনের সঙ্গে বিদেশি প্রভাবশালী কূটনীতিক ও দাতা সংস্থাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নিশ্চয়তা চাওয়া হয়। পরে জরুরি বৈঠক করে সহসা আচরণবিধি না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কমিশন। সিইসিসহ একাধিক নির্বাচন কমিশনার গণমাধ্যমের কাছে আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির উপর জোর দেন।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী ১২৩(৩) এর উপ-ধারা (ক) ও (খ) উপ-ধারার কারণে আচরণবিধি তৈরিতে মূল সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তে না আসতে পারায় সুর্নিদিষ্ট কোন আচরণবিধি প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সংবিধানের ১২৩(৩)-এর (ক) অনুযায়ী মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এর ফলে নির্বাচনের সময়েও পদে থাকবেন মন্ত্রী-এমপিরা। বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক তর্কবিতর্ক চলছে। সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, দ্রুত এ অবস্থার সমাধান দরকার। প্রধান বিরোধী দল বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। আর সরকারি দল বলছে, অনির্বাচিত কারও অধীনে নয়, বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় আগামী নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়ন নিয়ে ইসি চরম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছে। গত জুলাই মাসে ইসির সংশ্লি¬ষ্ট কর্মকর্তারা পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ শুরু করলেও সমালোচনার মুখে তা স্থগিত করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন দফায় দফায় বৈঠক করেও এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি ৫ সদস্যের নির্বাচন কমিশন। এ জন্য তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ১২৩(৩) উপ-ধারা (ক) অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক ধরনের আচরণবিধি, ১২৩ (৩)এর উপ-ধারা (খ) অনুযায়ী সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পর আরেক ধরনের আচরণবিধি এবং বিদ্যমান আচরণবিধি প্রস্তুত রাখার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিমালা তৈরির কাজ এখনও শুরু হয়নি। আমরা ভাবছি, যদি বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে তাহলে অসঙ্গতিগুলো সমন্বয় করে কমিশন নিজেরাই এটির কাজ সম্পন্ন করে ফেলবে। আর পঞ্চদশ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শের পর আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, স্পর্শকাতর কোনো বিষয় আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্তির দরকার পড়লে সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনকে অবশ্যই আলোচনায় বসতে হবে।
রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে আবু হাফিজ বলেন, রাজনীতিতে আমরা মনে করি একটা সমঝোতা হবে। তবে স্থানীয় এমপি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যাতে কেন্দ্রে প্রভাব খাটাতে না পারেন সেজন্যে নির্বাচনকালীন সময়ে পরিস্থিতির আলোকে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
