গত ২১ অগস্ট সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ হামলায় শিশুসহ প্রায় ১৪শ’ মানুষের প্রাণ গেছে। সিরীয় সরকার এ হামলা চালিয়েছে বলে বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ দাবি করলেও আসাদ সরকার বলছে এ হামলার পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। বরং বিরোধী গ্রুপ ও জঙ্গিরা এ হামলা চালাতে পারে। তবে মার্কিন সরকারের দাবি, এ হামলার জন্য আসাদ সরকারই দায়ী। এ অবস্থায় বিশ্ব সম্প্রদায় নিশ্চুপ থাকতে পারে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা যেন না হয় সেজন্য সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে বিশ্বকে সতর্ক বার্তা দিতে হবে। এজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেশে-বিদেশে জনমত ও নেতৃবৃন্দের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সিরিয়ায় হামলার বিষয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশগুলোর জোট জি-২০ এর বেশিরভাগ নেতাকে রাজি করাতে পারেননি ওবামা। তারপরও সিরিয়ায় সীমিত আকারে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি। ধারণা করা হয়েছিলো জি-২০ সম্মেলনের জন্য রাশিয়া সফরকালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মনোভাব বদলাতে পারবেন তিনি। তবে সে কাজে সফল হননি ওবামা। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার পেছনে কারা, তা স্পষ্ট নয়।
সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার মিত্র দেশগুলো আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের দায় হিসেবে সিরিয়ায় হামলার পরিকল্পনা করে। তবে ব্রিটিশ সরকার পার্লামেন্টে সিরিয়ায় হামলার সম্মতি পেতে ব্যর্থ হয়। যে কারণে সিরিয়ায় হামলার বিষয়ে অনেকটা একা হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটেনের সরে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘একলা চলো রে’ নীতির প্রতি অনড় থেকে একাই হামলা করবে বলে ঘোষণা দেয়। সেই মুহূর্তে অন্য মিত্র দেশ ফ্রান্স সিরিয়া অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকার কথা জানায়। তবে সরাসরি অংশ নেবে কি না তা পরিষ্কার করেনি। সর্বশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো বলছে তারা জাতিসংঘের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। ফলে সিরিয়াতে অভিযান চালানোর বিষয়ে অনেকটা একক সিদ্ধান্তের পথে যাচ্ছেন বারাক ওবামা।
রাশিয়া স্পষ্ট বলে দিয়েছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের যে অভিযোগ সিরীয় সরকারের বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে তা প্রমাণিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যদি কোনো প্রমাণ থাকে তাহলে তারা তা জাতিসংঘে উপস্থাপন করুক। এর পর হয়তো তার দেশ সিরিয়া অভিযানে সম্মতি দেবে। এছাড়া রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলে দিয়েছেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া সিরিয়ায় হামলা চালানো হবে বেআইনি। এ রকম এক কঠিন বাস্তবতার মুখে সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। তিনি হামলার পরিবর্তে সিরিয়ায় আরো বেশি মানবিক সাহায্য পাঠানোর লক্ষ্যে সব দেশকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। জি-২০ সম্মেলনে দেশগুলোর নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি সেখানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বান কি মুন এই আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সামরিক অভিযানের যে প্রস্তুতি চলছে তা একেবারেই অবিবেচনা-প্রসূত। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের অভিযানের পরিণতি হবে খুবই মারাত্মক এবং মর্মান্তিক। সিরিয়ার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ওবামার যুদ্ধ প্রস্তুতির যারা বিরোধিতা করছেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের এই জোরালো বক্তব্য তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। তাই জি-২০ সম্মেলনে অনেক দেশের অসম্মতির মুখে ওবামা এখন মার্কিন জনগণ ও কংগ্রেস সদস্যদের সিরিয়ায় হামলার পক্ষে মত দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাশিয়া থেকে একটু ব্যস্ত হয়েই দেশে ফিরেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কারণ সিরিয়া সংকট নিয়ে উত্তেজনা এখন ওয়াশিংটনে। হামলা হবে কি হবে না তা নিয়ে সংশয়, উদ্বেগ, উত্তেজনা বিরাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের সবখানে। ব্যয়বহুল একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখন যুদ্ধবিরোধী মনোভাব তীব্র। সিরিয়ায় অভিযান নিয়ে ওবামার সঙ্গে খোদ তার দলের অনেক আইনপ্রণেতারাও একমত নন। অভিযানের আগে ওয়াশিংটনের রাজনীতি জয় করাই এখন প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে দুরূহ হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখা গেছে, নতুন করে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিপক্ষে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক। সাধারণ মার্কিনদের মতো আইনপ্রণেতারাও চরমভাবে বিভক্ত সিরিয়ায় সামরিক অভিযান প্রশ্নে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেস উত্তপ্ত হয়ে উঠবে সিরিয়া সংকট নিয়ে। আগামীকাল
মঙ্গলবার আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন তিনি। পরদিন বুধবার কংগ্রেসে সিরিয়া বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযানের প্রস্তাব গ্রহণের জন্য কংগ্রেসে ২১৮ জনের সমর্থনের প্রয়োজন; কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ জন কংগ্রেস সদস্য সিরিয়ায় হামলার পক্ষে মত জানিয়েছেন, আর বিপক্ষে মত দিয়েছেন ১০৬ জন সদস্য। সামরিক অভিযানের পক্ষে থাকা ডেমোক্র্যাটিক দলের নীতি নির্ধারকেরা বলছেন, দোদুল্যমান অবস্থানে থাকা কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সমর্থন আদায়ের জন্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সরাসরি কথা বলবেন এসব সদস্যের সঙ্গে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ওবামা সিরিয়ায় হামলা চালাবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ওবামা এর আগে বিভিন্নভাবে সামরিক অভিযানের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কংগ্রেসের পর সিনেটরদের মতামতের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটের একটি প্রভাবশালী প্যানেল সিরিয়াতে সামরিক অভিযানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে। সিরিয়ায় অভিযানের পক্ষে ১০ জন ও বিপক্ষে সাতজন সদস্য ভোট দিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে বিষয়টি ভোটাভুটির জন্য সিনেটে পেশ করা হবে। এখানেও চরম বাধার মুখে পড়তে পারেন ওবামা। প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মতে, সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে মাত্র ২৩ জন প্রকাশ্যে সিরিয়ায় হামলা করার পক্ষে। ১৭ জন সিনেটর প্রকাশ্যে অভিযানের বিপক্ষে। যে সব সিনেটর মুখ খুলছেন না, তাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। সিরিয়ায় সামরিক হামলার প্রস্তাব সিনেটে অনুমোদনের জন্য ৬০ জনের সমর্থন প্রয়োজন। সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্যানেলের অনুমোদন সিরিয়াতে মার্কিন হামলার পথকে কিছুটা প্রশস্ত করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। যেটা তার পদের জন্য একটি পরীক্ষাও। রাশিয়া ছাড়ার আগে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ওবামা নিজ মুখেই বলেছেন, কংগ্রেসের সম্মতি পাওয়া খুবই কঠিন কাজ। এজন্য আমাকে অনেক ঝামেলা সামলাতে হবে। আমি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি তখন আমার মধ্যে কোন ভ্রম কাজ করেনি। আমি মনে করি সঠিক কাজটি করতে হবে। এটা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ভাল। আমরা যদি একত্রিত হয়ে অগ্রসর হই তবে আরো বেশি সফল হবো।
