বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে আট ধাপ এগিয়ে ১১০তম অবস্থানে আসায় বাংলাদেশ তার হারানো স্থান ফিরে পেতে যাচ্ছে। তবে ৫ বছর পর এবার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে প্রধান সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থায়ন সঙ্কট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি মানব সম্পদ উন্নয়ন ও আর্থিক খাতের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
সোমবার সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৩-১৪ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনসহ আরও অনেকে।
প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অবকাঠামোর অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব, অর্থায়ন সঙ্কট, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অদক্ষ শ্রমশক্তিকে মূল বাধা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিনটি বাধাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টিও ব্যবসায়ীদের কাছে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. গোলাম মোয়াজ্জেম।
রফতানির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যের অর্থায়নে ব্যাংকের অনীহা। আগের বছরগুলোতে এটি খুব একটা সমস্যা না হলেও বর্তমানে প্রধান সমস্যা এটিই। এছাড়া আমদানি-রফতানি উভয় ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমস্যা ও ব্যয় বৃদ্ধিকে সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এ সময়ে উন্নতির স্বাক্ষর রয়েছে স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা এবং তথ্য প্রযুক্তি খাতে।
প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০১৩ সালে দেশের সার্বিক অর্থনীতি আগের বছরের তুলনায় দুর্বলভাবে পার করবে। সংঘর্ষ ও অস্থিতিশীলতা বাড়ায় ব্যবসায়িক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে বিদ্যুত্ সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হলেও উন্নতির মাত্রা নিচের দিকেই রয়ে গেছে। আর সড়ক ব্যবস্থা, রেলওয়ে ও সার্বিক অবকাঠামোর দুর্বলতা আগের মতোই প্রকট।
আর্থিক খাত প্রসঙ্গে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আর্থিক খাতের দুটি জায়গায় উন্নতি হয়েছে। একটি হলো ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সমস্যা হলো বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন খুব কম করা হচ্ছে। আর্থিক খাতে দুর্নীতি এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে বিএসইসি’র দুর্বল ভূমিকাও বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অদক্ষতা কমেনি। ফলে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। তাছাড়া এ সময়ে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে অবনতি হয়েছে। এটি ব্যবসায়ীরা যথেষ্ট গুরুত্ব ও উদ্বেগের সাথে বিবেচনা করছেন।
ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মানব সম্পদ উন্নয়নে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। মানব সম্পদ উন্নয়ন সূচকে খুব একটা উন্নতি হয়নি। দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্নীতি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হতে হয় আমদানি-রফতানি কার্যক্রম, পরিসেবা খাত (পাবলিক ইউটিলিটি), লাইসেন্স প্রাপ্তি, বিচারিক কার্যক্রম এবং পাবলিক ফান্ড কোম্পানির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে কর প্রশাসনে দুর্নীতির প্রকোপ কমেছে। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে বাংলাদেশ কিছুটা উন্নতি করেছে।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ২০১২ সালের ভিত্তিতে তৈরিকৃত বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে আগের বারের প্রথম দশটি দেশের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও তারা দশের মধ্যেই রয়েছে। প্রথম অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ড। জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুই ধাপ করে এগিয়ে ৪ ও ৫-এ আসলেও যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ড তাদের অবস্থান হারিয়েছে। ১৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আট ধাপ এগিয়ে ১১০-এ এসেছে। তবে আগের বছর ১০৮ থেকে অবস্থান হারিয়ে ১১৮-তে চলে গিয়েছিল। তাই বাংলাদেশের এগিয়ে আসাকে অবস্থান ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করছে সিপিডি। এদিকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থানে কিছুটা অবনমন হলেও বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্যতম দেশ ভিয়েতনাম ৫ ধাপ উন্নতি করে ৭০ এ অবস্থান নিয়েছে। ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ এ প্রতিবেদনে অংশগ্রহণ করছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পক্ষ থেকে সিপিডি প্রতিবেদনটি তৈরি করে। এ বছর ২০১২ সালের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে ১০ কোটি টাকার বেশি মূলধন সম্পন্ন ৭১টি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মধ্যে জরিপ চালিয়ে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
