মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার চিহ্নগুলো আজও অরক্ষিত

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৮
জামালপুরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ না নেয়ায় স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে জেলার প্রায় অর্ধশত বধ্যভূুমি ও গণকবর। ১৯৭১ সালে পাকহানাদার বাহিনী এ জেলার বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে কিংবা নির্বিচারে গুলি করে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে শতশত লাশ মাটি চাপা দিয়ে রাখে । এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডে মুক্তিযুদ্ধের বেদনা বিজড়িত স্মৃতিচিহ্নগুলো শুধু দিন দিন মুছে যাচ্ছে। সরকারি ভাবে সংরক্ষণের অভাবে অসংখ্য গণকবর শনাক্ত করার পরও আজও মর্যাদাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ বর্তমান সরকারের কাছে দেশের জন্য জীবন দানকারি সে সব স্মৃতি রক্ষার্থে বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের জন্য দাবি জানিয়েছেন । জেলার বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া তথ্য মতে জামালপুরে প্রায় প্রতিটি উপজেলার আনাচে কানাচে প্রায় অর্ধশত বধ্যভূমি, গণকবর রয়েছে। বিশেষ করে এ জেলার মুক্তিযোদ্ধের প্রধান ঘাঁটি নামে খ্যাত বকশিগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর। বর্তমানে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে স্মৃতিস্তম্ভের উত্তর পাশে একটি বিশাল বধ্যভূমি, কামালপুর কছিম উদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির পশ্চিম পার্শ্বে রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য গণকবর অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। খাদ্যগুদাম ও ডাক বাংলোর কাছাকাছি দুইটি বধ্যভূমি বেদখল হয়ে গেছে। ধানুয়া কামালপুর বাজারের পশ্চিমে ইউনিয়ন পরিষদের পিছনে একটি বড় বধ্যভূমি ছিল যা বর্তমানে পুকুরে পরিণত হয়েছে। বকশিগঞ্জ এনএম উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পার্শ্বে ৭১-এর মৃত্যুকুপ নামে পরিচিতি ছিল তা সংরক্ষণের অভাবে সেই বধ্যভূমিটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বকশিগঞ্জের পুরাতন গো-হাট একটি গণকবর সংরক্ষণের অভাবে আবাদী জমি ও পুকুরের সঙ্গে বিলীন হতে যাচ্ছে। উলফাতুননেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান হলরুম ছিল টর্চারসেল। বকসিগঞ্জের মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, কামালপুর উপস্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পার্শ্বে প্রায় বেশকিছু গণকবর অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সদর উপজেলার পৌর শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীর সংলগ্ন শ্মশানঘাট এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা পক্ষের লোকজনদের ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হতো। বনপাড়া এলাকার ফৌতি গোরস্থানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিপাগল মানুষের লাশ মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ডিগ্রি হোস্টেল, পিটিআই ও ওয়াপদা রেস্ট হাউজ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকায় ছিল পাক-হানাদার বাহিনীর নির্যাতনী ক্যাম্প। এ জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হলেও সংরক্ষণ হয়নি আজো। দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশনের লোকোশেড, রেলস্টেশন সংলগ্ন জিআরপি থানা, আলেয়া মাদ্রাসা, জিল বাংলা চিনিকল, দেওয়ানগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, কাঠারবিলের গয়ারডোবা, ফারাজীপাড়া, পুরাতন বাহাদুরাবাদঘাটে এ সব স্থানে পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতনী ক্যাম্প ছিল। সরিষাবাড়ি উপজেলার পিংনা বারইপটল, পালপাড়া ও জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে রয়েছে অসংখ্য গণকবর। গণকবর হিসেবে পরিচিত ইসলামপুরের কুলকান্দি খানপাড়া, পৌর গোরস্থান, মেলান্দহ এবং মাদারগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে অনেক গণকবর ও টর্চারসেল। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে এসব গণকবর। এসব ছাড়াও জেলার আনাচে-কানাচেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ অভাবে দিন দিন হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যত্ প্রজন্ম জানতে পারবে না এসব গণকবর ও বধ্যভূমির সঠিক ইতিহাস। তাই মুক্তিযোদ্ধারা ও সর্বস্তরের জনগণ সরকারের প্রতি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে।