কামালপুর স্থলবন্দরে রাজস্ব আয় হলেও বন্দরের উন্নয়ন নেই

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:০০
জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের কামালপুর স্থলবন্দরের প্রতি বছর কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও বন্দরের উন্নয়ন নেই। কামালপুর আধুনিক পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তরিত করা হলে এখান থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণে বেড়ে যাবে এবং এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জানা গেছে, বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর এলাকাটি মুক্তিযু"ের ১১নং সেক্টরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কামালপুর সীমান্ত থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার মহেন্দ্রগঞ্জ থানা সদর। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে অতি সন্নিকটে মহেন্দ্রগঞ্জের মত গুরুত্বপূর্ণ থানা শহর। তাই ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য আমদানি-রফতানির জন্য কামালপুর স্থলবন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে আমদানি রফতানিকারক ব্যবসায়ীরা এ বন্দরটি সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বেছে নেয়। ১৯৫২ সালে কামালপুর পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে চালু ছিল। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যু"ের পর এ বন্দরের কার্যক্রম বন্ হয়ে যায়। দীর্ঘ দিন বন্ থাকার পর ১৯৯১ সালে এলসি স্টেশন হিসেবে ফের এ বন্দরের কার্যক্রম শুরু করে। এ স্থলবন্দরে প্রতিদিন পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে কয়লা-পাথর, কাজু বাদাম, মার্বেল স্টোন, গরম মসলা, পেঁয়াজ, রসুন, সুপারি, আদা, কাঠ, বিভিন্ন প্রকার ফলমূল, ও বাঁশ আমদানি হয়ে থাকে। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্ট জুট, তুলা, প্রাণের জুস, প্লাস্টিক দ্রব্য, সিমেন্ট, শুঁটকি মাছ, মেলামাইনের জিনিসপত্র ও কসমেটিক্স রফতানি হয়ে থাকে। এসব আমদানি রফতানির ফলে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়া, লাঙ্গলকোর্ট, গারোহিল, মাইনকার চর, তুরা, গোহাটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে বাংলাদেশের সর্ম্পক উজ্জ্বল হয়েছে। কামালপুর এলসি স্টেশনের মাধ্যমে প্রতি বছর পিক-সিজনে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টন কয়লা এবং দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ সিএফটি পাথর আমদানি করা হয়। এ থেকে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব আয় হচ্ছে প্রায় ৮/১০ কোটি টাকা। কামালপুর স্থলবন্দরের শুলড় কর্মকর্তার কার্যলয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে এ পর্যন্ত কামালপুর স্থলবন্দরে কয়লা আমদানি হয়েছে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ও পাথর আমদানি করা হয়েছে ১ লাখ পঞ্চাশ হাজার মেট্রিক টন। আদা ৬০ হাজার মেট্রিক টন। এ থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ১শ ২২ টাকা। অপরদিকে এই এলসি স্টেশনে মালামাল লোড-আনলোড করতে প্রায় তিন সহস্রাধিক বেকার শ্রমিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে এখানে মালামাল লোড-আনলোডিংয়ের জন্য বিশাল এলাকা জুড়ে এলসি ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। উল্লেখ্য রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বুড়িমারী, হিলি, সোনা মসজিদ ও তামাবিল স্থলবন্দরের দূরত্বের তুলনায় কামালপুরের দূরত্ব অনেক কম। আমদানি-রফতানিকারক ব্যবসায়ী সমিতির সূত্রে জানা গেছে, মহেন্দ্রগঞ্জের ব্যবসায়ীরা ভারতের অংশ মহেন্দ্রগঞ্জে ইমিগ্রেশন করতে মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মকুল সাংমা বরাবর জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মকুল সাংমা ব্যবসায়ীদেরকে আশ্বস্ত করে বিষয়টি কেন্দ্রে প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলেন। অপরদিকে বকশীগঞ্জের আমদানি-রফতানিকারক ব্যবসায়ী সমিতিসহ জেলার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন যাবত্ ইমিগ্রেশনসহ পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ ব্যাপারে আমদানি রফতানিকারক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ সমিতির সভাপতি কৃষিবিদ আব্দুলাাহ আল মোকাদ্দেছ জানান, এই বন্দরে ইমিগ্রেশন সুবিধা না থাকায় তাদের যোগাযোগ করতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে মালামাল ক্রয় পূর্বে পণ্য যাচাই করার ক্ষেত্রে সম্যসা হয়। এতে করে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সাথে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। আবার অনেক ব্যবসায়ী না দেখে মালামাল আমদানি রফতানিতে বিপাকে পড়েন। বিশিষ্ট শিল্পপতি মুক্তিযো"া বাবুল চিশতী বলেন, দীর্ঘদিন যাবত্ মুক্তিযু"ের ১১নং সেক্টরের স্মৃতি বিজড়িত ধানুয়া কামালপুর একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন এ এলাকার মুক্তিযো"ারা। ১৯৯১ সালে এলসি স্টেশনটি চালু হওয়ার পর থেকে কামালপুরকে পূর্ণাঙ্গভাবে একটি স্থলবন্দরে রূপান্তরের জন্য প্রস্তাব রয়েছে। এ জন্য ২৩ একর জমি অধিগ্রহণের নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া জামালপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থলবন্দরের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্য এবং কাস্টমস বিভাগের ঊধর্"তন কর্মকর্তারাও কামালপুর এলসি স্টেশনটি পরিদর্শন করে গেছেন। ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাসহ এই এলসি স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে উন্নীত করা হলে আমদানি-রফতানির মাধ্যমে জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাইবান্দা ও কুড়িগ্রাম জেলাসহ ৫টি জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার বহুগুণে বেড়ে যাবে। পাশাপাশি ইমিগ্রেশন ও আমদানি-রফতানির মাধ্যমে সরকারের বিপুল অংকের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। এই স্থলবন্দর ঘিরে প্রায় ১০ হাজার অতিদরিদ্র বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। পুরো জেলার সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি মুক্তিযু"ের স্মৃতি বিজড়িত ১১নং সেক্টরের উত্তর রণাঙ্গনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব বিবেচনা করে কামালপুর এলসি স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর ঘোষণা করা হউক। শুলড় কর্মকর্তা জমির উদ্দিন (এলসিও) জানান, সম্ভাবনাময় ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দর থেকে কোটি কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব আয় হলেও ইমিগ্রেশন না থাকায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারায় পণ্য কেনাবেচায় দারুণভাবে বিঘ্ন ঘটেছে। এতে মাঝেমধ্যে দু'দেশের আমদানি-রফতানিও স্থবির হয়ে পড়ে।