চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মেয়েদের হল জীবনের গল্প

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:২০
আকাশে গুমোট মেঘ। সদ্য বিকালের মিষ্টি আলো মিলিয়ে গেলো। হঠাত্ করেই ঝমঝম বৃষ্টি। প্রীতলতা হলের ছাদে দেখা গেলো একদল মেয়েকে। হৈচৈ চেঁচামেচি আর একে অন্যের সাথে দুষ্টুমি করতে করতে বৃষ্টিতে ভিজতে আরম্ভ করলো তারা। একে একে বাড়তে থাকলো তাদের সংখ্যা, আর বাড়তে থাকলো হৈ-হুল্লোড় চেঁচামেচি। এটি শুধু প্রীতিলতা হলেরই দৃশ্য নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নার আর খালেদা জিয়া হলেও এমন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। তিনটি হলে বসবাসকারী ছাত্রীদের অধিকাংশই পরিবার পরিজন ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে। কিন্তু হলে এসে তারা খুঁজে পেয়েছে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সহযোগিতা আর সহমর্মিতা। অপরিচিত এক একটি মুখ এখন যেন কতোদিনের চেনা। প্রীতিলতা হলের আবাসিক ছাত্রী টুম্পা বড়ুয়া জানালেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, গভীর রাত পর্যন্ত অযথা হাসাহাসি, গান, দুষ্টুমি এসব নিয়েই তো হল জীবন। কিছু সমস্যা বাদে হলের জীবন সত্যিই আনন্দের।’ ছুটির দিনগুলোতে ছোট ছোট পিকনিক পার্টির আয়োজন করা হয় প্রায়ই। বাজার করা শেষে পেঁয়াজ রসুন কেটে শুরু হয়ে যায় রান্নার মহোত্সব। প্রতিদিনের একঘেয়েমি খাবার খাওয়ার পরিবর্তে সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় রান্না করা খাবারের স্বাদ যেন অমৃত। মুখে লেগে থাকে পরের সপ্তাহের ছুটির দিনের পরবর্তী পিকনিকের আগপর্যন্ত। বলছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলের আবাসিক ছাত্রী আকলিমা জান্নাত। সারাদিনের ক্লাস, আড্ডা শেষে হলে ফিরে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া পেতে কেউ বা একটা ঘুম দিয়ে দেয়। কেউবা হলের সামনের ঝুপড়িতে বসে সেখানে আসা বন্ধু, কিংবা কয়েকজন মিলে শুরু করে আড্ডা। আড্ডায় বাদ যায় না কোনো কিছুই। রাজনীতি, ভালবাসা, সমাজ ব্যবস্থা, চলচ্চিত্র, গান, খেলাধুলা, ক্লাসে সহপাঠী কিংবা শিক্ষকদের কর্মকাণ্ড সবই ঘুরে ফেরে মুখে মুখে। হলে কি শুধু আড্ডায় চলে? রোজি নামের একজন ছাত্রী এই প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘না তেমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। বরং আড্ডা থেকেও একটু বেশিই চলে বাদবাকি কর্মকাণ্ড। হলে বসে দল বেঁধে যেমন ছাত্রীরা সিনেমা দেখে, তেমনি পরীক্ষার আগের রাতে দল বেঁধে তারা শুরু করে পড়াশুনা’। হলে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ছাত্রীই সবার সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলে। বিপদে আপদে, কখনো বা ব্যক্তিগত সমস্যাতেও পাশে দাঁড়ায় একে অপরের। নিয়মিত খোঁজ-খবর আর প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়াতে কার্পণ্য নেই কারো। মা-বাবা পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরে থাকতে একটু কষ্ট হয় সত্যি কিন্তু সবাই মিলে হাসি, গান আর আনন্দ উল্লাস সেই শূন্যতাকে পূরণ করে দেয় নিমিষে। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করলেন যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আল্পনা। ভালবাসা, বন্ধুত্ব, আর স্নেহের পরশে এক একটি হলের সকল ছাত্রী হয়ে ওঠে পরস্পর আপন জন, যেন আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তপ্রায় যৌথ পরিবারের সদস্য সকলে। হল তখন শুধু আর একটি প্রাতিষ্ঠানিক আবাসস্থল থাকে না, হয়ে ওঠে এক বিশাল যৌথ পরিবার। আর এই যৌথ পরিবারের সদস্যদের হাজারো স্মৃতি বুকে ধারণ করে হলগুলো মিটিমিটি হাসে। ছবি:অনির্বাণ রায়