আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প

প্রেমহীন প্রদোষের আখ্যান

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৩
অনাদরে আর অস্ফুটে ধুলোয় পড়ে থাকে যে-জীবন, শেষ বিকেলের মোহন আলোয় রাঙিয়ে তাকে অনেকেই তুলে নেয় অন্তরঙ্গ আশ্রয়ে। কিন্তু জীবন যাদের কাছে নিরন্তর দ্রোহ, প্রতিদিনের আগুনে পুড়িয়ে যারা জীবনকে নিয়ে তৈরি করেন বেঁচে থাকার ভিন্ন ছাঁচ, তাদের কাছে জীবনের স্বাদ কটু না কোমল? বাংলা ছোটগল্পের আলো-আঁধারি ভুবনে জীবনের চারুশিল্পী অনেকেই আছেন। এক জীবনের মধ্যে তাঁরা শুনিয়েছেন অন্য জীবনের আখ্যান। সেই আখ্যানটি কখনো হয়েছে আমাদের চিরচেনা জীবনের প্রতিরূপ, কখনো কোমল-মধুর স্পর্শে আকর্ষণীয়, স্নিগ্ধ মেদুরতায় কখনোবা সে জীবনকে মনে হয়েছে স্বপ্নময়। রোমান্টিকতার উড়াল ডানায় ভর করে কেউ কেউ কাদামাটির জীবনেই এনেছেন অলীক পুষ্পের সৌরভ। সেই সৌরভে মোহিত হয়েছি কত জন, অশুচি জীবনের পটে যখন চিত্রিত হয়েছে রাজসিক ভবিতব্যের ছবি, তখন তাকেই জেনেছি আমাদের জীবনের অনিবার্য নিয়তি হিসেবে, গৌরব বোধ করেছি সেই বর্ণাঢ্য জীবনের উত্তরাধিকারী হিসেবে। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে দৃশ্যমান জীবনের যে রূপায়ণ ঘটেছে, তার পূর্বসূরি যেমন কম, উত্তরসূরিও তেমনি বিরল। আবেগময় রোমান্টিকতার ভেজা পথটি তিনি আদৌ মাড়াননি, নস্টালজিক অনুভবের অতীতলগ্নতাকে তিনি এড়িয়ে চলেছেন সশব্দে, কোমল স্বরের মৃদু ছোঁয়াকে তিনি জীবনের বাইরের ঐশ্বর্য বলেই জেনেছেন—এ কারণে আখতারুজ্জামানের গল্পে জেগে ওঠে এক বিস্তৃত তট। সেই তটের কোথাও নেই ছায়াতরুর এতটুকু স্নিগ্ধতা। সেখানে মাথার ওপরে হলকা ছড়ায় গনগনে আগুন, তির্যক উত্তাপে পুড়ে যায় দেহ-মনের স্বস্তি। সত্তর ও আশির দশক জুড়ে ছোটগল্পের যে মজবুত আধার গড়ে তুলেছেন ইলিয়াস, প্রেমহীন জীবনের নিরেট বাস্তবতা এবং আপসহীন লড়াইয়ের উজ্জ্বলগাথা তাঁকে দিয়েছে বিশিষ্টতা। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের যে অনন্য উদ্ভাস, তার অনেকটা জুড়েই রয়েছে নরনারীর মনোজগতের বর্ণাঢ্য আখ্যান। ব্যক্তি-হূদয়ের নিভৃত চাওয়া-পাওয়া, তার গোপন ক্ষরণ এবং স্বপ্নের বৈচিত্র্যময় প্রকাশে অনেকের গল্পই হয়ে উঠেছে মনোজগতের অনেকান্ত রূপ। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে শেষ পর্যন্ত জেগে উঠেছে হূদয়ের সংবেদনাহীন এক ঊষর চড়া। দেহের প্রয়োজনের কথা যদিও বা কোথাও কোথাও উচ্চারিত হয়েছে, হূদয়ের পুষ্পিত আবেগের কথা কোথাও অনুরণিত হয়নি। জীবনের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত কিন্তু প্রেমজ আবেগবিবিক্ত এমন গল্পের জন্যই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাদেশের তথা বাংলা ছোটগল্পের জগতে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছেন। প্রাচ্য মানুষের মনোভূগোলে প্রেমহীন জীবনের কথা আমরা কেউ তেমন করে শুনি না। কিন্তু ইতিহাস আর দেশকালের ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের যে এগিয়ে চলা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাকে দেখলেন অন্তরঙ্গ ক্রূরতা দিয়ে। প্রেমহীনতার অর্থ মানব-বিমুখতা নয়, নয় মানুষকে এড়িয়ে দৈবের বন্দনা। মানুষ প্রবলভাবেই আছে তাঁর লেখায়, আছে তার দেহ-মনের সমস্ত দাবি নিয়ে। মানুষ যে তাঁর গল্পে রূপবান হয়ে উঠেছে, মানুষের সেই স্বরটি জোরালোভাবে শোনা যায় ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গ্রন্থে। একে একে প্রকাশিত হয়েছে—খোয়ারি, দুধভাতে উত্পাত, দোজখের ওম প্রভৃতি গ্রন্থ এবং এগুলোতে ধ্বনিত হয়েছে বিচিত্র মানুষের অন্তহীন যাত্রা। বস্তির কদর্য জীবন থেকে মুক্তিযুদ্ধের রক্তলিপ্ত লড়াইয়ের পটভূমিকায় উঠে এসেছে মানুষের টিকে থাকার অজস্র ভঙ্গিমা। মনের গভীরে লুকোনো ব্যাধির প্রকোপে নিঃশেষ হতে হতে রঞ্জু হারিয়ে যায় ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’য়। বিপন্ন স্মৃতি আর গভীর বিষাদের মধ্যে সে কোথাও খুঁজে পায় না জীবনযাপনের নিবিড় আশ্রয়। তাই মনোরম মনোটোনাস শহরে রঞ্জু হয়ে পড়ে আগন্তুক। প্রেমহীনতার বৈরী আবহ ব্যক্তিকে ঠেলে দেয় বিনষ্টিতে। নিরাশ্রয় রঞ্জুও বর্ষণঘন রাতের নৈঃশব্দ্যে বিলীন হয়ে যায় মৃত্যুর গভীরে। শহুরে উচ্চবিত্তের পাশে অনভিজাত মানুষের জীবন কতটুকু মূল্যই বা পায়। ধনগর্বের দাপটে বন্ধু কাইয়ুমের পাশে আনোয়ার আলির কীটপ্রতিম হয়ে ওঠা আর বস্তির মুখে অবাঞ্ছিত দুই কুকুরের রতিউত্সবে মেতে ওঠা প্রেমহীন জীবনেরই প্রতিরূপ। ‘উত্সব’ গল্পে অকথ্য খিস্তি-খেউর আর গালিগালাজের মধ্যে বালক কর্মচারী খুঁজে পায় তার জীবনের চালচিত্র যেখানে প্রেমহীনতার বৈরী দংশনে প্রতিদিন সে জর্জরিত হয়। রুটির দোকানের মালিক তোতা মিয়ার উচ্চারণে বেরিয়ে আসে গলিত নোংরা : আব্বে চুতমারানী, এহেনে খাড়াইয়া কিয়ের রং দ্যাহো? রাইত বাজে একটা, আর তুমি হালায় খানকির বাচ্চা এহেনে রঙবাজি করো? তোমার কোন বাপে গিয়া কাউলকা দোকান খুলবো? বামপন্থি রাজনীতির পাঠ নিলেও জীবনের পাঠ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন আবুল হাশেম। পরনারীর লোভে তিনি গোপনে হত্যা করেন নিজের স্ত্রীকে। ‘প্রতিশোধ’ গল্পটি তাই হয়ে ওঠে উপেক্ষিতা এক নারীর অপ্রেম আর অচরিতার্থতার কাহিনি। ডিটেইলের নিরবচ্ছিন্ন রেখায় আখতারুজ্জামান জীবনের প্রান্তকে অন্বেষণ করেন কিন্তু মানিকের মতোই কদর্য জীবনের কটু গন্ধ ছাড়া পেলব হূদয়ানুভূতির দেখা তিনি শেষ পর্যন্ত পান না। ফলে নিষ্ঠুরতার কালো স্রোতে ঢেকে যায় ব্যক্তির স্বপ্ন ও সংগ্রামের উজ্জীবন পর্বটি। ইলিয়াসের গল্পে প্রেমহীনতার নিভৃত বেদনা ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে স্বদেশের ভূমিকেও স্পর্শ করে। স্বদেশ যদি মাতৃকল্প হয় তবে তার জন্য বুকের অচিন লোকে মায়াবী ভালোলাগা জড়িয়ে থাকবেই। কিন্তু স্বাধীন স্বদেশে ননী হয়ে যায় অচেনা উদ্বাস্তু। কোলকাতা থেকে আসা প্রদীপ অনতিবিলম্বে উপলব্ধি করে ননীদার অসহায়ত্ব। রক্ত আর বারুদের উজ্জ্বল ঝলকে মাতৃভূমির যে মুখ স্পন্দিত হয়েছে বুকের মধ্যে, মৃত্যু আর বেদনার জলধি পেরিয়ে এসে ননী দেখে, সেই স্বপ্ন-স্বদেশ অপহূত হয়ে গেছে অজানা দুর্বৃত্তের হাতে। নগদ মুদ্রা দিয়ে প্রেম আর সোহাগের সম্পর্কটি রক্ষা করতে হয় ননীদাকে, নতুবা কলেজগামী অনূঢ়া কন্যাকে হতে হয় অন্তরালবর্তিনী। ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গল্পে শ্রুত স্বরটি ননীদা কিংবা পিসিমা কারও কাছেই পরিচিত নয়। পাকিস্তানি স্বৈরপ্রভুদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমরা যেন সামপ্রদায়িক ঔপনিবেশিকতার নিগঢ়ে বাঁধা পড়লাম। সেখানে মিত্র কে, শত্রু কে সেটা বোঝাও দুরূহ হয়ে উঠল। প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে এই দেশের মুক্তির লড়াইয়ে অবদান রেখেছে সর্বধর্মের মানুষ কিন্তু আপন ভূমিতে ননী আর প্রদীপেরা পরবাসী হয়ে গেল। তাদের আর্থিক সমৃদ্ধি লোভী করে তোলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুযোগসন্ধানীদের। ফলে ননীদের মনোজগতে জন্ম নেয় বিক্ষোভ আর বৈরিতা : কিসের বিজনেস? এই দ্যাশে ক্যামনে থাকি? বিজনেস এট্টু যদি ভালো হইছে তো চান্দা লইয়া লইয়া ব্যাকটি পয়সা খসাইয়া লইবো। এই তো একখান টাউন, আধা ঘণ্টা হাঁইটা গেলে এই মাথা ঐ মাথা ফালা ফালা কইরা ফালান যায়! আর দ্যাখ, সপ্তার মধ্যে তিনখান চাইরখান কনফারেন্স, সম্মেলন, সমাবেশ লাইগাই রইছে। পয়সা আদায়ের ফন্দি, বুঝলি না? এই ভাই আইবো, ঐ ভাই আইবো, বাপে আইবো, বন্দু আইবো আর কি? ছাড়ো, মালপানি ছাড়ো। আশির দশক জুড়ে রচিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে জীবন ও সমাজের যে আখ্যান উপস্থাপিত হয়েছে, সেখানে দেখা মেলে না কোনো আপসধর্মী জীবনের আভাস। ব্যক্তি আর সমাজের দ্বৈরথে নিষ্পেষিত হতে হতে এখানে ভেঙে পড়েছে কানে শোনা সুভাষণ, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে চিরচেনা উপলব্ধির জগত্, বিবর্ণ হয়ে গেছে আবহমান বিশ্বাসের আদলটি। খোয়ারি, দুধভাতে উত্পাত, দোজখের ওম গ্রন্থের গল্পগুলোতে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ব্যক্তির নষ্ট স্বপ্ন, ছড়িয়ে আছে প্রতারক সময়ের অজস্র বিকার। স্বজন এখানে মুহূর্তেই হয়ে পড়ে বৈরী, সমাজ-বান্ধবের ছদ্ম আবরণে ঘুরে বেড়ায় অদৃশ্য হন্তা। ননীদার মতো ‘খোয়ারি’ গল্পের সমরজিত্ও তার বন্ধুদের মধ্যে প্রত্যক্ষ করে নীরব প্রতিপক্ষদের। ফারুক, জাফর, ইফতিখার সমরজিতের কাছে পরিণত হয় মূর্তিমান আতঙ্কে। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা সকলেই ছিল সমগোত্রভুক্ত কিন্তু মুক্ত স্বদেশে একাত্তর-উত্তর সময়কালে এই বন্ধুরাই রূপ নেয় হিংস্র দখলদারে। সমরজিতের বাড়ির এক অংশে অন্যায় দখল কায়েম করার জন্য শৈশবের বন্ধুরাই প্রচ্ছন্ন হুমকি দেয় : কিন্তু অন্যদের আমি বোঝাবো কি করে? মানিক ভাইকে নিয়ে প্রব্লেম হলো এই যে ইডিওলজির জন্য উনি যে কোনো অপ্রিয় কাজও করতে পারেন। তুমি আমাদের সঙ্গে কো-অপারেট করতে রিফিউজ করেছো শুনলে হি মে পুট ইউ ইনটু ট্রাবল। নিরস্তিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে সমরজিত্ খুঁজে ফেরে তার প্রকৃত ঠিকানা এবং আপাত প্রসন্ন স্বদেশ পরিণত হয় আলোছায়াহীন খাঁচায়। যাদের ভরসায় সমরজিত্ এ দেশকে আশ্রয় করে পড়ে ছিল, এক অভাবিত মুহূর্তে তাদের কাছে সে পেলো হূদয়হীন প্রত্যাখ্যান। মনুষ্যত্বের অমল আহ্বানে তাকে কেউ কাছে টেনে নেয়নি, নির্দয় ক্রূরতার আঘাতে তাকে সরিয়ে দিয়েছে দূরে, সমরজিত্ হয়ে ওঠে প্রেমহীন ভূভাগের পরিত্যক্ত বাসিন্দা, তার পাশে কেউ নেই। তার ধর্মের পরিচয়টিই তাকে আলাদা করে দিয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠদের থেকে। প্রেমহীনতার এই দীর্ঘশ্বাস ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে নিরানন্দ মাতৃভূমির প্রতিটি ধূলিকণায় এবং তার বিষাক্ত গরল পান করে নীলকণ্ঠ হতে হয় সমরজিেক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে নির্দয় প্রেমহীনতার প্রদোষ দীর্ঘ থেকে ক্রমাগত দীর্ঘ হয়েছে এবং শহর ছাড়িয়ে তা প্রবেশ করেছে প্রান্তিক গ্রামজীবনের বিষণ্ন অন্ধকারে। তিস্তাপারের গ্রাম খোলামহাটির নিরন্ন সংসারে দানবের মতো বেড়ে ওঠা দারিদ্র্যে ইলিয়াস অবলোকন করেছেন মানবীয় আবেগহীন বাস্তবতাকে। ‘দুধভাতে উত্পাত’ গল্পে এক মুষ্টি অন্নের জন্য জয়নব ও তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে যে ক্ষমাহীন প্রতিযোগিতা ও কাড়াকাড়ি চলে তা উপস্থাপনে লেখক পাথুরে সংবেদনার পরিচয় দিয়েছেন। কেবল নির্মম বাস্তবতাকেই উঁচু তারে বাঁধেননি ইলিয়াস বরং তিনি দেখেছেন ব্যক্তির জৈবিক নিষ্ঠুরতা ও অনিবার্যতাকে—বাত্সল্য যেখানে পরাভূত হয় দেহের অপ্রতিরোধ্য তাগিদে। প্রেমের গল্পে প্রেমহীনতার এমন শৈল্পিক উন্মোচন বাংলা ছোটগল্পে খুব সুলভ নয়। নাগরিক সমাজে নকল মানুষের ইয়ত্তা নেই। তরল আবেগের উত্তাপে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মতো বেপরোয়া যুবক-যুবতী চারপাশে দুর্লভ নয় মোটেই। কিন্তু যে যুবক বাড়ন্ত যৌবনে থেকেছে প্রেমবিবিক্ত, বিয়ের পরে মুখোশ এঁটে সে-ই তার স্ত্রীকে শুনিয়েছে বিগত প্রেমের বানোয়াট কাহিনি। কল্পপ্রেমের গল্পে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘প্রেমের গপ্পো’ পাঠকদের পৌঁছে দেয় অনুভবের সেই প্রান্তে—যেখানে এক যুবকের কল্পিত প্রেমের উপাখ্যান ভিজিয়ে দেয় আমাদের মন। স্ত্রী বুলার কাছে একাধিক প্রেমের গাথা বর্ণনার শেষে গল্প যেখানে পরিণতি পায় সেখানে আমরা দেখি, জাহাঙ্গীরের জীবনে প্রেম বলে আসলে কিছুই ছিল না। কিন্তু প্রেম ছিল প্রৌঢ়া তারাবিবির, আর জৈব প্রেমের তীব্র টানে ভেসে গেছে তারই পুত্র গোলজার। ত্রিশ বছরের দাম্পত্যজীবনে তারা বিবি গৃহগত প্রেমের সুখ সেভাবে পায়নি। যদি পেত তবে সে হয়তো একথা বলত না: তুমি কব্বরের মড়া পইড়া রইছো, কব্বরের মইদ্যেই থাকো। তুমি কি বুঝবা? তিরিশ বচ্ছর হইলো তোমার ঘর করি, একদিন তোমারে সিধা হইয়া হাঁটবার ভি দ্যাখলাম না। তারাবিবির জীবনে স্বামীসঙ্গ লাভের সুখ না জুটলেও তার যুবক পুত্র গোলজার সুরুজের মাকে নিয়ে দরজা দিয়ে ঘরে সময় কাটায়। পিতা রমজান আলি বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেও প্রৌঢ়া তারাবিবি যৌবনের টানকে অস্বীকার করতে পারে না—‘তুমি বুইড়া মড়াটা, হান্দাইয়া গেছো কব্বরের মইদ্যে, জুয়ান মরদের কাম তুমি বুঝবা ক্যামনে?’ বাঞ্ছিত প্রণয়ের পথ রুদ্ধ হলে জৈব উচ্ছৃঙ্খলতায় প্রকাশ পেতে পারে দেহের অবাধ টান। আবেগময় রোমান্টিকতার সরল আদলে ইলিয়াস হূদয়কে উন্মুক্ত করেননি। বস্তুগুণে বিশ্বাসী বলে প্রৌঢ়া তারাবিবির মুখ দিয়ে যুবক পুত্রের কায়িক চাহিদা অস্বীকৃত হয়নি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে ভিড় করে আছে পোড়খাওয়া রক্তমাংসের মানুষ—যারা হূদয়ের গহিনলোকে অবগাহন করার কথা কখনো ভাবেনি। আটপৌরে প্রয়োজন আর দেহের নগদ প্রাপ্তিতে তাঁর গল্পের মানুষেরা সন্তুষ্ট। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে আমাদের পরিচিত চেনাজানা শিল্পের জগিট প্রায় অনুপস্থিত। কথাটি এই অর্থে আমরা গ্রহণ করছি যে, বর্ণাঢ্য কল্পনার মায়াস্বর কিংবা মায়াবী রংটি তাঁর গল্পে আদৌ লাগেনি। শিল্পমাত্রই কল্পনার প্রসূন বলে আমরা মেনে নিই, কিন্তু ইলিয়াসের গল্পে বানানো কল্পনা দিয়ে জীবনের ছক আঁকার দরকার হয়নি। জীবন এখানে রোমান্টিক গোধূলিবেলার মায়া নয়।