(পূর্বপ্রকাশের পর)
এবার ফেরার পালা। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে উল্টো পথে ফিরছি। ময়লা, মাটি, গাছের পচা পাতা বিছানো এবড়ো-থেবড়ো, এলোমেলো পথ। পথ মাঝে মাঝে লেকের পাশে গিয়ে মিশেছে। আমরা জঙ্গল আর লেকের মোহনায় যাত্রাবিরতি করলাম। গাছের ছায়া ছাতার মতো পাথরের ওপর যেন শীতলপাটি বিছিয়ে রেখেছে। নীল লেকের মৃদু ঢেউগুলো পাথরের সাথে জলকেলি করছে। সেই সাথে সোনালি রোদের ঝিলিমিলি। স্বচ্ছ পানিতে অনেক রংয়ের খেলা। পানি এত রংয়ের হতে পারে তা এই প্রথম দেখলাম। হালকা নীল, গাঢ় নীল, সবুঝ, লালচে, বেগুনি, রুপালি এবং সোনালি। এ যেন আরেক ধরনের জল-পাথরের রংধনু দেখেছি। ফেরার পথে আরও দেখলাম—ছোট সাপ, বনজ ব্যাঙ, রেকুন, কাঠবিড়ালি, প্রজাপতি প্রভৃতি।
টবোরমরিতে একটি মাত্র পোর্ট। পোর্ট ঘিরে বেশকিছু শপিং স্টোর, বার, খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। তবে কোনো বার্গার কিং, ম্যাগদোনালস, টিম হর্টন্স নেই। আমি মিউজিয়াম, আর্টগ্যালারি এবং বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলাম। স্থানীয় কবি এলিজাভেথ বাযেলি। তাঁর সাথে পরিচিত হলাম। তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থ বের হয়েছে। সর্বশেষ বইটির নাম—‘গিফট ফ্রম দ্য ডেড’। রেয়াডেরস হেভেন বুক স্টোরে বাজেলির বইয়ের কবিতা আমাকে টানল না।
কেন্ট ওয়েলকেন্স, চিত্রশিল্পী। লন্ডনে জন্ম হলেও কেন্ট কানাডিয়ান। তার বউ ইন্ডিয়ান। থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। কেন্ট সামারের সময় টবোরমরিতে থাকেন আর শীতের সময় ছবি আঁকার জন্য চলে যান বিভিন্ন দেশে। তাঁর চিত্রকলা প্রধানত প্রাকৃতিক। কেন্টের একটি শিল্পকর্মে জর্দান, সিরিয়া আর ইসরাইল—একসাথে তিন দেশের ভৌগোলিক আর ঐতিহাসিক দৃশ্য ফুটে উঠেছে। সেই সাথে চারদিকে যুক্ত করেছেন তিন দেশের ভাষা। আমাদের স্বপন ভাই গতবার তাঁর এই ‘সি অফ গ্যালিলি’ শীর্ষক ছবিটি কিনেছেন। এখন কেন্ট সেটার প্রিন্ট বিক্রি করছেন। তাঁরা তিন শিল্পী মিলে গড়ে তুলেছেন ‘গোল্ডেন গ্যালারি টাবোরমরি’। এছাড়াও রয়েছে আরও কয়টি গ্যালারি।
আমরা প্রতিদিনই সকাল-বিকাল-সন্ধ্যায় বেরোচ্ছি। আজ যাচ্ছি—ফ্লাওয়ারপট আইল্যান্ডে। এখানে মাত্র একটি আইল্যান্ডেই পর্যটকদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকিগুলো অব্যবহূত। ফ্লাওয়ারপট আইল্যান্ডে যাব; কিন্তু জলাতঙ্কে কাঁপছে অপি। সে কিছুতেই যাবে না। আমাদের অনুরোধে ফেরিতে উঠে চোখ বন্ধ করে দোয়া-দরুদ পড়া শুরু করল।
আমি ব্রহ্মপুত্র-পাড়ের ছেলে। আমাদের গ্রামের বাড়ির চারদিকে নদীনালাখালবিলঝিলে ঘেরা। জলের সাথেই আমার বেড়ে ওঠা, জলের সাথেই কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর। আমার জলের ভয় নেই। তবে ২০০৩ সালে একবার মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। সাথে ছিল লেখক-সাংবাদিক রাজু আহমেদ মামুন। আমরা পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা যাবার পথে মাছের বাজারখ্যাত ফকিরের ঘাটে যাচ্ছিলাম। আগে জায়গাটার নাম ছিল ‘ঈশ্বরের বন’। আর রাখাইনরা তাদের ভাষায় বলত—‘ফারাতারা’। পরে সেখানেও সামপ্রদায়িকতা কাজ করেছে। ঈশ্বরের বনকে নাম দিয়েছে—‘ফার্তার বন’। পায়রা, বিষখালি এবং বলেশ্বরী—এই তিন নদীর মোহনা পাড় হয়ে সমুদ্রপথে আমাদের মাছধরা নৌকা তুমুল ঝড়বৃষ্টিতে পড়ে। সেকি বিপজ্জনক অবস্থা। তীব্র বাতাসে নৌকা উল্টে যাচ্ছে। ঢেউ এসে নৌকাকে তলিয়ে দিচ্ছে, আবার ভাসছে। বার বার পানি খেতে খেতে ডুবছি, চুপসে ভেসে উঠছি। একবার ঝড় আর বাতাসের বেগে ছই থেকে ছিটকে প্রায় সমুদ্রে পড়ে যাচ্ছিলাম। মাঝি আর মামুন আমাকে কীভাবে যেন ধরে ফেলে জীবন রক্ষা করলেন। জীবনে আমি একবারই মৃত্যুর স্বাদ পেয়েছিলাম।
যা হোক। টাবোরমরি থেকে ফেরিতে যেতে সময় লাগে কুড়ি মিনিট। যাবার পথে আমাদের নিয়ে গেল একটি ক্যানেলে। সেখানে দুটি ডুবন্ত জাহাজ দেখানো হলো। ১৪৬ বছর আগে ১৯০ ফুটের ডুবন্ত জাহাজ, অন্যটি আগুনে পোড়ানো জাহাজ মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে। মনে পড়ল টাইটানিকের কথা। গত বছর টরন্টোর অন্টারিও সাইন্স সেন্টারে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলাম। সেই সাথে আইম্যাক্স হলে ছিল টাইটানিক নির্মাণ আর উদ্ধার নিয়ে সিনেমা। উল্লেখ্য, টাইটানিক নির্মাণের নেপথ্যে ছিল কানাডা।
আমরা ফ্লাওয়ারপট যাবার পথে এক জায়গায় দেখলাম, দুই ধরনের পানি। স্বচ্ছ সবুজ জলের মাঝে গাঢ় নীল, মানে একটি গভীর কুয়া। আর সেই নীল জলের গভীরতা ৪০০ ফুট, যা নায়েগ্রার জলপ্রপাতের বেশি গভীর।
২০০এসব ভাবতে ভাবতেই আমাদের ফেরি ঘাটে ভিড়ল। আদিবাসীদের কাঠের খোলা একটি ঘরে আমরা ডিম-খিচুরি খেয়ে হাঁটা শুরু করলাম। পাঁচ মিনিটের দূরত্বে ছোট ফ্লাওয়ারপট। এই দ্বীপে দুটি ফ্লাওয়ারপট আছে। পাহাড় থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে একটি বিশাল খণ্ড ফুলের টবের মতো আকার ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেজন্যই এই দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে, ফ্লাওয়ারপট আইল্যান্ড। আমাদের মতো আরও অনেক দর্শনার্থীর ভিড়। অষ্টম আশ্চর্যের তিন আশ্চর্য তাজমহল, আইফেল টাওয়ার আর নায়েগ্রা দেখে আমি মোটেও অবাক হয়নি।
যাবার পথে লুত্ফর রহমান রিটনের ‘নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে’ পড়ছিলাম। তাতে রিটন এক জায়গায় লিখেছেন, ‘আলী ইমামের একটি গুণ হচ্ছে—যা-ই দেখেন, মুগ্ধ হন। একটা পুরোনো ভাঙা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও আহ-উহু করে নস্টলজিক হয়ে ওঠেন’। কারণ, আমার মুগ্ধতা ভিন্ন। তাই ফ্লাওয়ারপট দেখে আলী ইমামের মতো ‘আহ-উহু’ করলাম না।
পরে আরও কিছুদূর হেঁটে কাঠের প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে একটি গুহায় গেলাম। সেটাও খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হলোনা। কারণ, গুহার ভেতরে যাবার ব্যবস্থা নেই। একপাশের দৃশ্য দেখে ফিরতে হলো। জানা গেল, এই দ্বীপে প্রায় ২০০ গুহা আছে কিন্তু সেগুলো উন্মুক্ত নয়। গুহা থেকে বেরিয়ে আরও দশ মিনিটের জঙ্গল পেরিয়ে লাইট স্টেশনে গেলাম। যাবার পথটা খুবই সুন্দর! প্রায় লেকের পাড় ঘেঁষে খুবই ছোট্ট একটা সরু সিঁড়িপথ ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেছে। বাঁ দিকে লেক। হাঁটার জন্য লোহার রিং দেওয়া। আর ডান দিকে পাহাড়ের কূল ঘেঁষে গাছগাছালি, গাছপাথর। পাথরের সুড়ঙ্গ। এ দৃশ্য নয়ন ভরে দেখা যায়, হূদয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু লেখায় বর্ণনা করা কঠিন। লাইট স্টেশনে ওঠার পর মনে হলো, আমরা এখন ফ্লাওয়ারপটের চূড়ায় পৌঁছেছি। এখানে লেখা আছে যথারীতি কিছু ইতিহাস আর তথ্যাবলি। দূরবিন ছাড়াই দেখা যায় আশপাশের দ্বীপগুলো। অদ্ভুত কাব্যিক নাম সেসব দ্বীপের। সাপের নামে স্ন্যাক আইল্যান্ড, একাকিত্বের জন্য লোনলি আইল্যান্ড। লোনলি আইল্যান্ডের নিসঃঙ্গতা বুকের ভেতর নাড়া দিল, মনে হলো—কেউ যেন কবিতা লেখার তাড়া দিলো? কে যেন লোনলি দ্বীপ থেকে আমাকে মায়াবী কণ্ঠে ডাকছে!
ফেরার পথে দেখতে গেলাম—স্বেচ্ছাসেবীদের পরিচালিত পাওয়ার হাউস। লেকের পাড়ে ছোট্ট একটা জায়গা সুন্দর করে সাজানো। এ যেন জঙ্গলের ভেতর মানুষের সন্ধান পাবার মতো ঘটনা। স্বেচ্ছাসেবীরাই এ দ্বীপটা পরিচালনা করে। রয়েছে তাদের পরিচালিত একটি বিক্রয়কেন্দ্র। এর বারান্দায় বসে লেকের নির্মল বাতাস এমন করে শীতল পরশ বুলিয়ে দিল—আহ! সারা শরীরে জড়িয়ে দিলো এসি-র শীতলতা। শান্তিতে ঘুম নেমে এল দুচোখ জুড়ে। কিন্তু ঘুমানোর উপায় নেই। কারণ, আমরা সাড়ে পাঁচটার লাস্ট ফেরির যাত্রী। ফিরতে না পারলে এই দ্বীপেই হয়তো রাত কাটাতে হবে। ফেরি করে ফেরার পথে দেখলাম, মাত্র কয়েক একরের খুবই ছোট্ট দ্বীপ। নাম—মিডল আইল্যান্ড। কিন্তু স্থানীয় লোকেরা আদর করে ডাকে—প্লকি। তবে আমার মনে দাগ কেটেছে সেই লোনলি আইল্যান্ড!
প্রতিদিনই সকাল-বিকাল-সন্ধ্যায় আমরা খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঘুরছি-ফিরছি। আর পইপই করে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর কোথায় কী কী আছে? সি-বিচে গোসল, সাঁতার কাটা, বোট চালানো, দ্বীপ দেখা, কেনাকাটা—সবই হলো। বাকি থাকল কী?
ঈদের দিন পোলাও-মাংসের আমেজের পর বিকেলে আমরা দু-ঘণ্টার জন্য একটা শিপ দুইশ ডলারে ভাড়া করে বড়শি নিয়ে লেকে মাছ ধরতে গেলাম। খুব খাতির হলো তরুণ সারেঙ জ্যাকের সাথে। জ্যাক এখানেই থাকে, এখানেই তার জন্ম। অনেক তথ্য জানা গেলো তার কাছ থেকে। সে সামারে ব্যস্ত থাকে। শীত এলে ছয় মাসের জন্য অনেকটা ডুব দেয়। তবে কোনো ব্যস্ত শহর তার ভালো লাগে না। নিরিবিলি টবোরমরিই তার প্রিয় স্থান। মাছ ধরতে এসে বাড়তি পেয়ে গেলাম লেকের ভেতর সান সেট! সূর্য গলে গলে লেকের নীল জলকে কিছুক্ষণের জন্য লাল রংয়ে রাঙিয়ে দিলো। মনে পড়ল সেই রবীন্দ্র সংগীত—‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ চুন্নি উঠল রাঙ্গা হয়ে আমি চোখ মেললুম আকাশে’। সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে অকারণেই মনে পড়ল কক্সবাজার আর কুয়াকাটার কথা।
ইতোমধ্যে বড়শির সুঁতা ছিঁড়ে বড় একটা মাছ চলে গেল। ঈদের দিনে সবার আনন্দটাই ম্লান হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ছোট্ট একটা মাছ পেলাম। জ্যাক জানাল, এই মাছের নাম ‘স্প্ল্যাট। মাছ পেয়েও মন ভরল না। আমার মন পড়ে রইল সেই নিঃসঙ্গ-নির্জন লোনলি আইল্যান্ডে। (সমাপ্ত)
