একজন মেয়েমানুষের ময়না তদন্ত

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৫
মুরশিদ মিয়ার ছেলে শহরুদ্দির গায়ে গোঁয়ারের রাগ। সেদিন সন্ধ্যার মরা আলোয় বাপ মুরশিদ মিয়া নয়া একখান বউ সঙ্গে নিয়ে বাড়ির উঠানে পা রাখতে শহরুদ্দি হুংকার দিয়ে ঘর ছেড়ে উঠানে নেমে এল। আচানক আওয়াজে মুরগির পাল কোকড় কোক ডাক ছেড়ে চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করতে শহরুদ্দির বউ ময়না মাথায় ঘোমটা টেনে কঞ্চি হাতে মুরগি ফিরানোর ছুতা ধরে বিচড়া ঘরের কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে ময়না তার শ্বশুরের পেছনে দাঁড়ানো নয়া বউয়ের মুখখান দেখার চেষ্টা করতে থাকে। দাঁতের ফাঁকে আঁচল কামড়ে ধরে ময়না মনে মনে হাসে। ভাবে, বুড়া স্বামীর হাত ধরে বাড়িতে ঢুকে স্বামীর জোয়ান ছেলের হাঁক শুনে নয়া বউ কি ভয়ে ফিট লেগে গেল? ভয় পেয়ে নয়া বউয়ের মুখখান কেমন সুরত ধরেছে, সেটা দেখার জন্য ময়নার মনে কৌতূহল জাগে। নয়া বউয়ের মুখখান দেখা না গেলেও তার দাঁড়ানোর টানটান ভঙ্গি দেখে ময়নার মনে হয়, শহরুদ্দির হাঁক বৃথা গেছে। মুরশিদ মিয়া চিকন বুদ্ধির মানুষ। ছেলের হুংকার শুনে ভয়ে ফিট লাগলে ষাট বছর বয়সে বিয়ে করে কচি বয়সের নয়া বউ ঘরে আনতে পারত না। বাপের মন-মেজাজের নিশানা জানা থাকলেও শহরুদ্দি রাগ সামলাতে পারে না। বাপের সামনে সিনা টান করে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আপনারে কি মরণে পাইছে? আপনে বুড়া কালে নিকা কইরা জোয়ান একটা বেটি ঘরে উঠাইলেন? বিষয় কী?’ ‘বিষয় তেমন কিছু না। তোমার মা বছর জুইড়া রোগা-ভোগা বিছনায় পইড়া থাকলেও আমি তোমাগো মুখ চাইয়া বিষয়টা মাইনা নিছি। অখন সে বেহেশতের বান্দা বেহেশতে চইলা গেছে। তার লেইগা আমি কি সংসার বিবাগি হইয়া বেহেশতের দরজায় গিয়া খাড়াইয়া থাকমু?’ ‘আপনারে বেহেশতে যাইতে কইছে কেডা? আপনে আমার পিতা। আপনে যতদিন বাঁচবেন সংসারে বহাল থাকবেন। ময়-মুরুব্বির কাম কি নিকা বিয়া কইরা বেড়ানি? বেয়াদপি নিয়েন না। একটা কথা না কইয়া পারলাম না। ধনী মানুষ মরণের আগে দশজনের উপকারের লেইগা গাঁয়ে স্কুল-মাদ্রাসা বানায়, পুকুর-পুষ্কুনি কাটে। আপনেও গাঁয়ে জনকল্যাণ করলেন। মরণের আগে গাঁয়ের জোয়ান ব্যাটাগো লেইগা একখান জোয়ান বিধবার বন্দোবস্ত কইরা দিয়া গেলেন, এইটা কি উত্তম হইল?’ মুরশিদ মিয়া অল্পতে মাথা গরম করার বান্দা না। ফালতু লোকজনের বেহুদা কথার জবাব দিয়ে বেড়ালে দিনমজুর বাপের ঘরে জন্ম নিয়ে নিজ বুদ্ধিতে এক শ কানি জমির মালিক হতে পারত না। ছেলের ভয়ানক বেত্তমিজি কথা শুনেও তার গলা চড়ে না। শীতল গলায় সে বলে, ‘তোমার লগে বাহাস করনের কোনো ইচ্ছা আমার নাই। আমি শাদি কইরা যারে ঘরে আনছি, পিতার স্ত্রী হিসাবে সে তোমার আম্মা। বউরে ডাইকা কও তার নয়া শাশুড়িরে সালাম করুক। সাদা চিনি দিয়া মিষ্টিমুখ কইরা তারে ঘরে তুলতে কও। আর শোনো, নামার ক্ষেতের মাঠ পর্চা আননের লেইগা তোমারে ভূমি অফিসে যাইতে কইছিলাম, সেই কাম কি তুমি সমাধা করছ? অখন মাইয়া মানুষের মতো কাইজা-কেত্তন থামাইয়া ব্যাটা মানুষের মতো জমি-জিরাতের আলাপ করো।’ জমির প্রসঙ্গ তুলে মুরশিদ মিয়া ছেলের হুংকার এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিল। মুরশিদ মিয়ার দিনমজুর বাপ মনসুরউদ্দির বসতঘর বাঁধার মতো এক শতক জমির মালিকানা ছিল না। একশ কানি জমি মুরশিদ মিয়া তার এক জীবনে একলা কামাই করেছে। একটা মাত্র ছেলে বলে শহরুদ্দি বাপের ওপর ছড়ি ঘোরাবে—মুরশিদ মিয়া ছেলেকে অতখানি লাই দেওয়ার মতো বোকা না। সে যতদিন জীবিত আছে ততদিন তার ভোগের থালায় ছেলেকে ভাগ দিতে নারাজ। সংসারের সবাই তার দয়ার কাঙাল—এই খবর জানার মধ্যে মুরশিদ মিয়ার মনে জমির মালিকানার সুখ বাদশাহির জেল্লা ছড়ায়। মুরশিদ মিয়া সংসারের মাথা। তার কামাইয়ে ভাগ পেতে চাইলে পাতে মুখ দেওয়া যাবে না—মুরশিদ মিয়ার পাতের কিনারে পড়ে থাকা এঁটো কুড়িয়ে সংসারের সবাই সুখ পেলে সে কাউকে বাধা দেবে না। নয়া বউকে উঠানে খাড়া রেখে তার সামনে নামা ক্ষেতের মাঠ পর্চার কথা তোলার মানে বুঝতে শহরুদ্দির দেরি হয় না। শহরুদ্দি গলা নামিয়ে গজগজ করতে করতে ঘরে ফিরে যায়। মুরশিদ মিয়া মনে মনে হাসে। ভাবে, জোঁকের মুখে নুন পড়েছে। শহরুদ্দি ভবিষ্যতে ফের মাথা তুললে নুনের পরিমাণ চড়িয়ে দিতে হবে। জমি-জিরাতের মালিকানার রোয়াব মুরশিদ মিয়া লেবেঞ্চুসের মতো চুষে চেটে ভোগ করতে ভালোবাসে। বড়গিরি দেখাতে গিয়ে সে গাঁয়ের দশজনের পেছনে দরকারে অদরকারে দুই-চার টাকা খরচ করতে দ্বিধা করে না। গাঁয়ের মজলিশে খাড়ার ওপর পকেট থেকে শ টাকা বের করে পাটির ওপর ফেলে দিতে তার বুকের মধ্যে খচখচ করলেও রোয়াব টিকিয়ে রাখার খাতিরে তাকে কাজটা করতে হয়। নয়া একটা বিবি শাদি করে ঘরে আনার সময় কিঞ্চিত্ ধুমধামের ইচ্ছা মনের মধ্যে আনাগোনা করলেও ছেলে শহরুদ্দির ষাঁড়ের মতো গতর আর শুয়োরের মতো রাগের কথা চিন্তা করে ধুমধামের পথে সে পা বাড়াতে সাহস করে না। মসজিদে আছরের নামাজ পড়ে বাজারে চায়ের দোকানে বসতে দেওভাগের ইন্তাজ মুন্সি এক গাল হেসে বলে, ‘আমরারে না জানাইয়া একলা একটা নয়া বিবি ঘরে আনলা, কামডা কি ভালো হইল?’ ‘এই ভাবে চোরের মতো চুপে চাপে কাম সারনের বান্দা আমি মুরশিদ মিয়া না। সমাজ জামাতের নিয়ম রীতি মাইনা চলনই আমার ধর্ম। তয় আমার একটা মাত্র পুতের মাথার খুলির মধ্যে আল্লা ঘিলুর বদলে আগুনের গোলা ঢুকাইয়া দিছে। তার লগে কাইজা-কেত্তন করতে গেলে নিজের ইজ্জত বজায় থাকে না। আল্লা নিজে হাতে আমারে মাইরা রাখছে। তাইন আমারে নয় সন্তানের বাপ বানাইছে তয় বেটা সন্তান দিছে মোটে একখান। সেইখানেই আমার হাত-পাও বান্ধা।’ ‘আফশোস কর ক্যান মিয়া? বাড়িতে পরিবারের মুখে শুনলাম, তোমার নয়া বউ নাকি এক্কেবারে কচি ডাঙ্গর। তোমারও শরীর-স্বাস্থ্য মাশআল্লা যথেষ্ট ভালো। সবুর করো। আল্লার রহমত হইলে দুই-চারটা পোলা জন্মাইতে খুব বেশি সময় লাগব না।’ দুই শহরুদ্দির বউ ময়নার সঙ্গে নয়া বউয়ের মিলমিশ দেখে মুরশিদ মিয়া মুচকি হাসে। ভাবে, শাশুড়ি-বউ যখন মিলে গেছে তখন ছেলে আর বাড়াবাড়ি করার ছুতা পাবে না। ময়না তার সমবয়সি শাশুড়িকে আম্মা বলে ডাকে। গোসলের সময় পুকুর ঘাটে একজন আরেকজনের গা বাসের সাবান দিয়ে ডলে দেয়। নয়া বউ সংসারে এসে ছয় মাস না যেতে সেদিন ঘাটের পাশে মাথায় চক্কর খেয়ে কাত হয়ে পড়ে যেতে ময়নার মনে সন্দেহ জাগে। বলে, ‘কিগো আম্মা, বিষয় কী? শরীলে অন্যরকম কিছু টের পান নাকি? পেটে সন্তানাদি আসে নাই তো?’ এই বাড়িতে ময়না নয়া বউয়ের আপনা মানুষ। কাজেই মনের সন্দেহের খবর নয়া বউ তাকে খুলে বলতে ভয় পায় না। বলে, ‘গত দুই মাস মাসিক হয় না। এর অধিক কিছু আমার জানা নাই।’ শাশুড়ির মাসিক না হওয়ার খবর শুনে ময়নার মনের মধ্যে কষ্টের মোচড়। শহরুদ্দির সঙ্গে বিয়ে হয়ে এই সংসারে আসার পরে সে নিজেকে ধনী মানুষের বউ বলেই জানে। শ্বশুর মুরশিদ মিয়া চোখ বুজলে স্বামী শহরুদ্দি একলা একশ কানি জমির মালিক। ময়না তার আট ননদকে গনায় ধরে না। মুরশিদ মিয়ার বিচার-বুদ্ধি পরিষ্কার। মেয়েগুলোকে সে গরিব-কাঙাল দেখে বিয়ে দিয়েছে যাতে ওরা তার ছেলের সামনে কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। শহরুদ্দির কাঙাল বোনেরা গোঁয়ার ভাইয়ের কাছে ভিক্ষা চাইতে পারে কিন্তু বাপের জমির হিস্যা চাওয়ার সাহস পাবে না। পুরোনো হিসাব আজ আচমকা পাল্টে যেতে বসেছে। এবার নয়া বউয়ের পেট থেকে একটা পুত্র সন্তান জন্ম নিলে? মুরশিদ মিয়ার একশ কানি জমির অর্ধেক পঞ্চাশ কানি নয়া বউয়ের ছেলের ভাগে চলে যাবে। পঞ্চাশ কানি জমি হারানোর শোক সামাল দেওয়ার আগে ময়নার মাথায় আরেক দুশ্চিন্তা ঝিলিক দিয়ে ভেসে ওঠে। সে ভাবে, শহরুদ্দির কানে সত্মায়ের পেটে বাচ্চা আসার খবর পৌঁছালে গোঁয়ার মানুষটা না জানি কী গজব নামিয়ে আনে। শহরুদ্দি মাথা গরম করে তার বাপের ওপর হামলে পড়লে বুড়া নির্ঘাত মার্ডার হয়ে যাবে। মার্ডার কেসে শহরুদ্দি ফাঁসিতে ঝুললে তার গলার দড়ি ছোটানোর মতো দুনিয়ায় আর কেউ থাকবে না। আবার ছেলের হাতে মার খেয়ে বুড়া জানে বেঁচে গেলে আরেক বিপদ। বাপের গায়ে হাত তোলার অপরাধে মুরশিদ মিয়া নয়া বউকে জমি-জিরাত সব লিখে দিয়ে বসে থাকবে। তখন নারকেলের আরচি হাতে ভিক্ষায় বের হওয়া ছাড়া শহরুদ্দির রুটি-রুজির আর কোনো উপায় থাকবে না। স্বামী-শশুরের বিবাদ চিন্তা করে ময়নার মনের মধ্যে বেদিশা ভাব। সব দিক বিশদে ভাবতে গিয়ে ভয়ে ময়নার পেটের মধ্যে গুড়গুড় ডাক ছাড়ে। চুকা ঢেকুর উঠে জিহ্বার তলে তিতকুট পানি জড়ো হতে থাকে। কিন্তু মনের মধ্যে সাহস গুছিয়ে ময়না নয়া শাশুড়ির পেট বাঁধার খবর স্বামীকে বলতে পারে না। খবরটা স্বামীকে মুখ ফুটে না বললেও রাতদিন তার মন কু-ডাক ডাকতে থাকে। কিছুদিন যেতে শহরুদ্দি নিজেই নয়া বউয়ের পেটের খবর আঁচ করে। মুখে কিছু না বললেও বারান্দায় বসে চোখ সরু করে বাপের নয়া বউয়ের নরম গতির চলাফেরা নিরিখ করে দেখে এপাশে ওপাশে মাথা নাড়ে। স্বামীর খামোশ চেহারার দিকে চোখ পড়ার ভয়ে ময়না আজকাল সামনের উঠান পাশ কাটিয়ে বিচড়া ঘরের পেছন দিয়ে চলাচল করে। সেদিন সন্ধ্যায় মুরশিদ মিয়া পুতের বউকে ডেকে বলে, ‘আমি গ্রামের ময়-মুরুব্বিগো সাথে রাতের ট্রেনে সিলেটে মাজারে যাইতাছি। দুইদিন পরে ফিইরা আসুম। তোমার শাশুড়িরে একটু যত্ন নিও। মাইয়া মানুষের এইটা কঠিন সময়। তোমারে অধিক ভাইঙ্গা কী কমু? শহরুদ্দিরে কইও আগামীকাল শহর থেইকা ধান বেইচা ফেরার পথে যেন কিছু ফল-ফলারি কিইনা আনে। আমি হুজুর কেবলার দরবারে তার লেইগা একটা ভাই চামু। দোয়া কবুলের মালিক আল্লা। একটা ভাই পাইলে আমার বড় পুত শহরুদ্দির মাথায় ছাতি ধরনের একজন মানুষ হইব। এমন উত্তম একটা সিনারি ভাইবা আমি মনের মধ্যে আগাম আনন্দ পাইতাছি।’ মুরশিদ মিয়া পুতের বউকে ডাক দিয়ে কথাগুলো বললেও সে জানে ঘরের ভেতর বসে শহরুদ্দি তার বাপের কথা মন দিয়ে শুনছে। শ্বশুর চলে যেতে ময়না ঘরে ঢুকে স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। মুখ দেখে ময়না স্বামীর মনের কথা ঠাওর করতে পারে না। শহরুদ্দি মুখ ফুটে বাপের মুখের ওপর মন্দ কথা না বলায় ময়নার মনে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু মনের মধ্যে জমে থাকা অজানা ভয় ময়নার বুক থেকে সরতে চায় না। ভয়ের কারণ সে ভেঙে বুঝতে পারে না শুধু বুকের মধ্যে দুরদুর কাঁপুনি টের পেতে থাকে। তিন মুরশিদ মিয়া সিলেটে মাজারে বসে তার নয়া বউ খুন হওয়ার খবর পেল। ট্রেনের আশায় বসে না থেকে বাসে করে কিশোরগঞ্জ শহরে ফিরে সে যখন থানায় গিয়ে পৌঁছায় তখন শহরুদ্দিকে পুলিশ কোর্টে চালান করে দিয়েছে। মাথার ভেতর শূন্য ভাব নিয়ে থানার ছোট দারোগার সামনে মুরশিদ মিয়া থম ধরে বসে থাকে। একটা লোক সামনে বসে থাকলে কিছু বলতে হয়, তাই ছোট দারোগা নিচু স্বরে ধানক্ষেত থেকে লাশ উদ্ধারের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে। দারোগার মুখে লাশ উদ্ধারের সহজ বয়ান শুনে মুরশিদ মিয়ার মাথার ভেতর জমে থাকা ফাঁপা ভাব কেটে যেতে থাকে। নয়া বউ খুন হওয়ার খবর শোনার সাথে সাথে বউয়ের জিয়ন্ত মুখ মুরশিদ মিয়ার মন থেকে হারিয়ে গেছে। মুরশিদ মিয়া দেখছে, একটা মেয়েমানুষের লাশ পেছনের মাঠে ইরি ক্ষেতের কাদা পানিতে চিত্ হয়ে পড়ে আছে। মূহূর্তের জন্য তার চোখের সামনে থেকে দৃশ্যটা সরছে না। এক সময় সে গলা নামিয়ে বলে— ‘দারোগা সাব, উদ্ধারের সময় লাশের পিন্দনে কি কাপড় ছিল?’ দারোগা মুরশিদ মিয়ার দিকে সরু চোখে তাকায়। ভাবে, যুবতী ভিকটিমের বুড়া স্বামী লাশের গায়ে কাপড়ের সন্ধান করছে কেন? খুনের কেসে লোকটা নতুন কোনো ক্ল্যু দিতে চায় নাকি? বাজিয়ে দেখা দরকার। ‘লাশের পরনে সবুজ রঙের শাড়ি, লাল ব্লাউজ—এসব তথ্য সুরত হালে স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছি। খুনের বিষয়ে আপনার মনে কি অন্যরকম কোনো সন্দেহ আছে?’ প্রশ্ন শুনে মুরশিদ মিয়া সাবধান হয়ে ওঠে। দারোগার মনের ভাব আঁচ করে সে বলে, ‘জোয়ান স্ত্রীলোক একলা ঘরে ঘুমাইয়া ছিল। খুন হওয়ার আগে তার ইজ্জত নষ্ট হওয়ার কোনো আলামত পাইছেন কি না এইটা একটু জানতে চাইছিলাম আর কি।’ ‘একটা জোয়ান মেয়েছেলের লাশ লোকজনের সামনে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা যায় না। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে গেছে। ডাক্তাররা লাশ পরীক্ষা করে তার ইজ্জত-বেইজ্জতের খবর বিশদে লিখে দেবে। আগামী সপ্তাহে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে তখন বলতে পারব।’ মুরশিদ মিয়া থানা থেকে বেরিয়ে আসে। মাথার গুমোট ভাব কেটে তার চিন্তাভাবনা এখন পরিষ্কার। সে বোঝে, নয়া বউয়ের পোয়াতি হওয়ার খবর পেয়ে শহরুদ্দির মাথায় আউলা লেগে গেছে। শহরুদ্দি তার বাপের ঘরে একলা একটা পুত। বাপ মরে গেলে সে একা তাবত্ সম্পত্তির মালিকানা পাবে—একথা জেনে সে বড় হয়েছে। পিতার সয়-সম্পদে আচমকা একজন ভাগীদারের থাবা শহরুদ্দি মেনে নিতে পারে নাই। জমির ভাগীদারকে খুন করতে গিয়ে সে তার পোয়াতি সত্ মাকে গলা টিপে মেরেছে। মুরশিদ মিয়া ভাবে, জমি-জিরাতের লোভে বেচাল হয়ে পুরুষ মানুষ আকাম করে বসলে তাকে খুব বেশি দোষ দেওয়া চলে না। সয়-সম্পদের জন্য খুনাখুনি দুনিয়ায় নতুন কোনো ঘটনা না। জমি-জিরাতের বাইরে ভিন্ন একটা চিন্তায় মুরশিদ মিয়ার মাথা ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু বিষয়টা সুরাহা হওয়ার জন্য তাকে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে নয়া বউয়ের ইজ্জত ঠিকঠাক পাওয়া গেলে শহরুদ্দিকে বেশিদিন জেলের ভাত খেতে হবে না। খুনের কেসের গোড়া কেমন করে কেটে দিতে হয়, মুরশিদ মিয়া সেটা ভালো করেই জানে। মুরশিদ মিয়া ছেলের পাশে দাঁড়ালে ফাঁসির দড়ি শহরুদ্দির গলা ছুঁতে পারবে না। শহরুদ্দি দুনিয়ার ওপর তার হায়াত পুরা করেই মরবে। কিন্তু নয়া বউকে খুন করার আগে শহরুদ্দি তার ইজ্জতের হানি করে থাকলে সে তার বাপের ইজ্জতে থাবা বসিয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ঘটনা তেমন লেখা হলে শহরুদ্দির ফাঁসি কেউ ঠেকাতে পারবে না। তার লাশ বেওয়ারিশ বলে শহরে সরকারি গোরস্তানে গোর হবে; বাপ মুরশিদ মিয়ার একশ কানি জমির এক কোনায় সে সাড়ে তিনহাতের দখল পাবে না। তবে ছেলে শহরুদ্দির ভাগ্য তার বাপের হাতে নাই। শহরুদ্দির ভাগ্য নয়া বউয়ের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সাথে ঝুলে আছে।