গত ২৩, ২৪, ২৫ আগস্ট থেকে দর্শকদের অতি আগ্রহের কারণে আরও দুইদিন বাড়িয়ে ২৬ ও ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-মণ্ডলে উত্সবের আমেজে প্রদর্শিত হয়ে গেল কথানাট্য ‘চাকা’। বন্দনা, বর্ণনা ও নাট্যাভিনয় একই সুত্রে গাঁথা। এই অসাধরণ নাটকটির রচয়িতা বিরলপ্রজ নাট্যকার সেলিম আল দীন। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন এ সময়ের জনপ্রিয় ও তরুণ মেধাবী নাট্যনির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী। নাটকটিতে অভিনয় করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। আর নাটকটি প্রযোজনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর আগে দেশ-বিদেশের অনেক নাট্যকারের নাটক প্রযোজনা করলেও এই প্রথম ‘বাংলা নাটকের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো’ শ্লোগানের অন্যতম ধারক-বাহক, বাংলা নাটকের শেকড়-সন্ধানী গবেষক, শিক্ষক ও নাট্যকার সেলিম আল দীন-এর কোনো নাটক প্রযোজনা করলো। এবং এই বিরলপ্রজ নাট্যকারের ৬৪তম জন্মোত্সবে গত ১৭ আগস্ট শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৯১ সালে ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় সৈয়দ জামিল আহমেদ-এর নির্দেশনায় নাটকটি প্রথম মঞ্চায়িত হয়। সে সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে নাটকটি প্রশংসিত হয়। সৈয়দ জামিল আহমেদ নির্দেশিত নাটকটির ইংরেজিতে নাম ছিল ‘দ্য হুইল’। পরবর্তীতে নাটকটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম ‘চাকা’ নামেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
চাকা নাটকটি ১৯৯০ সালের বসন্তকালের শেষে বৈশাখে মাত্র পাঁচ দিনেই লেখা হয়ে যায়। ১৯৮৬-৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নূর হোসেন শহীদ হওয়ার পর গণঅভ্যুত্থান আকস্মিকভাবে স্তব্ধ হয়ে গেলে অন্য সবার মতো নাট্যকারও বিচলিত হন। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর বাদানুবাদের আর্বতে শহীদদের শব নাম-পরিচয়হীন দিগন্তের দিকে ভেসে যায়। আর এরকম বেদনায় এই ‘চাকা’ নাটকের চাকা এগিয়ে যায়। হয়তো এ চাকা পাড়ি দেবে চিরকলের গহ্বরে অনন্ত পথ—থামবে না কোনোদিন। আর কাঁদিয়ে যাবে কিছু মানবিক মানুষকে!
প্রথম মঞ্চায়নের প্রায় ২২ বছর পর নতুন নির্দেশকের নির্দেশনায় নতুন উদ্যোমে মঞ্চায়িত হচ্ছে নাটকটি। গত ২৭ আগস্ট বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়ও নাটক দেখার জন্য নাট-মণ্ডলের বাইরে দর্শকদের দীর্ঘ সারি। হঠাত্ খালি গায়ে এক কুশীলব চিরাচরিত বাংলার ধারায় শিঙায় ফুঁ দিয়ে জানিয়ে দিল, দর্শক প্রবেশের সময় হয়েছে। সব দর্শক ভেতরে প্রবেশ করলে দ্বিতীয়বার শিঙা বাজিয়ে জানিয়ে দিল নাটক এখনই শুরু হবে। এবং তৃতীয়বার শিঙা বেজে ওঠার সাথে সাথে ৭ জন কুশীলবের মঞ্চে প্রবেশ। প্রার্থনা-বন্দনা শেষে চারদিকে ঘুরে-ঘুরে এক কুশীলবের ডমরু বাদন। অতঃপর হঠাত্ ডমরুধ্বনি থেমে গেলে শুরু হয় নাটক—চাকা।
নাটকের শুরুতেই কথক আর এক শ্রোতার কথোপকথনে উঠে আসে কাকেশ্বরী গাঙের পাড়ে এলংজানিগঞ্জ, গঞ্জের পরিবেশ পরিচিতি। কথকের কথায় কথায় কাকেশ্বরীর পাড় হয়ে ঘুরে দক্ষিণে বাঁক নেওয়া গঞ্জের ভেতর দিয়ে ভাঙা ইটের রাস্তায় উঠে আসে ঘর্ষণমুখর গরুর গাড়ি। কথক আর গাড়োয়ানের কথকতায় উঠে আসে—এলংজানি হাসপাতাল।
এরপর উঠে আসে হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ। এই হাসপাতালেই আসে অপঘাতে মৃত এক যুবকের লাশ। বৈশাখের এক উজ্জ্বল ভোরে অত্যন্ত সহজ-সরল গাড়োয়ান, এক বৃদ্ধ চাচা ও দুই তরুণ, ডাক্তারের সহকারীর ‘সরকারি লাশ’ নামক দেখানো ভয়ে মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে লাশটিকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়। তাদের সঙ্গী হয় হাসপাতালের প্রতিনিধি সাঁওতাল ধরমরাজা। গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লেখা ঠিকানার কোনো সঠিক খোঁজ মেলে না। একসময় এক গ্রামের নামের সাথে এবং এক মৃত যুবকের নামের সাথে লেখা ঠিকানা আংশিক মিলে যায়। কিন্তু প্রকৃত ঠিকানার অভাবে তারাও নিশ্চিত হতে পারে না।
সেই গ্রামের স্কুলশিক্ষক লাশটি পাশের গ্রামের কারও হবে বলে সন্দেহ করে। পাশের গ্রামে গিয়ে দেখে, লাশটা সে গ্রামেরও কারও নয়। এভাবে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে চলে। রাতের পর রাত কাটে, ভোর হয়, তবুও নির্দিষ্ট ঠিকানা আর মেলে না। এভাবে লাশ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে লাশটাকে তারা আপন করে নেয়। একসময় খেজুর পাতার চাটাই দিয়ে মোড়ানো লাশে পচন ধরে। সারি সারি পিঁপড়ারা লাগে লাশে। গাড়োয়ান ও তার সঙ্গিদ্বয় হাত দিয়ে পিঁপড়া সরিয়ে দেয়, পিষে মারে। অতঃপর বারবার ভুল ঠিকানায় আসা লাশটা যখন নবীনপুর নামক গ্রাম থেকেও প্রত্যাখ্যাত হয়, কেউ লাশটা শনাক্ত করে না, তখন তারা লাশটাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনে এক শীর্ণ নদীর তীরে। সায়াহ্নের বিষণ্নতা বিস্তৃত হবার কালে বালু সরিয়ে কবর বানিয়ে অব্যক্ত বেদনায় অশ্রুপাতের সাথে লাশটাকে দাফন করে।
নাটকটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, কুশীলবদের অসাধারণ অভিনয় এবং মঞ্চের পরিবেশ এক শোকাবহ এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে নাটক দেখতে আসা প্রতিটা দর্শককে। গাড়োয়ান এবং দুই তরুণ, অপঘাতে নিহত যুবকের লাশ অস্পষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হলভরতি দর্শক বিচিত্রসব অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। মেঠো পথের বাঁকে বাঁকে আনন্দ-বেদনার যে সুর এই কথানাট্যে তুলে আনতে চেয়েছে, তার ষোলো আনাই যেন পূরণ হয়েছে। বিশেষ করে বাহের গাড়োয়ান চরিত্রে মাহ্জাবীন ইসলাম-এর গরুর গাড়ি চালানো, চলন-বলন, অভিনয়ের পদে-পদে শরীরী ভাষার প্রকাশ, চলন্ত গাড়িতে বসে লাশের সাথে আনমনে কথা বলার ধরন এবং প্রৌঢ়া চরিত্রে নুসরাত শারমিন-এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলাফেরা, কথা বলা এবং মহরমের বেদনা-বিদুর পুুঁথিপাঠ মনে রাখার মতো অভিনয়। হয়তো আমার মতো সকল দর্শককেও মুগ্ধ করেছে শুকনো পাতা দিয়ে ঘেরা ভুমিসমতল বৃত্তমঞ্চ। যা আমাদের বাংলা নাটকের ঐতিহ্য বহন করে। বৃত্তাকার মঞ্চের মাঝে বৃত্তাকার প্রপস বা উপকরণের ব্যবহার পুরো মঞ্চটাকে ‘চাকা’-র মতোই মনে হয়েছে।
মূল নাটকটিতে কোনো গান না থাকলেও নির্দেশক, এই কথক নাট্যের কথাগুলোকেই সাজিয়ে গান তৈরি করে তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। নীলা সাহার সংগীত-পরিকল্পনায় সমবেত গীতে অংশ নিয়েছে বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীগণ। চাকা নাটকটির নির্দেশনার পাশাপাশি প্রসংশাযোগ্য মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা করেছেন সুদীপ চক্রবর্তী। দেশীয় ঐতিহ্যের আলোকে চরিত্রানুযায়ী ওয়াহীদা মল্লিকা জলির পোশাক পরিকল্পনা এবং রহমত আলীর রূপসজ্জাও ছিল অসাধারণ।
কীর্তিমান নাট্যকার সেলিম আল দীন-এর মৃত্যুর প্রায় ৬ বছর পর পুনরায় মঞ্চে এসেছে চাকা। চাকা নাটকের প্রতি দর্শকদের তুমুল আগ্রহ এটাই প্রমাণ করেছে, পৃথিবীর যেকোনো জাতি তার শেকড়েই পরিপূর্ণ তৃপ্তির স্বাদ পায়।
উল্লেখ্য, নাটকটি আগামী ১২, ১৩, ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-মণ্ডলে প্রদর্শিত হবে।
