বাংলাদেশে যক্ষ্মা একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা। এর ঝুঁকি এখনো কাটেনি। বাংলাদেশে প্রতি লাখে নতুনভাবে ২২৫জন এবং নতুন-পুরানো মিলে ৪১১জন এই রোগে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে মারা যান ৪৫জন। সচেতন হলে এই সংখ্যা কমানো সম্ভব। বৃহস্পতিবার মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, দৈনিক ইত্তেফাক ও ব্র্যাক এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচর্যায় সরকারি-বেসরকারি সম্পৃক্ততা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই তথ্য জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, বেসরকারি চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সা গ্রহণ, রোগ নির্ণয়ের সুবিধার অপ্রতুলতা, যক্ষ্মা রোগী সনাক্তকরণের হার ও সাফল্যের হারে বড় ধরনের পার্থক্য, শহর এলাকায় যক্ষ্মার কার্যক্রম সমপ্রসারণের অভাব, ডায়াবেটিস /এইচআইভি এইডস ও যক্ষ্মা যৌথ ইনফেকশন নির্ধারণ না করা, যক্ষ্মা নিয়ে ফলপ্রসূ গবেষণা না থাকাসহ নানা কারণে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে দেশের অর্জন থাকলেও কিছু বিষয়ে এখনো জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খোন্দকার সিফায়েতউল্লাহ বলেন, যক্ষ্মা একটি পুরনো সংক্রামক ব্যাধি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য গণমাধ্যম সবসময় বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। সর্বোপরি তাদের কারণে শতভাগ স্বাস্থ্য কর্মসূচি সফলতা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। সরকার এককভাবে কোন কিছু করেই সকল মানুষের সেবা দিতে পারবে না। এরজন্যে এনজিও সুশীল সমাজ সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
নাটাব’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, দারিদ্র্যের মতো যক্ষ্মা একটি সমস্যা। যতদিন দারিদ্র্য থাকবে ততদিন যক্ষ্মা থাকবে। তিনি বলেন, সরকারে যে দলই থাকুক না কেন, একটা রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থাকতে হবে।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. আশেক হোসেন বলেন, শতভাগ রোগী যারা যক্ষ্মায় আক্রান্ত তারা সবাই ‘ডটস সেন্টার’ থেকে বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা নিতে পারেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ম. হামিদ গণমাধ্যমকে সম্পৃক্তকরণের বিষয়ে বলেন, গণমাধ্যম প্রবল ভাবে সম্পৃক্ত আছে এবং আরো প্রবলভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
ব্র্যাকের স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, বছরে প্রায় ২ লাখ যক্ষ্মা রোগীকে সনাক্ত করা হয়। এদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগই দরিদ্র। এদের অপুষ্টি একটা বড় সমস্যা, যক্ষ্মা রোগীদের যাতায়াত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিছু টাকা খরচ হয় এবং এদের চিকিত্সার পাশাপাশি পুষ্টি না দিলে চিকিত্সাটাও নিশ্চিত হয় না। এ বিষয়গুলোতে নজর দেয়া উচিত।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূর। তিনি বলেন, যক্ষ্মা চিকিত্সায় গ্রাম পর্যায়ে সিভিল সার্জনদের আরো বেশি সহযোগিতা করা এবং কোর্স সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনটিপি’র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কনসালটেন্ট ডা. মুজিবুর রহমান। এতে বলা হয়, ২০১১ সালের পরিসংখ্যান আনুযায়ী, দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৬৪ জন। তবে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১১ সালে যক্ষা রোগী কমেছে। ২০০৯ সালে কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগীদের ৭৪ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭০ শতাংশ সনাক্ত হয়। ২০১১ সালে এ হার ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
দৈনিক ইত্তেফাক’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিস সৈকত বলেন, যক্ষ্মা বিষয়ক তথ্যগুলো গণমাধ্যমকে জানালে অনেক ভালো প্রতিবেদন তৈরি হবে। কোথায় গেলে ডাক্তার পাওয়া যাবে, কোথায় গেলে ওষুধ পাওয়া যাবে—তৃণমূলে এসব তথ্য পৌঁছানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো দরকার।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. নুরুজ্জমান বলেন, ৫ হাজার প্যারা মেডিক্যাল সেন্টারের আওতায় চা বাগান, জেলখানাকে আনা হয়েছে।
এনআইডিসিএইচএর সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুর শাকুর খান বলেন, ছয় মাসের কোর্স অনেক ক্ষেত্রে রোগী সম্পূর্ণ করে না। এক্ষেত্রে স্কুলে এই বিষয়টির শিক্ষা দেয়ার উপর জোর দেন তিনি।
ডেমিয়েন ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর বার্ট রোম বাউট ২০ বছরে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য স্বীকার করে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক মেডিক্যাল টেকনোলজি বেশি বেশি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ডা. এটিএম সানাউল বাসার ২০৬টি উপজেলায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে যক্ষ্মা বিষয়ক তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রাইভেট চিকিত্সকরা অনেক ক্ষেত্রে ডটসকে নিরুত্সাহিত করেন। এই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিকস সমিতির সহযোগী অধ্যাপক ও প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা.মো.দেলোয়ার হোসেন ডায়াবেটিক রোগীদের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রতি একশ জন ডায়বেটিক রোগীর মধ্যে ১০ জন যক্ষ্মা রোগী পাওয়া যায়। এসব যক্ষ্মা রোগীকে কিচিত্সা সেবার আওতায় আনতে হবে।
ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক ড. আকরামুল ইসলাম দরিদ্র যক্ষ্মা রোগীদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার জন্য সুপারিশ করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জাতীয় প্রফেশনাল কর্মকর্তা ডা. ভিকারুননেসা বেগম বর্তমানে এক্সপার্ট মেশিনে ২ ঘন্টায় রোগ নির্ণয় করার কথা জানিয়ে বলেন, আমাদের যে অর্জন নথিভুক্ত আছে তার চেয়ে বেশি সাফল্য অর্জিত হয়েছে। যা স্বল্প সময়ে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়কে তিনি উল্লেখ করেন। একই প্রতিষ্ঠানের ডা. সাবেরা সুলতানা বিজেএমই ও বিকেএমইকে ডটস্ অন্তর্ভুক্ত করাকে একটি অন্যতম সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করে এই সাফল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে কাজ করার আহবান জানান। তিনি শহর এলাকার বস্তিবাসীদের উপর জোর দেয়ার পরামর্শ দেন।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. নুরুজ্জামান হক, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির সিনিয়র সেক্টর স্পেশালিস্ট ডা. শায়লা ইসলাম, স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির সিনিয়র সেক্টর স্পেশালিস্ট ডা. জাকিয়া সুলতানা সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেইঞ্জ’র প্রোগ্রাম কো-অডিনেটর এলিসন সুভ্রত বাড়ৈ, লেপ্র বাংলাদেশ’র প্রোগ্রাম অফিসার ডা. ফারহানা রহমান, ডা. মোস্তাফিজা রুজদি, টিবি ইউপিএইচসিডিপি’র কনসালট্যান্ট ডা. লুত্ফর রহমান, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সফিউদ্দিন সিকদার।
