সিরিয়ার নিরীহ জনগণের উপর দেশটির সেনাবাহিনীর কথিত রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের বিরুদ্ধে দেশটির উপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলা নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে উদ্বেগ-উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল পাওয়ার’ ব্যবহার না করায় সেই যুদ্ধের ‘দামামা’ অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। যদিও এই কৃতিত্বর বেশিরভাগ দিতে হবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে। তিনি প্রথম থেকেই সিরিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গরম মেজাজ কিছুটা নরম করতে সক্ষম হয়েছেন। রাশিয়ার প্রস্তাব অনুসারে এখন ওয়াশিংটন ও মস্কো সিরিয়ার সব রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়ার উপর মার্কিন সামরিক হামলা অবশ্যাম্ভাবী এবং অনিবার্য। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় এবং প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ওবামা মার্কিন সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ সর্বোপরি মার্কিন জনমতকে সিরিয়ায় হামলার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন। যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো সিরিয়ার ব্যাপারে তেমন সাড়া মিলছে না। রাশিয়ার সাথে চীনও সরাসরি বিরোধিতা করছে। সবচাইতে পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র ইংল্যান্ডের নিম্নপরিষদের (হাউজ অব কমনস) ভোটাভুটিতে সিরিয়া আক্রমণের সমর্থক সদস্যরা হেরে গেছেন। অবশ্য এসব কোনো কিছুই যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়া আক্রমণ থেকে নিবৃত্ত করতে পারবে না যদি ওবামা তার একক ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি অথবা সিরিয়ার পুরনো মডেলের মিগ সিরিজের শতাধিক জঙ্গি বিমান বা সদ্য কেনা রাশিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোন প্রতিবন্ধক নয়। এমনকি ব্র্যাকেটবন্দি ইরানের বন্ধু শ্রেষ্ঠ (একমাত্র) সিরিয়াকে রক্ষা করার আস্ফাালনও যুক্তরাষ্ট্র গ্রাহ্য করবে বলে মনে হয় না। উল্লেখ্য, সৌদি আরব ইতিমধ্যেই সিরিয়ার ব্যাপারে মার্কিন উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে।
সিরিয়ায় সামরিক অভিযান বৈধ না অবৈধ এই বিতর্ক বাদ দিলেও অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, হামলার ফলে পরিস্থিতি নাটকীয় এবং ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কেননা ইতিমধ্যে ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন রাশিয়ার যুদ্ধ জাহাজের কাছাকাছি ইসরাইল দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ইসরাইলের ভাষায় এটি ছিল তাদের রুটিন পরীক্ষা। কিন্তু পর্যবেক্ষক মহলের বিশ্বাস, এটা সিরিয়ায় মার্কিন হামলার সমর্থনে ইসরাইলের একটা উস্কানিমূলক পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া অভিযানের সুযোগে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরান আক্রমণ করতে পারে তার পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য। যা ইসরাইলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা ঘটলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ‘কুরুক্ষেত্রে’ পরিণত হবে। তবে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, প্রেসিডেন্ট ওবামা থাকতে ইসরাইল তা করতে পারবে না। তবে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন হলে ঐ এলাকায় ইরানের প্রভাব ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।
গত ২১ আগস্ট নিরীহ সিরীয়দের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের অভিযোগ আসাদ সরকার অস্বীকার করেছেন। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পাল্টা অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীরাই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। কিন্তু কোনো পক্ষই তাদের দাবির স্বপক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ দেখাতে পারেনি। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে স্বাধীনতাকামী মুসলিম চেচেন বিদ্রোহীরা মস্কোর থিয়েটার হল দখল করে প্রায় ২০০ লোককে জিম্মি করেছিল। রাশিয়ার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সরকার জিম্মি উদ্ধারে থিয়েটার হলে চেতনানাশক গ্যাস প্রয়োগ করে জিম্মি সংকটের নাটকীয় সমাধান করেছিল। এই গ্যাসের প্রভাবে চেচেন বিদ্রোহীসহ শতাধিক নিরীহ থিয়েটার দর্শক প্রাণ হারান। অনেকে এই গ্যাসকে ‘সারিন’ নামে অভিহিত করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দামেস্কে ব্যবহূত গ্যাসটিকে সারিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যা সহস্রাধিক নিরীহ নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিষয়ক সিনেট কমিটি সিরিয়ায় সীমিত অভিযানের অনুমতি দিয়েছে। অভিযানের স্থায়িত্ব হবে ৬০ দিন। প্রয়োজনে আরো ৩০ দিন বাড়ানো যাবে এবং এই সামরিক অভিযানে ল্যান্ড ফোর্স (স্থলবাহিনী) অংশগ্রহণ করবে না। অর্থাত্ ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোই আক্রমণের মূল দায়িত্ব পালন করবে। যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী বিমান ও নৌবাহিনী সূচারুভাবে তাদের দায়িত্ব পালনের পর যুদ্ধজয়ের মূল কাজটি করে স্থল বা পদাতিক (ইনফ্যান্ট্রি) বাহিনী এবং তাদের সঙ্গে থাকতে পারে গোলন্দাজ (আর্টিলারি) বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা হয়তো ধরেই নিয়েছেন সিরিয়ার অভ্যন্তরে সরকার বিরোধী বিদ্রোহীরা ‘স্থলবাহিনীর’ কাজটি সম্পন্ন করতে পারবেন। যারা ইতিমধ্যেই যুদ্ধের চেয়ে লুটপাট এবং অনৈতিক কাজের জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। হয়তো ৬০ দিনের ব্যাপক বিমান আক্রমণের সময় বিদ্রোহীদের হাতে ভারি অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। প্রেম ও যুদ্ধ সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে শুরু করা যেতে পারে কিন্তু তা কখন কোথায় এবং কিভাবে শেষ হবে তা কে বলতে পারে।
