গত আগষ্টের এক সকালে কিউবার গুয়ানতানামো কারাগারের ভেতরে পায়চারি করছেন তিনি। কিছু সময়ের জন্য দরজাটা খোলা ছিল। আর এই সুযোগে সূর্যের আলো মেঝেতে যেন ভিন্ন রকম একটা আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিল। কিন্তু এই আলোর মধ্যে যার পা দুটো চলতে দেখা যায়, সেই ব্যক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ অকালে ঝরে গেছে। কিন্তু এর জন্য তার একটুও অনুশোচনা নেই। বরং গর্বই হয় তার। আর সেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে প্রাণ ঝরার আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে। এই দিনটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে কাঁদায় এবং সন্ত্রাসেরবিরোধী চেতনাকে আরো জাগ্রত করে।
তিনি খালিদ শেখ মোহাম্মদ। এই ব্যক্তিই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারসহ কয়েকটি স্থানে হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। গত বুধবার নারকীয় ঘটনার সেই দিনটির এক যুগ পালন করলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যে দিনটি এখনো বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়া দেয়। পুরো যুক্তরাষ্ট্র যেন স্তব্ধ হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। এই হামলাই যুক্তরাষ্ট্রকে এক দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধে জড়িয়ে রেখেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সদস্যরা নাটকীয়ভাবে যাত্রীবাহী চারটি বিমান ছিনতাই করে একযোগে নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের গ্রাউন্ড জিরোতে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র টুইন টাওয়ার ও ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এই সন্ত্রাসী হামলায় ১১ জন বাংলাদেশিসহ ৯৬টি দেশের প্রায় ৩ হাজার লোক প্রাণ হারায়।
হামলার পরিকল্পনায় খালিদের সঙ্গে ছিলেন আরো চারজন। এরা হলেন, ওয়ালিদ বিন আতাশ, ওমর আল-বালুচি ওরফে আবদ আল-আজিজ, রামজি বিনালশিব এবং মুস্তাফা আহমেদ আল-হাওয়াসাই। এরা অর্থ এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড এবং ২ হাজার ৯৭৬ জন ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যাকে একনামে চিনেন সেই ৪৮ বছর বয়সী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার খালিদকেই টুইন টাওয়ার হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে মনে করা হয়। ২০০৩ সালের ১ মার্চ তিনি গ্রেফতার হন। ইরাকে হামলার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে। পেন্টাগন তখন ইরাকে হামলার প্রস্তুতি নিচেছ। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অভিযোগ করেছিলেন, ইরাকের প্রেসিডেন্টের সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে আল-কায়েদার সম্পর্ক আছে এবং সাদ্দামের কাছে ব্যাপক গণবিধংসী অস্ত্র আছে। কিন্তু পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার জানিয়েছিলেন, খালিদের বিচার নিইউয়র্কে হবে। কিন্তু পরে জাতীয় নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সেটি আর সম্ভব হয়নি। তাহলে কি আল-কায়েদা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি? কোনো আমেরিকানই মনে করে না যে হুমকি এখনো শেষ হয়ে গেছে। যদিও ওবামা এবং তার প্রশাসন চেষ্টা করছে ভীতি দূর করতে। রক্ষণশীলরা মনে করেন খালিদ আমেরিকার জন্য হুমকি। তার বিচার হওয়া উচিত সামরিক আদালতে। ২০১১ সালে খালিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
নাইন ইলেভেন কমিশনের রিপোর্টের লেখক জানিয়েছেন, খালিদ ১৯৯০ সালে আল-কায়েদার মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তার এক সহকর্মী তাকে বুদ্ধিমান এবং মাঝে মাঝে রাগান্বিত বলে আখ্যায়িত করেন। সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাবেক কর্মকর্তা মার্ক সেগমেন বলেন, নাইন ইলেভেনের হামলার পর তার সুনাম আকাশ ছুঁয়ে যায়। যখন তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন, তখন তিনি ‘বীর’ হিসেবে আখ্যায়িত হন। তিনি এখন আর আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেননা। কিন্তু তিনি আল-কায়েদাকে প্রভাবিত করতে পারেন।
প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, এক বছরের মধ্যে বিচারকাজ শুরু হবে। কিন্তু বিরোধী আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আরো কয়েক বছর সময় লাগবে। খালিদের আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, রোমানিয়া এবং পোল্যান্ডে নিয়ে সিআইএর কর্তৃক তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। তাকে আধা ঘন্টা ধরে মারধর করা হয়েছে। তার মাথা দেয়ালে আঘাত করা হয়েছে। ওয়াটারবোর্ডিংয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে ডাক্তারের বাধার কারণে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
আদালতে সামরিক পোশাক পরেন খালিদ। এর মাধ্যমে তিনি বার্তা দিচ্ছেন যে তিনি একজন সৈনিক। তিনি কুয়েত সিটিতে একটি ধর্মীয় পরিবারে বড় হয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। তার আত্মীয়-স্বজন বেলুচিস্তান থেকে এসেছেন। ১১ কিংবা ১২ বছর বয়সে তিনি টেলিভিশনে মিসরের রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের অনুষ্ঠান দেখেন। এরপর তিনি ইয়ূথ ক্যাম্পে যান এবং জিহাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে তার পরিবার তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা করতে পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে খালিদ নর্থ ক্যারোলাইনা এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনিক্যাল স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকৌশল বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি আফগানিস্তানে পানিশক্তিবিজ্ঞানে নিয়োজিত হন। ওই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত মুজাহিদিনদের সমর্থন দেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয়ে যান। নাইন ইলেভেন কমিশন রিপোর্টের প্রধান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় দেশটির প্রতি তার কোনো ঘৃণা জন্মেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন তিনি। এর মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের জিহাদি কর্মকান্ড তাকে আকৃষ্ট করে। তিনি সহিংসতা পছন্দ করতে শুরু করেন। রাজনৈতিকভাবে জনগনকে জাগ্রত করতে ২০০১ সালে হামলার করেন । তিনি ১০টি বাণিজ্যিক প্লেন হাইজ্যাক করার পরিকল্পনা করেছিলেন। খালিদ তার কর্মকান্ডের জন্য কখনো ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি।
আল কায়েদা হুমকিতে এখনো
আতঙ্কিত যুক্তরাষ্ট্র
আল কায়েদার শীর্ষনেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ছোট পরিসরে হামলা চালানোর আহবান জানিয়েছেন। দেশটির অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে এই হামলার আহবান জানান তিনি। তিনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আরো হামলা দেখার প্রত্যাশা করেছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রকে আতঙ্ক ও উদ্বেগের রাষ্ট্রে পরিণত করতে বেপরোয়া হামলা চালানোর মধ্য দিয়েই সম্ভব বলে মনে করেন আল-কায়েদা নেতা। তিনি বলেন, ‘আমাদের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ক্ষরণ ঘটানো আর সেটা তাদের বিপুল ব্যয়ে পরিচালিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো বাড়ানোর বিষয়টিকে উস্কে দেবে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের মূল দুর্বলতা হচ্ছে তার অর্থনীতি যা ইতোমধ্যে সেনা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের মধ্যদিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখনও আল-কায়েদা, গণবিধ্বংসী অস্ত্র এবং নিজেদের নিরাপত্তার অভাববোধ করছে। ১৯৮০-র দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে যোগ দিয়েছিল ওসামা বিন লাদেন সহ একদল আরব যোদ্ধা। সেই সংগ্রামই পরে আল-কায়েদার জন্ম দেয়। সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের সম্ভাব্যতা অনেক মার্কিনীদের মনে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে, আবারো তাদের সন্তানদের ইরাক-আফগানিস্তানের মতো সিরিয়ায় মৃত্যুর সাথে লড়তে হবে কিনা। অন্যদিকে, সিরিয়ায় হামলা করলে এর পার্শ্ববর্তী দেশ ইরান সহজে ছেড়ে দিবে না। আবার সিরিয়াকে কড়া জবাব না দিতে পারলে ইরানের কাছে তাদের জাতি হিসেবে দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। লাদেনের মৃত্যুর পর ওবামা বলেছিলেন, আল-কায়েদার শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। এরপরও আফগানিস্তান, পাকিস্তান থেকে শুরু করে আরব দেশগুলো, উত্তর আফ্রিকা, এমনকি সিরিয়াতেও তাদের দৌরাত্ম্য কিন্তু এখনও কমেনি।
টুইনটাওয়ার হামলার সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ গিয়ে পড়ে ওসামা বিন লাদেনের উপর। শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। লাদেনকে জীবন দিয়ে সেই অভিযানের মূল্য দিতে হয় ১০ বছর পর ২০১১ সালে। সমপ্রতি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯৪ ভাগ মার্কিনী মনে করেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয় হয়নি। মাত্র ১৪ ভাগ মনে করেন আগামী ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধরে জয়ী হতে পারে। এসব অনুভূতির কথা মাথায় রেখেই হয়ত গত মঙ্গলবার জাতীয় জরুরি অবস্থা আরো এক বছর বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন ওবামা। ২০০১ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর এটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
২০০১ সালে যাত্রীবাহী বিমানের আঘাতে যেখানে টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়েছিল সেই ‘গ্রাউন্ড জিরো’র বর্তমান অবস্থা এখন কেমন? এক কথায় বলা যায়, স্মৃতিস্তম্ভ আর নির্মাণকাজের স্থান। ২০০১ সালের ঐ হামলার পর ঊদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক দমকল বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য। তাদের স্মরণে বানানো হয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি একটি স্মৃতিস্মারক। সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন তাদের আত্মীয়স্বজনরা তৈরি করেছেন ‘ট্রিবিউট ডব্লি¬উটিসি ভিজিটর সেন্টার’। টুইন টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষের নীচ থেকে পাওয়া নিহতদের ব্যবহূত বিভিন্ন জিনিস রাখা হয়েছে ওই ভিজিটর সেন্টারের মধ্যে রয়েছে চার মিটার দীর্ঘ বেঁকে যাওয়া ইস্পাতের তৈরি বিম, আছে ময়লা ঢাকা এক জোড়া জুতা, ভেঙে যাওয়া ব্রিফকেস আর এক দমকল কর্মীর পুড়ে যাওয়া হেলমেট ইত্যাদি। টুইন টাওয়ারের ভিত্তি চিহ্নিত করে রাখতে জলাধার তৈরি করা হচ্ছে। জলাধারের চারপাশে চারশ’ ওক গাছ লাগানো হয়েছে। নির্মিত হচ্ছে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার মেমোরিয়াল’। এর ভেতরে থাকবে জাদুঘর ও স্মৃতিস্মারক। এছাড়া সেখানে তৈরি হচ্ছে কয়েকটি উঁচু ভবন, যেগুলোর কাজ শেষ হবে ২০১৫ সালে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবনটি হবে ‘বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র-১’। ১০৪ তলা বিশিষ্ট এর উচ্চতা হবে ১৭৭৬ ফুট যা হবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উঁচু ভবন।
