আলোর পথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভার্সিটি

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩৫
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি শুরু হলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েই গেছে। আর সেই সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজনৈতিক সমস্যা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এই পাঁচ বছরে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ‘আমব্রেলা প্রকল্প’ শুরু করলেও সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই প্রকল্পগুলোতে যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বেশ কিছু বছর আলোর মুখ দেখেনি সেই প্রতিষ্ঠানগুলো। এই প্রকল্পের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুণ্য জন্মভূমি গোপালগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে যাবে তখনই প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়েছিল চারদলীয় জোট সরকার। তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাত বছরের জন্য অন্ধকারে তলিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোর মুখ দেখে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহূদয় সহযোগিতায় বর্তমানে ৬টি অনুষদের আওতায় ১১টি বিভাগ নিয়ে তার শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এবছর চালু হচ্ছে আরও ৩টি নতুন বিভাগ ও একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠার পেছনের কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্ম প্রক্রিয়ায় যেমন কল্যাণের মমতার ছোঁয়া আছে, তেমনি অকল্যাণের তীক্ষ নখরাঘাতের চি?হ্নও আছে। জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। বাংলাদেশের যেসব জেলায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই- তেমন ১২টি বৃহত্তর জেলায় ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ৬টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়। এই ৬টির মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি ছিল অন্যতম। ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগের প্রফেসর পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় আমাকে প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত করে গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন, জমি অধিগ্রহণ (প্রায় ৫৫একর) এবং জমি ভরাটের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ইতিমধ্যে ২০০১ সালের ৮ জুলাই মহান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হয়। ২০০১ সালের ১৩ জুলাই তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে আমাকে নিয়োগের সুপারিশ করেন এবং রাষ্ট্রপতি ১৯ জুলাই ২০০১ সেই নিয়োগ অনুমোদন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণ করেই প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান গোপালগঞ্জ, রংপুর ও রাঙ্গামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম স্থগিত করে দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে জামায়াত-বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েই ২০০২ সালের ১৫ এপ্রিল হিংসার বশবর্তী হয়ে জাতির জনকের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে এবং আমার নিয়োগ বাতিল করে আমাকে আমার পূর্বতন প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের নির্দেশ দেয়। তাছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে, ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগ্যাকাশ থেকে অমানিশার ঘোর অন্ধকার কাটতে শুরু করে। ২০০৯ সালের নভেম্বরে স্থগিত প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ২০১০ সালের ৫ জানুয়ারি বর্তমান সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে আবারও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করেন এবং ২০ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ আইন-২০০১ বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসআরও জারি করে। এরপর ১৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান আমাকে পুনরায় ৪ বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ প্রদান করেন। একাডেমিক কার্যক্রম প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসে চারটি অনুষদ; ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান, বিজনেস স্টাডিস এবং হিউমেনিটিজ অনুষদে পাঁচটি বিভাগ যথাক্রমে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স, গণিত, ব্যবস্থাপনা এবং ইংরেজি বিভাগ খোলা হয়েছে। প্রতি বিভাগে ৩২ জন করে মোট ১৬০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছে। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে আরও নতুন ২টি অনুষদ (জীববিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান) ও ৬টি বিভাগ চালু হয়েছে। বিভাগগুলো হলো: ফার্মেসি, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এ্যানালাইটিক্যাল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল কেমিস্ট্রি, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির আসন সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ১১ বিভাগে মোট ৫২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স, গণিত, পরিসংখ্যান, ব্যবস্থাপনা, ইংরেজি, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ৫০ জন করে এবং ফার্মেসি, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এ্যানালাইটিক্যাল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল কেমিস্ট্রি বিভাগে ৪০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এবছর অর্থাত্ ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে আরও ৩টি বিভাগ ও একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট চালু হচ্ছে। বিভাগগুলো হলো: বাংলা, লোক প্রশাসন ও হিসাববিজ্ঞান। গবেষণা ইনস্টিটিউটটির নাম হবে “Bangabandhu Institute of Liberation War and Bangladesh Studies”। লেখক : ভাইস-চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ