গোপালগঞ্জ মহকুমাকে জেলা হিসাবে ঘোষণার পর ১৯৮৪ সালে জেলা মত্স্য দপ্তর স্থাপিত হয় এবং প্রথমে দপ্তরটি একটি বেসরকারি ভাড়াবাড়ীতে কার্যক্রম শুরু করে। গোপালগঞ্জ জেলায় বর্তমানে ৬-৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় মত্স্য উন্নয়ন প্রকল্প ২০০৯-২০১০ আর্থিক সাল হতে জেলার মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, পুষ্টির যোগান, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ মত্স্যসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রকৃতিগতভাবে গোপালগঞ্জ জেলা নীচুভূমি। এখানে খাল, বিল নদী-নালা, বাঁওড়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মাছের প্রাচুর্য অন্য জেলা হতে বেশি ছিল। জেলার চান্দার বিল, মোল্যার বিল, বর্নী বাঁওড়, টুংগীপাড়া খোট জলমহাল, মধুমতি বাঁওড়, বিলরুট ক্যানেলে এক সময় মাছের প্রাচুর্য এত বেশি ছিল যে এখানকার জনগণের মাছের চাহিদা পূরণ করার পরেও প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ ট্রাক মাছ ঢাকাতে বিক্রির জন্য মত্স্য ব্যবসায়ীরা নিয়ে যেত। কিন্তু নদী, খাল, বিলসমূহ ক্রমাগত ভরাট হওয়া, জনসংখ্যার বৃদ্ধির চাপ, বাঁধ, কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর ফাঁদ ব্যবহার করে মাছ ধরা, কিটনাশকের যথেচ্ছা ব্যবহার অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ করে মাছের চলাচলে বাধা সৃষ্টির কারণে বর্তমান জেলায় মুক্ত জলাশয়ে মাছের উত্পাদন অনেক কমে গেছে। ১২ লক্ষ ৬০ হাজার ৭৯১ জন জনসংখ্যার গোপালগঞ্জ জেলায় মোট মাছের চাহিদা বাত্সরিক ২২৬৯৪.২২ টন থাকা সত্ত্বেও এখানে বাত্সরিক ২৬৮৩৪.৮৮ টন মাছ উত্পাদন হচ্ছে। উল্লিখিত মত্স্য উত্পাদনে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় মত্স্য উন্নয়ন প্রকল্প ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। গোপালগঞ্জ জেলায় প্রায় ৩৬০০০ হেক্টর বর্ষা প্লাবিত প্লাবন ভূমি/বিল রয়েছে-যাতে বছরে ৫-৬ মাস মাছচাষ যোগ্য পানি থাকে। এসকল জলাশয়ের মধ্যে হতে উপজেলা জলাশয় ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত ৭৬টি প্লাবন ভূমিতে ৪৭৪.০০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে বাঁশের বানা/প্লাষ্টিক সুতার জাল দ্বারা ঘিরে পেন তৈরি করে ৬-৭ ইঞ্চি সাইজের গ্রাসকার্প, রুই, মিরর কার্প, থাই সরপুঁটিসহ অন্যান্য মাছ অবমুক্ত করে পেনকালচার কার্যক্রম বাস্তবানের ফলে একদিকে যেমন জমিদাতা/সুফলভোগীদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়েছে। অপরদিকে অব্যবহূত পানিতে মাছ চাষ করায় মাছ উত্পাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহ মত্স্য উত্পাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ সমস্ত বিল এলাকার মহিলা ও বেকার যুবকরাও এখন মত্স্য উত্পাদন, বিপণন মত্স্য শুঁটকি তৈরি, মত্স্য খাদ্য তৈরি, বানা, খাঁচা, নেট, খালই তৈরি করে স্বাবলম্বি হয়েছে।
এখানকার বিলের মধ্যে ৫৬.৭১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৫১.০ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ৭৯টি বিল নার্সারি স্থাপন করে ও এসকল নার্সারীতে রুই, কাতল, মৃগেল, থাই সরপুঁটিসহ মাছের পোনা ৪-র্৫র্ বড় করে বিলের মধ্যে উন্মুক্ত করে দেয়ায় মাছের উত্পাদন আশানুরূপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিল নার্সারী বাস্তবায়নের পাশাপাশি গত চার বছরে গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন জলাশয়ে ৪৭.০৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৪-র্৫র্ সাইজের ২৪.০ টন কার্প জাতীয় মাছের পোনা ও ২৪.০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৩.৫০ টন দেশিয় মাছ যেমন চিতল, শিং, কৈ, মাগুর, মেনি, পাবদা মাছের পোনা অবমুক্ত করায় মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিসহ জেলেদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।
লেখক :পরিচালক, মত্স্য উন্নয়ন প্রকল্পর
