মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩৭
একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। যে মানুষটির জন্ম না হলে বাঙালির এই মুক্তি কখনো সম্ভব হত না —তিনি এই গোপালগঞ্জেরই সন্তান। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা আর সূর্যকে বাদ দিয়ে দিনের কথা বলা —একই রকম। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশের মত মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গোপালগঞ্জের আপামর মানুষ। সেই ইতিহাসও কম গৌরবের নয়। এখানে তারই খানিকটা তুলে ধরা হল— রাজাপুরের যুদ্ধ \ ১০ জুন হারিনাহাটির যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এর আগে হেমায়েত বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার কমলেশ বেদজ্ঞ কৌশলে মধুরনাগরা থেকে ২৩ জন রাজাকারকে ধরে নিয়ে আসেন রাজাপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। সেখানে হত্যা করা হয় তাদের। কবর দেয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতা হেমন্তকুমার অধিকারীর বাড়ির পার্শ্বে একটি পুকুর পাড়ে। পরপর এ দু’টি ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পাকবাহিনী ১৭ জুন হেমায়েত বাহিনীর রাজাপুর ক্যাম্পে হামলা চালায়। তারা ২০ টি লঞ্চ নিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে রাজাপুর ক্যাম্পে আক্রমণ করে। হেমায়েতও তার বাহিনী নিয়ে পেছন দিক থেকে লঞ্চগুলোতে পাল্টা আক্রমণ করেন। পাকবাহিনীও ব্যাপক মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করে রাজাপুর ক্যাম্পে। হেমায়েত আগে থেকেই শক্ত বাংকার খুঁড়ে রাজাপুর ক্যাম্পের চারদিকে খুব শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলেছিলেন। ফলে মর্টারের গোলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কোন ক্ষতি করতে পারেনি। সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পাকবাহিনী সাতলা গ্রাম সংলগ্ন বাঁক ধরে পিছু হতে বাধ্য হয়, এ যুদ্ধে বিরাট সাফল্যের কারণে স্থানীয় জনতার পক্ষ থেকে হেমায়েতকে ‘মেজর’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। টুঙ্গীপাড়ায় পাকবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ একাত্তরের পয়লা মে বুধবার প্রায় ১৫০ জন পাকসেনা যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে লঞ্চযোগে এসে টুঙ্গীপাড়া গ্রামে আক্রমণ চালায়। পাঁচকাহনিয়া গ্রামের মওলানা আক্কেল আলী ও পারকুশলী গ্রামের রাজাকার রেজাউল ক্বারী তাদের সহায়তা করে। এখানে পাকসেনারা পাঁচ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এরা হলেন—মিটু শেখ, ধলা মিয়া শেখ, আরশাদ শেখ, তোরাব আলী কাজী, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের লোক ইকু। তার বাড়ি সাতক্ষীরায়। এছাড়া অন্য সবার বাড়ি টুঙ্গীপাড়া গ্রামেই। এ হত্যাকাণ্ডের পর পাকসেনারা বঙ্গবন্ধুর ঘরে প্রবেশ করে। বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতা তখন এ বাড়িতেই ছিলেন। পাকসেনারা ঘর থেকে বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতাকে বের করে নিয়ে আসে। তাদের একজন বঙ্গবন্ধুর পিতাকে মুক্তিফৌজের সন্ধান দিতে বলে অন্যথায় ১০ মিনিট পর গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়। পাকসেনাটি তখন তাকে বলে “তু এয়াজিদ হ্যায় আওর তেরা লাড়কা জোহগালখোর হ্যায়, তামাম দুনিয়া মে আগ লাগা দেতা হায়।” তিনি তখন তাদের কথার কোন উত্তর দেননি। পাকসেনাটি তারপর বলে, ‘তু ছিধে হোকর খাড়া হো’। তখন তিনি বুক ফুলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। পাকসেনাদের একজন দলপতি বেতার যন্ত্রের সাহায্যে কথা বলছিল। তখন তিনি সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর পিতাকে গুলি করতে মানা করেন। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর পিতা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। পাকসোনরা তখন বঙ্গবন্ধুর ছবিতে লাথি মারতে থাকে। ইতোমধ্যে পাকসেনারা বঙ্গবন্ধুর টিনের ঘরে প্রবেশ করে লোহার সিন্দুক ও স্টিলের আলমারি ভেঙ্গে সোনা, রূপা, নগদ টাকা লুট করে এবং গান পাউডার ছিটিয়ে তাতে গুলি করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সাথে তারা শেখ মুসার ঘরও লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘর থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র বের করে তারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের লোক সর্দারকে দিয়ে সবকিছু লঞ্চে নিয়ে যায়। মালামাল লঞ্চে উঠানোর পর পাকসেনারা সর্দারকে গুলি করে হত্যা করে। টুঙ্গীপাড়া থেকে গোপালগঞ্জ যাওয়ার পথে পাক-হানাদার বাহিনী লেবুতলা ও ডুমুরিয়া গ্রামে হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে লুটপাট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পথে তারা উত্তর পাকুরতিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদকে ধানক্ষেতের মধ্যে হত্যা করে। এভাবেই হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও অপ্রস্তুত লোকদের হত্যা করে। পদ্মকান্দার যুদ্ধ \ দিগনগর ব্রিজের ক্যাম্প থেকে পার্শ্ববর্তী গ্রামে পাকসেনা ও রাজাকাররা লুটপাট ও চাঁদাবাজি করত। মাঝে মাঝে বর্নি গ্রামেও আসত। একদিন বিষয়টা বর্নি গ্রামের মৌলভী হাবিবুর রহমান বাটিকামারী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে এসে জানান। ক্যাম্পের কমান্ডার ইদ্রিস হোসেন মোল্লা, অদুদ ভুঁইয়া, আলীম মিয়া পাকসেনাদের প্রতিরোধ করতে মিরেরডাঙ্গি যান। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহিরের নেতৃত্বে হিরু মোল্লাসহ একটি গ্রুপ কহলদিয়ার ভিতর দিয়ে বর্নির উত্তর প্রান্তে অবস্থান নেয়। মিরেরডাঙ্গি থেকে মুক্তিযোদ্ধারা দিগনগর ব্রিজ সেনাক্যাম্প লক্ষ্য করে দিনে দুপুরে গুলি ছুঁড়তে থাকলে পাকসেনারা পাকা রাস্তা দিয়ে বরইতলা হয়ে মুকসুদপুর বরইতলা সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে এগোতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের আসতে দেখে দুই নম্বর ব্রীজের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থান নেয়। তখন খুবই কাছাকাছি অবস্থান থেকে তুমুল গুলিবর্ষণ ও ভয়াবহ যুদ্ধ চলে। মুক্তিযোদ্ধারা খুব চাপের মুখে পড়ে যায়। এমন সময় বর্নির উত্তর পার্শ্বে জহিরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা গুলিবর্ষণ করতে থাকলে পাকসেনারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া গুরুতর আহত হন। বিদেশি ব্যক্তির অবদান \ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একজন অনন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বানিয়ারচরের ক্যাথলিক মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইতালীয় বংশোদ্ভূত খ্রিস্টান যাজক ফাদার মারিনো রিগ্যান। ফাদার রিগ্যানের অধীনে একটি মিশনারী হাসপাতাল ছিল। এখানে তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের অত্যন্ত গোপনে চিকিত্সা দিতেন। কোটালীপাড়া হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিন বীর বিক্রম পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে এই মিশন হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। মুক্তিযোদ্ধা কোহিনুর বামনডাঙ্গা যুদ্ধে আহত হয়ে এখানে চিকিত্সা নেন। মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া পদ্মকান্দা যুদ্ধে আহত হয়ে এই হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। ডা. ফাদার অ্যান্তন এবং ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ চিকিত্সার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ফাদার রিগ্যানের অধীন কয়েকটি লঞ্চ ছিল। মানুষের সাহায্যের জন্য সেগুলো তিনি ব্যবহার করতে মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছিলেন। বনবাড়ির বিয়োগান্তক ঘটনা \ ১৯৭১ সালের ১৭ মে বহুগ্রাম ইউনিয়নের মঠবাড়ি ও বনবাড়ি গ্রাম এবং বাঁশবাড়ি ইউনিয়নের খোরট গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে পাকসেনারা। পলায়নপর জনতা আত্মরক্ষার জন্য বনবাড়ি গ্রামের বিল, জঙ্গল ও পুকুরে আশ্রয় নিলে পাক হানাদার বাহিনী সেখানে গিয়েও নিরীহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর গুলি চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই হত্যাযজ্ঞে তেইশ জন শহীদ হন। এদের মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন- সাতপাড় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোবিন্দ বিশ্বাস, সন্তোষ কুমার ঢালী, গোকুল মজুমদার, খগেন্দ্রনাথ সরকার, মতিলাল বিশ্বাস, আদিত্য মন্ডল, পঞ্চানন সরকার। ফুকরার যুদ্ধ \ ১৭ অক্টোবর এলাকায় প্রবেশ করল হানাদারের দল। তারা গানবোটে করে মধুমতি নদীর মধ্য দিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে। পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি ছিল গোপালগঞ্জ শহরে। পাক সেনারা প্রথমে দক্ষিণ ফুকরায় গানবোট থামিয়ে নেমে ফুকরার দক্ষিণাংশে অবস্থিত সুচাইলে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে সুচাইলে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। শুরু হল যুদ্ধ। অবিরাম গুলি চালাতে লাগল তারা। শত্রুদের আক্রমণও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল। পাল্টা আক্রমণ করলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবে চলল অনেকক্ষণ, প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্যে হঠাত্ করে একজন মুক্তিযোদ্ধার বুকে এসে লাগল পাকসেনাদের একটি বুলেট। কিন্তু কিছুই করার রইল না অন্য সবার। তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন। বন্দুক ফেলে আহত গুলিবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে আনতে গেলে পরাজয় অবধারিত জেনে কমান্ডার আহতকে তুলে আনার নির্দেশ দেননি। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রবি সিকদার। ২৭ অক্টোবর আবার শুরু হলো যুদ্ধ। হাবিব যেন আজ উন্মাদ। যে বোন তাকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসতো, সে আজ আর বেঁচে নেই। আজ তাই নেই কোন পিছুটান, নেই কোন বন্ধন। শত্রুরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। হাবিবের পাশেই গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন মালেক। হাবিব শঙ্কিত হলেন না। শত্রুদের আবিরাম গুলি চালানোর মুখে আত্মরক্ষার জন্য কমান্ডার সবাইকে পিছু হটতে বললেন। কমান্ডারের নির্দেশমত সবাই তাই করলেন। কিন্তু হাবিব নড়লেন না। গুলি বন্ধ করলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিল, গুলি বন্ধ করলে পাকসেনারা তার সঙ্গীদেরকে আরও বেশি আক্রমণ করার সুযোগ পাবে। তিনি বাধা দিয়ে যাচ্ছিলেন বলে শত্রুরা এগোতে পারল না। হাবিবের অসীম সাহস আর আত্মত্যাগের ফলেই পুরো মুক্তিযোদ্ধা দলটা সেদিনের মত জীবন রক্ষা করতে পারল। কিন্তু জীবন দিতে হল হাবিবকে। যতক্ষণ দেহে প্রাণ ছিল রক্তের শেষ বিন্দুটি জাগ্রত থাকা পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ করেছিলেন। তারপর একসময় ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। নারী মুক্তিযোদ্ধারা \ আশালতা বৈদ্য, তাহমিনা খানম, কুসুম রানী বাগচী, হেমন্ত হালদার, গীতারানী ওঝা, সুলেখা রায়, লীলাবতী ভক্ত, সুষমা বাড়ৈ, স্মৃতিকনা বাড়ৈ, স্বর্ণলতা, মোমেলা খাতুন, পুষ্পরানী হালদার, অঞ্জলি চৌধুরী, মনারানী চৌধুরী, মঞ্জুরানী হালদার, ফাগনবালা বণিক, মীরা রানী বণিক, কুয়াতুন্নেছা জলি, রেশমা আক্তার হাসি, মনোয়ারা বেগম মনি, শামসুন্নাহার চুনি, অমিতা সরকার রীতা, শামীমা পারভীন খুশী আরো অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিলেন। যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, সে হিসাবে গোপালগঞ্জ জেলায় মুক্তিযুদ্ধে ৫৩৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন এবং পাক সেনা ও রাজাকার নিহত হয়েছে ১৯৭ জন। লেখক : গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি