ডেস্কটপ পিসিতে অন্যান্যদের চাইতে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে ইন্টেল। বিশ্বের বৃহত্তম এই প্রসেসর নির্মাতা প্রযুক্তি বিশ্বের আধুনিক সব ডিভাইসকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এতদিন পর্যন্ত মোবাইল ডিভাইসে খুব বেশি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি না করতে পারলেও এবারে সেই দিকেও মনোনিবেশ করেছে ইন্টেল। ফলে পিসির পাশাপাশি মোবাইল ডিভাইসেও তাদের রাজত্ব নিয়ে এখনই অনেকেই নিঃসন্দেহ হয়ে পড়ছেন। প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য তাই ইন্টেল সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাদের উদ্ভাবন, তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিয়েও তাই প্রযুক্তি বিশ্বের আগ্রহের অন্ত নেই।
ইন্টেলের বার্ষিক আয়োজন ইন্টেল ডেভেলপার ফোরামের মাধ্যমেই ইন্টেল সেই আগ্রহ পূরণ করে থাকে বিশ্ববাসীর। এই বার্ষিক আয়োজনে ইন্টেল তাদের প্রসেসরগুলোর সর্বশেষ সংস্করণ, ভবিষ্যত প্রসেসরগুলোর রোডম্যাপসহ নতুন সব প্রযুক্তি প্রদর্শন করে থাকে সকলের সামনে। পাশাপাশি ইন্টেল প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন ডিভাইস এবং গ্যাজেট নিয়ে উপস্থিত থাকে অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সানফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এই আয়োজন। পাশাপাশি চীনে এবং কখনও কখনও অন্যান্য দেশেও এই ফোরাম আয়োজন করে থাকে তারা। এবারে এপ্রিলে চীনের বেইজিংয়ে একটি ফোরাম আয়োজন করেছে তারা। তবে মূল আয়োজনটি সম্পন্ন হয় গত ১০ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরে।
ইন্টেলের এই আয়োজন থেকে সামনের দিনগুলোর প্রযুক্তি বাজারটা সম্পর্কে আঁচ করা যায় বলেই মনে করে থাকেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। এবারের আয়োজন থেকে তাই সামনের দিনগুলোর প্রযুক্তি বাজারের রূপ কেমন দাঁড়াতে পারে, সেই বিশ্লেষণ নিয়েই এই লেখা।
অবশেষে মোবাইলে ইন্টেল
ডেস্কটপে একক রাজত্ব বজায় রাখতে পারলেও মোবাইল ডিভাইস নিয়ে ইন্টেলের প্রচেষ্টা এতদিনেও কোনো কাজে আসেনি খুব একটা। গত কয়েক বছর ধরেই অ্যাটম প্রসেসর নিয়ে মোবাইল ডিভাইসের বাজার দখল করতে চেষ্টা করছে ইন্টেল। তবে এআরএম, কোয়ালকম বা এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের মোবাইল প্রসেসরের কাছে পাত্তা পায়নি তারা। কিন্ত স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির এই রমরমা বাজারে ইন্টেল পিছিয়ে থাকতে রাজি নয় মোটেও। তাই এবারে ‘বে ট্রেইল’ নামের নতুন মোবাইল প্রসেসর সিরিজ নিয়ে হাজির হয়েছে ইন্টেল। বিশেষত এটি ব্যবহার করে ৬৪-বিটের ডিভাইস তৈরি করা যাবে বলে এতে আকৃষ্ট হচ্ছেন সকলেই। কম শক্তি খরচে বেশি পারফরম্যান্স প্রদানে সক্ষম বে ট্রেইল দিয়ে ইতোমধ্যেই বেশকিছু ডিভাইস তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আসুসের ট্রান্সফর্মার বুক টি১০০ সকলেরই নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে তাই স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট পিসিতে ইন্টেলের বে ট্রেইল প্রসেসরের আধিক্য দেখতে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন প্রযুক্তি গবেষকরা।
মাইক্রোসফটের বন্ধন থেকে মুক্তি!
মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এবং ইন্টেল প্ল্যাটফর্মের সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের। প্রযুক্তি বাজারের সিংহভাগই দখল করে রেখেছে এই দুই প্ল্যাটফর্মের সমন্বিত রূপ। তবে এতদিনে এসে বোধহয় অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের দিকে মনোযোগ ফেরাচ্ছে ইন্টেল। এবারের ডেভেলপার ফোরামের বেশকিছু কিনোটে (keynote) অ্যান্ড্রয়েড এবং ক্রোম প্ল্যাটফর্ম নিয়ে ইন্টেল কর্মকর্তাদের বেশ আগ্রহের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। বাজার বিবেচনায় এখনই উইন্ডোজ প্ল্যাটফর্মের সাথে খুব বেশি দূরত্ব তৈরি হওয়া সম্ভব না হলেও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ট হতে বোধহয় খুব বেশি সময় লাগবে না।
আরও ছোট কম্পিউটার
সময়ের সাথে সাথে কম্পিউটারের আকার যে হারে ছোট হচ্ছে, তা মানুষের কল্পনাকেও হার মানিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা থামার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে। ইন্টেলের সিইও ব্রায়ান ক্র্যানিশ ‘কোয়ার্ক এসওসি’ প্রসেসরের ঘোষণা দেওয়ায় এই আলোচনা বরং গতি পেয়েছে। প্রচলিত কোর সিরিজের প্রসেসরের তুলনায় এমনিতেই অ্যাটম মোবাইল প্রসেসরগুলো অনেক ছোট। আর কোয়ার্ক প্রসেসরগুলো অ্যাটমের চাইতেও আকারে পাঁচ ভাগের একভাগ। এর সাথে আবার রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের সলিড স্টেট স্টোরেজ, যেগুলো প্রচলিত হার্ডডিস্কের তুলনায় আকারে অনেক ছোট। বুঝাই যাচ্ছে, প্রযুক্তি বিশ্বে ছোট ছোট কম্পিউটিং ডিভাইস তৈরির প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না।
ডেস্কটপের দিন শেষ নয়
স্মার্টফোন, ট্যাবলেট পিসি আর ল্যাপটপের কারণে অনেকেই ধারণা করছেন, ডেস্কটপ পিসির দিন বোধহয় ফুরোলো। তবে ইন্টেলের এই ফোরামের পর সেই ধারণা থেকে হয়ত সরে আসবেন অনেকেই। এই আয়োজনে প্রদর্শিত হয়েছে অনেকগুলো অল-ইন-ওয়ান পিসি। এই পিসিগুলো নিয়ে আলাদা সেশনও ছিল আইডিএফ-এ। উচ্চমানের গ্রাফিক্স, প্রফেশনাল কাজের ক্ষমতা প্রভৃতি ফিচার নিয়ে ডেস্কটপ পিসির বাজারকে আরও কিছুটা চাঙ্গাই করে তুলতে পারে ইন্টেলের প্রচেষ্টা।
তথ্যের গোপনীয়তা
মোবাইল ডিভাইসগুলোর নানা ধরনের অ্যাপ্লিকেশনের কারণে ইতোমধ্যেই নানা ধরনের তথ্য হস্তগত হয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। আইডিএফ-এর একটি সেশনে একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভয়েস অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে তথ্যের গোপনীয়তায় শেষ পেরেক হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেননা, এরকম সব অ্যাপ্লিকেশনের কারণেই মানুষের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করেন তিনি।
স্মার্ট বিশ্ব
স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহারে চলতি বিশ্বকে এখন স্মার্ট বিশ্ব বলে থাকেন অনেকেই। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বিশ্ব আরও বেশি স্মার্ট হবে বলেই ধারণা করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। ইন্টেলের গবেষকরাও সেই ধারাতেই নিজেদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আধুনিক রোবট, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট শহর ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মের জন্য এই গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। আগামী ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই হয়ত এরকম অনেক প্রযুক্তিই এসে দাঁড়াবে আমাদের সামনে।
