আজকের এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মজা করে অনেকেই বলে থাকেন, গুগল যা কিছু খুঁজে পায় না, তার অস্তিত্বই আসলে নেই। মজা করে কথাটা বলা হলেও একে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই বললেই চলে। ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে একদিকে যেমন বিশ্বব্যাপী সব ধরনের কাজ এবং তথ্যের জন্য ইন্টারনেটের উপর নির্ভর করে থাকে, তেমনি আবার তথ্য খুঁজে পেতে এখন ইন্টারনেটেও সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগল’র বিকল্প অনেকেই ভাবতে পারেন না। গত দেড় দশকে ইন্টারনেটে তথ্য খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াকে এক কথায় আত্মস্থ করে নিয়েছে গুগল। তাই সময়ের সাথে সাথে আর ‘গুগল’ কেবলই একটি সার্চ ইঞ্জিনের নাম নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি ক্রিয়াতে (Verb), যখন ‘Google’ শব্দের অর্থ ‘অনলাইনে কোনোকিছু খুঁজে বের করা’। হঠাত্ করে সকলের অতি পরিচিত গুগলকে নিয়ে এত কথার প্রয়োজন পড়ল কেন, এমন প্রশ্ন আসতে পারে অনেকের মাথাতেই। এই প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, চলতি মাসের শুরুতে অতি পরিচিত এবং জনপ্রিয় এই গুগল পূর্ণ করেছে তাদের পথচলার দেড় দশক। তাদের ১৫ বছরের পূর্তি উপলক্ষেই তাদের নিয়ে কিছু কথা বলার প্রয়াসে এই লেখা।
শুরুর কথা
১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৪ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে গুগল সার্চ। ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিনের হাত ধরে অনলাইনে পদচারণা শুরু এর। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে গুগল যাত্রা শুরু করে আরও আগে। ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন। সেটা ১৯৯৬ সালের কথা। সেই সময়কার একটি গবেষণারই ফসল বলা যায় গুগলকে। ওই সময়ে যেসব সার্চ ইঞ্জিন ছিল, সেগুলো সার্চের ফলাফলকে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে র্যাংকিং করে প্রদর্শন করত। সার্চে যে ওয়েবসাইট যত বেশি আসত, সেগুলোর র্যাংক ছিল তত বেশি। সেখান থেকে ল্যারি এবং ব্রিন ওয়েবসার্চের ফলাফলকে ওয়েবসাইটের কনটেন্টের উপর নির্ভরশীল করে তোলার প্রস্তাব করেন। ‘পেজর্যাংক’ নামে এই প্রযুক্তিকে অভিহিত করেন তারা। ওই সময়ে রবিন লি নামের আরেক গবেষক একই ধরনের সার্চ ইঞ্জিনের কাজ শুরু করেন ‘র্যাংকডেক্স’ নামে। এটিই পরে ‘বাইদু’ নামে যাত্রা শুরু করে চীনে।
যেভাবে গুগল
মূলত ‘ব্যাকরাব’ নাম দিয়ে নিজেদের সার্চ ইঞ্জিনের যাত্রা শুরু করেন ল্যারি এবং ব্রিন। পরে একটা সময়ে গিয়ে তারা গ্রহণ করেন ‘গুগল’ নামটি। এই শব্দটি নেওয়া হয় ‘googol’ শব্দ থেকে। এটি মূলত একটি সংখ্যাকে নির্দেশ করে যাতে ১-এর পরে রয়েছে ১০০টি শূণ্য। নিজেদের সার্চ ইঞ্জিনও এমন বিপুল পরিমাণ তথ্য উপহার দিতে সক্ষম হবে—এমন ধারণা নিয়েই ‘গুগল’ নামটি বেছে নেন তারা। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেমম্বর গুগল’র নামে ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন করা হয়। পরে ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে গুগল যাত্রা শুরু করে। ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে ল্যারি এবং ব্রিনের আরেক বন্ধু সুসান ওজকিকি’র একটি গ্যারেজেই স্থাপন করা হয় গুগল’র প্রথম অফিস। আর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক পিএইচডি শিক্ষার্থী ক্রেইগ সিলভারস্টেইনকে গুগল’র প্রথম কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট শেয়ারবাজারে পাবলিক কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে গুগল। ল্যারি এবং ব্রিনের সাথে এরিক স্মিথ যুক্ত হয়ে একে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরিত করেন। এ সময় ৮৫ ডলার মূল্যের ১ কোটি ৯৬ লক্ষ ৫ হাজার ৫২টি শেয়ার বাজারে ছাড়ে গুগল। এতে করে তারা ২৩ বিলিয়ন ডলারের সমমানের পুঁজি গঠনে সক্ষম হয়।
সার্চ জায়ান্ট থেকে টেক জায়ান্ট
সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে যাত্রা শুরুর পরে গুগলকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শুরুতে সার্চ ইঞ্জিন হিসেবেই বিশ্ববাসীর কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় গুগল। ১৯৯৮ সালে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালের জুলাই মাসেই ১০০ কোটি ওয়েবপেজের ইনডেক্স তৈরিতে সমর্থ হয়। ২০১১ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো এক মাসে ১০০ কোটি অনন্য ব্যবহারকারী গুগল ব্যবহার করেন। ২০১২ সালে গুগল’র রাজস্ব আয় ছাড়িয়ে যায় ৫ হাজার কোটি ডলার। ৪৪ হাজারেরও বেশি কর্মী এখন কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠানে।
তবে সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে নিজেদের এই সফলতাকে সার্চ ইঞ্জিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি গুগল। একে একে ওয়েব প্ল্যাটফর্ম তো বটেই, হার্ডওয়্যার বাজারেও প্রবেশ করেছে এই জায়ান্ট। তাদের মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম অ্যান্ড্রয়েড তো সারা বিশ্বকেই মাতিয়ে রেখেছে। ২০১১ সালে মটোরোলা মোবিলিটি কিনে নেওয়ার পর নেক্সাস ব্র্যান্ড দিয়ে হার্ডওয়্যারেও প্রবেশ করেছে তারা। মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের বাইরে ক্লাউডনির্ভর ক্রোম অপারেটিং সিস্টেম দিয়ে ল্যাপটপের বাজারেও শক্ত অবস্থান নেওয়ার পথে গুগল। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশন তো রয়েছেই। সবমিলিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি বিশ্বের নানা ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়েছে গুগল।
গুগল সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য
‘ব্যাকরাব’ (BackRub) নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করে গুগল। তখন এর হোমপেজে লেখা ছিল, ‘BackRub একটি ‘ওয়েব ক্রলার’ যাকে ডিজাইন করা হয়েছে ওয়েবে ভ্রমণ করে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।
২০১০ সাল থেকে গুগল গড়ে প্রতি সপ্তাহে একটি করে ছোট-বড় কোম্পানিকে কিনে চলেছে।
বিভিন্ন উপলক্ষে গুগল তাদের লোগোকে বদলে দিয়ে ডুডল ব্যবহার করে থাকে। তাদের প্রথম ডুডলটি ছিল ‘বার্নিং ম্যান’র প্রতীক দিয়ে করা। ১৯৯৮ সালেই ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন যোগ দেন বার্নিং ম্যান ফেস্টিভ্যালে। ওই সময়েই গুগল লোগোর মাঝে বার্নিং ম্যানের প্রতীক ব্যবহার করে প্রথম ডুডলটি তৈরি করেন।
১৯৯৯ সালের নভেম্বরে গুগল’র কর্মীর সংখ্যা যখন ছিল ৪০ জন, তখন গুগলে প্রথম শেফ নিয়োগ দেওয়া হয়।
৫০টিরও বেশি ভাষায় ব্যবহার করা যায় গুগল’র ইমেইল সেবা জিমেইল। ওয়েলশ, বাস্ক, তাগালগ, মালয়লাম, তেলেগু, চিরোকির মতো ভাষাতেও রয়েছে জিমেইল সংস্করণ।
২০০৪ সালে গুগল পাবলিক কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে এর সহস্রাধিক কর্মী নিমেষেই কোটিপতি বনে যান!
কেবল দক্ষ কর্মীই নয়, ছাগলও নিয়োগ দিয়ে থাকে গুগল! ২০০৯ সালে তারা ২০০টি ছাগল ভাড়া করে। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ হেডকোয়ার্টারের বড় অংশের জমিতে প্রতিবছরই ঘাস কাটানোর কাজ করানো হয়। ওই বছরে এই কাজের জন্য কোনো ধরনের যন্ত্র ব্যবহার না করে এই কাজে ওই ২০০ ছাগল নিয়োগ দিয়েছিল গুগল!
গুগল’র প্রথম অফিশিয়াল টুইট ছিল বাইনারিতে লেখা ‘I'm feeling lucky’।
মজিলার ফায়ারফক্স ওয়েব ব্রাউজারে ডিফল্ট সার্চ ইঞ্জিন হওয়ার জন্য গুগল মজিলা ফাউন্ডেশনকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করে।
গুগল’র দুই প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন সম্মিলিতভাবে গুগল’র মাত্র ১৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক। অবশ্য এই ১৬ শতাংশেরই মূল্যমান প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার!
গুগলে যোগ দেওয়া নতুন কর্মীকে বলা হয় ‘Noogler’ এবং গুগল’র সাবেক কর্মীদের বলা হয় ‘Xoogler’।
