অনুবাদ সাহিত্য নিঃসন্দেহে একটি শিল্পকর্ম। অনুবাদের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের গতিধারা ও রূপবৈচিত্র্যের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই। এক কথায় অনুবাদের মাধ্যমে বিদেশি সাহিত্যের একটি সামগ্রিক রূপ প্রতিফলিত হয় নিজস্ব সাহিত্যে।
আমার আলোচনা উর্দু, ফার্সি ও আরবির অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
অনুবাদের কাজে গল্প-উপন্যাসের চেয়ে কবিতার অনুবাদ কঠিন বটে। গ্যাটের ভাষায়, অনুবাদে যদি মূল কাব্যের স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হয় তবে তা যা-ই হোক না কেন অনুবাদের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হতে বাধ্য। অবশ্য অনুবাদককে কবিতার মূল বিষয় ও তার তাত্পর্যের দিকে লক্ষ রেখে অনুবাদ করতে হবে, যেন মৌলিক সুর ব্যঞ্জনা ব্যাহত না হয়। শিল্পী যেমন সৃষ্টির তাগিদে শিল্প সৃষ্টি করেন, অনুবাদকও তেমনি শিল্প হিসেবে ভাষা গঠনের তাগিদে অনুবাদ করেন।
আরবি ও ফার্সি ভাষার ক্লাসিক সাহিত্যের অনুবাদ সীমিত। প্রয়াত কবি আবদুস সাত্তার আরবি সাহিত্যকে বাঙালি পাঠকসমাজে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য বেশ পরিশ্রম করেছেন।
তাঁর অনূদিত ও সম্পাদিত ‘আরবী কবিতা’ সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম আরবি কাব্যের অনুবাদ সংকলন। তিনি আরও অনুবাদ করেছেন আধুনিক আরবি নাটক, আধুনিক আরবি গল্প এবং বালি ও ফেনা (খলিল জিবরান)। মরহুম মওলানা নুরুদ্দীন আরবি কাব্য আস-সাবাউল মুআল্লাকাত-এর বঙ্গানুবাদ করেন ‘ঝুলন্ত গীতিকা সপ্তক’ নামে। এর ভূমিকায় ছিলেন তত্কালীন বিশিষ্ট পণ্ডিত ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, প্রকাশক অধুনালুপ্ত বাংলা উন্নয়ন বোর্ড। বিখ্যাত আরবি কবিদের কবিতা নিয়ে এই কাব্যসংকলন রচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ইমাম বুসিরির ‘কাসিদাতুল বোরদা’ বাংলায় অনুবাদ করেন যা বিশেষত্বের দাবিদার। ইবনে খলদুনের ‘আল-মুকদ্দিমা’ বাংলা অনুবাদ করেন প্রয়াত বিশিষ্ট শিক্ষক ও লেখক আবু রুশদ মতিন উদ্দীন, প্রকাশক বাংলা একাডেমী। সম্ভবত ওইসব অনুবাদগ্রন্থ ষাটের দশকে প্রকাশিত হয়েছিল।
তাছাড়া আলী আহামদ নাগীব মাহফুজের গল্প অনুবাদ করেন তা ‘সারমেয় সমাচার’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। সম্ভবত সেটাই বাংলাদেশে নোবেল বিজয়ী মিশরীয় লেখক নাগীব মাহফুজের প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবির অধ্যাপক আহসান সাইয়েদ অনুবাদ করেন নাজীব মাহফুজের ছোটগল্প (২০০১) প্রকাশক অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। আরবি উচ্চারণে নাগীব এবং নাজীব দুভাবে উচ্চারিত হয়।
‘নির্বাচিত মাহমুদ দরবিশ’ অনুবাদক অধ্যাপক হায়াত্ মামুদ, প্রকাশকাল ২০১০। অনুবাদের মাধ্যমে এই বিখ্যাত আরব কবি বাংলাদেশে সুপরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জুবাইর মো. এহসানুল হক অনূদিত নাগীব মাহফুজের গল্প সংকলন ‘যাত্রী ছাউনীর নীচে’ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘কোরান’ বিশ্বের সবচেয়ে পঠিত ও অনূদিত গ্রন্থ। পবিত্র কোরান বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেন গিরিশচন্দ্র। ষাটের দশকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ৪ খণ্ডে পবিত্র কোরানের অনুবাদ প্রকাশিত হয়। বর্তমানে এক খণ্ডে পবিত্র কোরান ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বড় ও ছোট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া বেসরকারি বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে পবিত্র কোরানের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সে-সময় তফসিরে সুরা ফাতিহা (২ খণ্ডে) লিখেছেন প্রখ্যাত পণ্ডিত আবুল হাশিম। উল্লেখ্য, ধর্মীয় গ্রন্থ, ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত বইয়ের বিপুলসংখ্যক পাঠক এদেশে রয়েছে।
অন্যান্য অনূদিত ধর্মীয় গ্রন্থের মধ্যে তালিম হোসেন অনূদিত কোরানের ব্যাখ্যাপদ্ধতি, আখতার ফারুক অনূদিত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভীর ‘কোরান ব্যাখ্যার মূলনীতি’, মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘উম্মুল কোরান’, মহীউদ্দীন খান অনূদিত মুফতী শফীর ‘তফসিরে মারেফুল কোরান’ (৬ খণ্ড), কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে আমপারা, সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ উল্লেখযোগ্য।
ফার্সি কবি সাদী, রুমী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, আমির খসরু ও ইকবালের কবিতা বাংলায় অনূদিত ও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে ঢাকায়। এর মধ্যে ইকবালের কাব্য অনুবাদ হয়েছে সর্বাধিক। রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম নজরুল ও কান্তিঘোষের পর বাংলা অনুবাদ করেন সিকান্দার আবু জাফর। ফার্সি ভাষা থেকে বাংলায় অনূদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—‘সৌভাগ্যের স্পর্শমণি’। ইমাম গাজ্জালীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিমিয়ায়ে সাদ’ত’-এর অনুবাদ করেন মীর্জা ইউসুফ আলী। এরই বাংলা নাম দেওয়া হয়েছে সৌভাগ্যের স্পর্শমণি। (দুই খণ্ডে সমাপ্ত)। পারস্যের সুফি সাধক কবি জালাল উদ্দীন রুমীর ‘মসনবীয়ে রুমী’-র বাংলা অনুবাদ করেছেন কাজী আজহার আলী এবং মনিরুদ্দীন ইউসুফ। মনিরুদ্দিন ইউসুফের অনূদিত গ্রন্থ ‘রুমীর মসনবী’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে, প্রকাশক স্টুডেন্টওয়েজ। মসনবীয়ে রুমীকে ফার্সি ভাষার কোরান বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।
