মাহশীদ আমিরশাহী’র গল্প

ভয়

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:২৯
খুব ছোটবেলা থেকেই আমি ভয়ের সঙ্গে পরিচিত হই। আমার বয়স যেদিন সাড়ে পাঁচ বছর এবং আব্বাজানের সঙ্গে জীবনের প্রথম দিন স্কুলে গিয়েছিলাম, সেদিনই আমি প্রথম ভয়কে উপলব্ধি করতে পেরেছি। সেদিন আব্বাজান, প্রধান শিক্ষিকা এবং আমি ছাড়া খেলার মাঠে আর কেউ ছিল না। প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে আব্বাজান আলাপ করছিলেন। ‘ওখানে কী আছে?’ অনুসন্ধিত্সু দৃষ্টিতে আমি আব্বাজানকে জিজ্ঞেস করি। ‘চুপ করো,’ বলেই আব্বাজান পুনরায় প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। ‘ওখানে কী আছে, আব্বাজান?’ আবদারের সুরে আমি আবারও জিজ্ঞেস করি। ‘আহ্, চুপ করো! কেউ একজন ওখানে শুয়ে আছে। আমাকে বেশি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করো না,’ চোখেমুখে বিরক্তির একবাটি রং মেখে আব্বাজান বললেন। ‘কাল রাত থেকে?’ আমি গলার স্বর বেশ খানিকটা নিচে নামিয়ে এমনভাবে বললাম যেন কিছুতেই তার ঘুম ভেঙে না যায়। একটু থেমে আমি পুনরায় ফিসফিস করে বললাম, ‘কী আশ্চর্য! নিশ্চয় সে ঘুমে বিভোর। হয়তো কাল রাত থেকে সে অঘোরে ঘুমোচ্ছে।’ প্রধান শিক্ষিকা এবং আব্বাজান খোশ আলাপে বুঁদ হয়ে আছে। ‘আব্বাজান...’ উত্কণ্ঠিত কণ্ঠে আমি ডাকলাম। ‘বলছি না, চুপ করো,’ আব্বাজান রীতিমতো শাসনের ভঙ্গিতে আমাকে থামাতে চাইলেন। ‘তাকে কি জাগাব?’ অনুমতি চেয়ে আমি জানতে চাইলাম। আব্বাজান কিংবা প্রধান শিক্ষিকা আমার কথায় কোনো কর্ণপাত করলেন না, বরং তারা খোশগল্পের ভেতর মগ্ন হয়ে রইলেন। ‘আপনারা চুপ করুন, সে হয়তো জেগে যাবে,’ খানিকটা ধমকের সুরে আমি বললাম। ‘না, সে জাগবে না,’ অভয় দিয়ে আব্বাজান বললেন। এবার আমি গলার স্বর ওপরে তুলে কৌতূহলি ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কখনোই না?’ আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আব্বাজান পুনরায় প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে গভীর আলাপে মশগুল হলেন। বিরক্ত হয়ে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আব্বাজানের কোট ধরে টানতে লাগলাম। আব্বাজান ভীষণ রেগে গিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ‘আহ্, বিরক্ত করো না। বলেছি তো, কোনোদিন তার ঘুম ভাঙবে না।’ ‘সে কি মরে গেছে? তাহলে তো সে মৃত,’ বিজ্ঞের মতো আমি মন্তব্যের সুরে বললাম। আব্বাজান কিংবা প্রধান শিক্ষিকা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না, ‘তুমি কেমন করে জান, যখন কেউ চিরনিদ্রায় থাকে এবং কখনোই জেগে ওঠে না, তার মানে সে মৃত?’ এমনকি তারা জানতেও চাইলেন না, ‘কখন, কীভাবে এবং কার কাছ থেকে আমি এই শব্দটা শিখেছি।’ অবশ্য এ মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবা নিরর্থক এবং বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে একদিন সবাই কোনো না কোনোভাবে এই শব্দটা শেখে। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর, তখনই আমি শব্দটার অর্থ শিখেছি। তবে কেউ কেউ আমার চেয়ে আগেও শিখেছে, আবার অনেকের শিখতে দেরি হয়েছে। চাবি লাগানোর ছোট্ট ফুটোয় চোখ রেখে আমি ভেতরে তাকালাম। জায়গাটা কোনো পাতালঘর নয়, কিন্তু ঘরের ভেতরের অন্ধকার দেখে পাতালঘরের মতোই মনে হলো। ঘরের মাঝখানে কারোর কবর এবং মেঝের বাদবাকি জায়গা টাইলসে মোড়ানো, যা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে ঝকঝকে করে রাখা হয়েছে। কবরের ওপর মোমবাতি রাখার একটা স্ট্যান্ড রয়েছে। তাতে কোনো মোমবাতি নেই। তাহলে মৃত্যু হচ্ছে গভীর নিদ্রা যাওয়া, ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং ভ্যাপসা জায়গায় চিরদিনের জন্য নিদ্রা যাওয়া। সেখানে কোনো আলো দেখা যায় না, কোনোদিনও ঘুম থেকে জেগে উঠতে হয় না এবং সেখানে খেলাধুলা করাও যায় না। আমার ভীষণ ভয় করছিল। ভয়ার্ত গলায় আব্বাজানকে বললাম, ‘চলুন, এখান থেকে চলে যাই।’ সেবছর ওই কবরের স্মৃতি আমার সঙ্গে নয় মাস ছিল, এমনকি প্রাইমারি স্কুলজীবনের পুরো ছয় বছরই রীতিমতো আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। কবরটি শ্বেতপাথরের তৈরি এবং তাতে তালাবদ্ধ একটা দরজা ছিল। কবরের গায়ে সুন্দর কারুকাজ করা একটা ফলক এবং সেখানে আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আমীর ফিরোজ কুহীর নাম খোদাই করে লেখা। সেদিন কবরের আতঙ্ক আমাকে ধাওয়া করেছিল। অবশ্য আরেকদিন আমি ভীষণ আতঙ্কে ছিলাম, যেদিন আমরা স্কুলে নাটকের মহড়া দিয়েছিলাম। মহড়া শেষে স্কুলে আমাকে অনেক রাত অবধি থাকতে হয়েছিল। রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে আমি স্কুলের আঙিনায় খেলার ফাঁকা জায়গায় একাকী ছিলাম। আমার পাশে কবর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হিমশীতল একটা অদৃশ্য ভয় আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। পুরোটা পথ দৌড়াতে দৌড়াতে আমি বাড়ির দিকে ছুটেছিলাম। মনে হয়েছিল, ভয়টাও যেন আমার কাঁধের ওপর ভর করে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছিল। কখনো সে আমার সামনে ছুটছিল, কখনো বা পেছনে। পরবর্তী ছয় বছর আমার কাছে মনে হয়েছে কবরটা যেন খেলার জায়গার পাশে দারোয়ানের খুপড়ি ঘর। যাহোক, শেষের দিকে আমার আর তেমন কোনো ভয় করত না। বোধহয় অন্যান্য মেয়েদের চেঁচামেচি এবং হট্টগোলের মধ্যে আমার মনের ভেতর থেকে মৃত্যুর ভয়টা ক্রমশ হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তখন অন্ধকার রাতের নির্জনতা, অপরিচিত কারোর ছায়া, কিংবা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখলেও খুব বেশি ভয় পেতাম না। সে সময় কেন জানি মনে হতো, হয়তো ভয়কে জয় করে আমি বন্ধুত্বের নিবিড় বন্ধনে বাঁধতে পেরেছি। একদিন ক্লাসে বসে আমি কিছু একটা খাচ্ছিলাম। দেখতে পেয়ে শিক্ষিকা ভীষণ রেগে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই মেয়ে, তুমি কি খাচ্ছ?’ ঠিক বুঝতে না পেরে আমি চারপাশে ইতিউতি তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। শিক্ষিকা কাছে এসে আমার মাথায় চাটি মারেন এবং গলার স্বর সপ্তমে তুলে বললেন, ‘বুঝতে পারছ না, কাকে বলছি? হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি। কী খাচ্ছ?’ চট করে চিবানো বন্ধ করে আমি দুপাশে মাথা নেড়ে জানালাম, মুখে কিছু নেই। ‘তুমি কি বোবা, নাকি জিহ্বাটা বাসায় রেখে এসেছ? কথা বলছ না কেন?’ শিক্ষিকার অগ্নিমূর্তি দেখে আমি রীতিমতো ভড়কে যাই। চোখেমুখে ভয়ের চিহ্ন এঁকে তার দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকি। শিক্ষিকা আমার কাঁধ চেপে ধরে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘তুমি কি কথা বলবে, নাকি তোমাকে কথা বলতে বাধ্য করব?’ কিছুতেই আমি শিক্ষিকার রাগের কারণ বুঝতে পারিনি। পুনরায় আমার মনের ভেতর ভয় ঢুকে সমস্ত শরীর অবশ করে ফেলেছিল। আমি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম, আসলে তিনি আমাকে কী জিজ্ঞেস করেছিলেন, অথবা আমার মুখ থেকে তিনি কী শুনতে চেয়েছিলেন, কিছুই আমার স্মরণে ছিল না। ভয়ে আমি রীতিমতো থরথর করে কাঁপছিলাম। সেদিন থেকে আমি আবার শিক্ষিকাকে ভয় পেতে শুরু করলাম। চারদিক থেকেই যেন ভয় আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হবার ভয় ছিল, এমনকি স্কুলে রুমাল কিংবা পানি খাওয়ার জন্য গ্লাস নিতে ভুলে যাওয়ার আতঙ্কে ছিলাম। এছাড়াও ক্লাসে শিক্ষিকার পড়ানোর বিষয় পুনরায় ঠিকমতো না লেখার ভয় ছিল। যতই পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসত, ততই আমি যেন ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। চোখেমুখে একধরনের আতঙ্কের কালো ছায়া ছড়িয়ে থাকত। গান, শিল্পকলা, খেলাধুলা এবং শরীরচর্চার শিক্ষিকা ছাড়াও আমাদের স্কুলে আরও অনেক শিক্ষিকা ছিলেন। সবাইকে আমি যারপরনাই ভয় পেতাম। তবে আমার মনের ভেতর যদি বিন্দুমাত্র ভয় করার খালি জায়গা থাকত, তাহলে সেটুকু শুধু আমাদের প্রধান শিক্ষিকা এবং সুপারভাইজারের জন্য অবশিষ্ট ছিল। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সময়মতো বাড়ির কাজ না করার ভয়ের সঙ্গে আমি এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, যেন ভয়টা আমার মুখের চামড়ায় একধরনের দাগ কিংবা আঙুলের ক্ষত, যা সারাক্ষণ আমার সঙ্গেই থাকত। যদিও অনেক সময় আমি অনুশোচনায় ভুগেছি, কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমি এ বিষয়ে মাথা ঘামাইনি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নানা কিসিমের অজানা ভয় এসে আবার আমার মধ্যে জড়ো হতে শুরু করে। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল খুব বেশি দূরে ছিল না। প্রথমে স্কুল, তারপরে আসবাবপত্রের দোকান, দোকানের পরে ডাক্তার শেখের বাড়ি। দোকানের উল্টোদিকে ওয়াসিরি হাসপাতাল এবং হাসপাতালের পরেই আমাদের বাড়ি। স্কুলে যাওয়ার সময় আমি প্রায় দৌড়ে যেতাম, কেননা আমার ভয় হতো যদি স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। কিন্তু ছুটির পরে বাড়ি ফেরার সময় আমি মন্থরগতিতে হাঁটতাম। একদিন স্কুল শেষে আমি ধীরে-সুস্থে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছি। একসময় পায়ের জুতার অগ্রভাগ দিয়ে একটা পাথরে আঘাত করি। তখন ওয়াসিরি হাসপাতালের সামনে একটা বিরাট কালো গাড়ি অপেক্ষা করছিল। সেখানে কয়েকজন কালো পোশাকধারী লোক দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া সেখানে হাসপাতালের দারোয়ানও ছিল। দারোয়ানের গড়ন দীর্ঘকায় এবং সে বেশ মোটাসোটা। তার চেহারা কুিসত এবং ভয়ংকর। দারোয়ানের নাক বলতে তেমন কিছু ছিল না, বরং সেখানে দুটো বিশাল ছিদ্র ছিল। দারোয়ান হাসপাতালের বিশাল লোহার গেট খুলে দেয়। কালো পোশাক-পরা লোকদের পাশ কাটিয়ে চারজন লোক চলে গেল। লোকগুলোর কাঁধে ছিল একধরনের ঠেলাগাড়ি এবং তারা সেগুলো কালো গাড়ির পেছনের সিটের ওপর রাখল। ঠেলাগাড়িটা ছিল সাদা কাপড়ে আবৃত। শুধু নিষ্প্রাণ সাদা পায়ের কালো আঙুল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। নাকহীন দারোয়ান ঠেলাগাড়িটা ঠেলে গাড়ির আরও ভেতরে ঢোকায় এবং সাদা কাপড়টা টেনে ভালো করে ঢেকে দেয়। পায়ের আঙুলটা আর দেখা যাচ্ছিল না। সে সময় আমার মনে হলো, সাদা কাপড়ের ঢাকনার ভেতর থেকে বিধ্বস্ত শরীরটা যেন কঁকিয়ে উঠলো, ‘আহ্।’ ভয়ে আমি পালাতে চাইলাম। কিন্তু পালাতে পারলাম না। কালো পোশাক-পরা লোকগুলোর মৌনতার মাঝে কোনোরকম নড়াচড়া করাও একধরনের বেয়াদপির বহিঃপ্রকাশ। সুবেহ্ সাদেক, মধ্যাহ্ন কিংবা গোধূলিবেলায় সারা পৃথিবী যেমন থমকে থাকে, চারপাশের পরিবেশটাও ঠিক সেই রকম থমথমে। দোকানি এবং পথচারীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে দেখছে। যে চারজন লোক শবদেহটা বহন করে এনেছে, তারা সারিবদ্ধভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দারোয়ানই পরিবেশটাকে যথার্থ মূল্য দেয়নি। একসময় কালো গাড়িটা চলতে শুরু করে। সেই মুহূর্তে সুবেহ্ সাদেক, মধ্যাহ্ন এবং গোধূলির সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পুনরায় সমস্ত কিছু যেন প্রাণ ফিরে পেলো। শবযাত্রা চলে যাওয়ার পরে আস্তে আস্তে সবাই যে যার পথে ফিরে যায়। শুধু হাসপাতলের দারোয়ান, ক্রন্দনরত কালো পোশাক-পরা লোকগুলো এবং আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। ‘তুমি যাচ্ছ না কেন? সব শেষ হয়ে গেছে,’ আমাকে উদ্দেশ করে দারোয়ান বলল। হঠাত্ আমি দারোয়ানের নাকের বিশাল ফুটোর দিকে তাকাই এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যায়। পায়ে কোনো শক্তি নেই। ‘এই মেয়ে, তুমি কি ভয় পেয়েছ? জীবিত মানুষকে দেখে ভয় পেতে হয়, মৃতদের দেখে নয়,’ পুনরায় সে বলল। এ মুহূর্তে আমি জ্যান্ত মানুষ দেখেই ভয় পাচ্ছি। দারোয়ানের কুিসত এবং ভয়ংকর চেহারা আমার ভেতর ভীষণ ভয়ের সঞ্চার করেছে। ওর নাকের বিশাল ফুটো দুটোর দিকে দৃষ্টি পড়তেই আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম। মৃত্যুর প্রতি ওর উন্নাসিকতা দেখে রীতিমতো আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। তখন আমি কিছুতেই দৌড়াতে পারছিলাম না, এমনকি হাঁটতেও পারছিলাম না। দেয়াল ধরে কোনোমতে আমি পা টেনে টেনে বাড়ি ফিরলাম। বারান্দায় এসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমি গলগল করে বমি করলাম। বুয়া দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘নিশ্চয় তুমি ঠান্ডা কিছু খেয়েছ।’ একসময় বুয়া আমার জন্য চিনি মেশানো গরম সরবত নিয়ে এল। আদুরে গলায় আম্মাজান বললেন, ‘ধীরে ধীরে চুমুক দাও।’ বলেই তিনি কণ্ঠস্বর উল্টোদিকে ঘুরিয়ে শাসনের ভঙ্গিতে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আর কখনো বাজে জিনিস খাবে না।’ সেই থেকে আমি যখনই নাকহীন কদর্য চেহারার দারোয়ানকে দেখতাম, তখনই ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম। আমি ভীষণ ভীতু ছিলাম। তবে সেদিন পর্যন্ত ভয় আমার সঙ্গে সারাক্ষণ ছায়ার মতো থেকেছে, যেদিন আব্বাজান বাড়ির ছাদে আটকা পড়েছিলেন। আমি জানি না, কেন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিছুতেই আব্বাজান কাঠের মই বেয়ে নিচে নামতে পারছিলেন না। ‘মইয়ের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে নামো। খবরদার, একবারও নিচের দিকে তাকিও না,’ সতর্ক করে আম্মাজান তারস্বরে বারবার বলতে লাগলেন। ‘আমি পারছি না। আমার মাথা ঘুরছে।’ আব্বাজানের কাতর এবং ভয়ার্ত গলা শুনে সবাই হাসাহাসি শুরু করে। কিন্তু আম্মাজানের কপালে কয়েকটা চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এবং চোখেমুখে উদ্বিগ্নতা বাড়তে থাকে। তখন সবাই হাসাহাসি বন্ধ করে। ছাদের ওপরে উঠে আব্বাজানকে নামিয়ে আনতে কেউ সাহস করল না। তবে একজন দৌড়ে গিয়ে সেই ভয়ংকর এবং কুিসত চেহারার দারোয়ানকে ডেকে আনল। সে তরতর করে মই বেয়ে ওপরে উঠে আব্বাজানকে এমনভাবে তার কাঁধে তুলল, যেন কোনো আটার বস্তা কাঁধে তুলেছে। তারপর আব্বাজানকে নিয়ে দারোয়ান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিচে নেমে এল। পরদিন যখন রীতিমতো দৌড়ে স্কুলে যাচ্ছিলাম, তখন দারোয়ানকে দেখতে পেয়ে আমি স্বাভাবিকভাবে হাত নাড়ি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি পরিচিত রাস্তা, দারোয়ান এবং সকালের উজ্জ্বল নরম রোদ পেছনে ফেলে স্কুলে পৌঁছাই। সেই দিনের পর থেকে আমার কাছে দারোয়ানের কুিসত চেহারা আর ভয়ংকর বলে মনে হয়নি। পরের কয়েক বছর ভয় আমার কাছে ব্যাকরণ বইয়ের বুদ্ধিমত্তা, কিংবা ভূগোল বইয়ের ভূমিকম্প বা অগ্নু্যত্পাত শব্দের মতোই একটা শব্দ ছাড়া আর কিছু ছিল না। তখন আসল ভয় আমার মন থেকে সম্পূর্ণ উবে গিয়েছে। আমি পুরোপুরি নির্ভার ছিলাম। সে সময় ভয় বলে যদি কোনো কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা হয়তো অন্যদের ছিল। কিন্তু যখন আমি প্রথম প্রেমে পড়লাম, তখনই একধরনের ভয় এসে পুনরায় আমার মনের ভেতর বাসা বাঁধতে শুরু করে। একদিন আব্বাজান একটা নোটবই খুলে আমার মুখের সামনে বার কয়েক ঘুরিয়ে রাগী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসব কী?’ ‘এটা আমার ডায়েরি। আপনি কেন পড়েছেন?’ থতমত খেয়ে আমি পাল্টা প্রশ্ন করি। ‘চুপ করো,’ ধমকের সুরে বলেই তিনি তত্ক্ষণাত্ নোটবই থেকে জোরে জোরে পড়া শুরু করলেন, ‘আমি এফ-য়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। তারপর আমরা একসঙ্গে আইসক্রিম খেয়েছি।’ এটুকু পড়েই হঠাত্ আব্বাজান থামলেন। কটমট দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন, ‘কোথা থেকে তুই এত সাহস পেয়েছিস? বল, এই এফ কে? ওর আসল নাম কী? কোথায় থাকে? কী করে? তোর কি লাজ-লজ্জার কোনো বালাই নেই?’ তখন আমার চোখেমুখে লাজ-লজ্জার বিন্দুমাত্র চিহ্ন ছিল না। তবে আমার ভীষণ ভয় করছিল। আসলে সেই মুহূর্তে ভয়টা আমার ভেতর এসে বাসা বাঁধেনি, এসেছিল যখন আমরা পাশাপাশি বসে একজন আরেকজনের হাত ধরে নিবিড়ভাবে সিনেমা দেখছিলাম। সে সময় আমাদের বাহু একে অপরকে স্পর্শ করেছিল। সিনেমার মাঝে বাদাম খেতে খেতে আশপাশের লোকজন আমাদের উদ্দেশ করে টিটকারি মেরেছিল। একজন তো প্রচলিত প্রবাদ আওড়িয়েছিল, ‘কলিকালের ছেলেমেয়েরা লাজ-লজ্জার মাথা খেয়েছে। ওরা এখন কিছুতেই আর শরমিন্দা হয় না।’ অন্য আরেকজন মন্তব্য করে, ‘লোকচক্ষুর সম্মুখে বেতমিজদের কোনো শরম নেই।’ তৃতীয় জন বলল, ‘যত জোরে পারা যায়, বেহায়া ছেলেমেয়েদের পেটানো দরকার। তবেই ওদের উচিত শিক্ষা হবে।’ আমাদের সামনের আসনে যারা বসেছিল, তারা বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে একে অপরকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিচ্ছিল। কটু মন্তব্যের চেয়ে তাদের তাকানোর ভাবসাব ছিল আরও বেশি ভয়ঙ্কর। এ ঘটনার পর থেকে ভয়টা আবার আমার সঙ্গী হয়ে রইল। তখন আমার শুধু মনে হতো, আমি হয়তো কোথাও কোনো ভুল করেছি। যাহোক, একমাত্র সিনেমাটি স্মৃতি হয়ে থাকল, যা আমি মনোযোগ দিয়ে দেখিনি। আইসক্রিমও গলে গিয়েছিল। দুটো ছায়ামূর্তি পাশাপাশি নীরবে হেঁটে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় স্মৃতিটা শুরু হতো এবং সেটা শেষ হতো চার চোখের মায়াবী দৃষ্টি বিনিময় এবং হাতের একটুখানি ছোঁয়ায়। তবে তখন উষ্ণ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো উপস্থিতি ছিল না, এমনকি দুটো দুরন্ত শরীরের মধ্যে কোনো অন্তরঙ্গ স্পর্শও হতো না। আনুষ্ঠানিকভাবে যখন আমার জীবনে সঙ্গী এল, তখন সেখানে কোনো প্রেম-ভালোবাসা ছিল না। সামাজিকভাবে আমাদের বিয়েকে বৈধ করার জন্য এসেছিল একজন মৌলভি এবং আরেকজন কাজি। আরবি ভাষায় তারা আমাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিল। অবশেষে আমি এত বছরের পুরোনো ঘর ছেড়ে নতুন বাড়িতে প্রবেশ করলাম। নতুন সেই অচেনা বাড়িতে আমার কিছুই আলাদা বলে মনে হয়নি। শুধু একটা আনকোরা ভয় আমার সঙ্গে নতুন বাড়িতে প্রবেশ করে। সারাক্ষণ স্বামীর নানা কিসিমের অনুযোগ এবং অভিযোগ আমাকে ভীত করে রাখত। ভয়ে আমি সিঁটিয়ে থাকতাম। ‘তুমি কেন এমন করে বললে?’ ‘তুমি কেন এমন করে তাকালে?’ ‘তুমি কেন এটা করলে?’ এ ধরনের বিভিন্ন প্রশ্ন শুনতে শুনতে আমার ভেতর ভয়ের দানা বাঁধতে শুরু করে। তর্কা-তর্কি এবং ঝগড়া-ঝাটি দেখলে আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। স্নেহ-মমতাহীন ঈর্ষা, স্বার্থপরতা, এমনকি সন্দেহ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে ধ্বংস করতে থাকে। বিবাহিত জীবনের শুরুতেই আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম, বিয়ে মানেই এ ধরনের ভয় মাখানো এক অন্যরকম জীবন, আর কিছু নয়। অবশেষে আমার মনের ভেতর থেকে ভয়টা সরিয়ে দেওয়ার জন্য একদিন মৌলভি, কাজি এবং তালাকনামা এসেছিল। তাদের উপস্থিতিতে আমার বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আমি একা হয়ে পড়ি। তখন আমার মনে হতো, আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। অনায়াসে খোলা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে কোনো বাধা নেই। আমি নিজের মতো করে বাঁচতে পারব এবং ইচ্ছেমতো কাজ করতে পারব। আমার কোনো শত্রু নেই, এমনকি আমাকে ভয় দেখাবারও কেউ নেই। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনরা বলাবলি শুরু করল। তারা আমাকে সহানুভূতি জানানোর বদলে আমার সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কটু মন্তব্য করতে দ্বিধাবোধ করল না। ‘এমন কেন হলো? এটা মোটেও ঠিক হয়নি। আমাদের মান-সম্মান ধুলায় মিশে গেছে। সমাজে এখন মুখ দেখাবার কোনো পথ নেই।’ আত্মীয়-স্বজনরা এ ধরনের আজে-বাজে মন্তব্য করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা আমার ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করে এবং নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে। পুরুষেরা অর্থপূর্ণ ঈঙ্গিত করে প্রশ্নের বাণ ছুড়তে লাগল, ‘কেন তালাক দিল? কী এমন ঘটনা ঘটেছে যে বিয়েটা শেষপর্যন্ত ভেঙে গেল? কোনোভাবেই কি বিয়েটা টিকিয়ে রাখা যেত না।’ বিদ্রূপ করে মহিলারা বলতে লাগল, ‘আবার বিয়ে করছে না কেন?’ এবং তারা আমাকে অনবরত অভিসম্পাত দিতে লাগল। তাদের সেই নির্মম অভিশাপের তীব্র দহনে প্রতিনিয়ত আমি দগ্ধ হয়েছি। অফিসের সহকর্মীরা ক্ষোভের সঙ্গে বলত, ‘কেন পরিষ্কার করে কোনো কথা বলছে না?’ এবং ওরা আমাকে সারাক্ষণ অন্তর্ঘাতে জর্জরিত করে তুলত। এছাড়া স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা জানতে চেয়েছিল, ‘সে কেন এখনো বেঁচে আছে?’ এবং তারা আমার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধান শুরু করে। পুনরায় ভয় এসে আমার ভেতর বাসা বাঁধে। এবার আর ক্ষণস্থায়ী নয়, আজীবনের জন্য। সুতরাং জীবন মানেই ভয়-ভীতি। অন্যদের অস্বাভাবিক রূঢ় ব্যবহারের আরেক নাম হচ্ছে ভয়। পুলিশ বা শেরিফকে দেখলে ভয়, দিনের বেলা সূর্যের উজ্জ্বল আলো না দেখতে পারার ভয়, এমনকি খোলা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে না পারার ভয়। আমি এখন কবরের মাঝখানে আছি। চারদিকে জমাট-বাঁধা নিকষ কালো অন্ধকার। বাতাস চলাচলের জন্য শুধু দরজায় চাবি লাগানোর ছিদ্রটা রয়েছে। এছাড়া দারোয়ানের নাকের জায়গার ফুটো দুটোয় সামান্য আলোর ঝিলিক দেখা যায়। আমার চারপাশে নিস্তব্ধতার কালো চাদর বিছানো। আরও আছে কৃষ্ণপক্ষ রাতের মতো ঘন অন্ধকার, অসীম শূন্যতা এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। আমার কবরের ওপর কেউ মোমবাতি রাখতে চাইলে হয়তো পারবে, কিন্তু সেটা জ্বলবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কবর ঝাড়পোছ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তাতে শুধু দুঃখ-দুর্দশা বাড়বে। আমি ভয় পাই। এই অন্তহীন ভয়ের জন্য আমি ভীষণ ভীত। আমার কবর যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। তাতে কারোর কিছু যাবে বা আসবে না। এছাড়া কোনোদিন কেউ যদি না-ও চেনে, তাতে আমার কোনো অভিযোগ নেই, দুঃখও নেই। তবে যতদিন কবরে আছি, ততদিনই আমি এক অন্যরকম ভয়ের সঙ্গে থাকব। লেখক পরিচিতি : সমকালীন ইরানের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের তালিকায় মাহশীদ আমীরশাহীর স্থান ওপরের সারিতে। তাঁর জন্ম কারমানশাহ্ শহরে, ১৯৪০ সালে। তিনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পরে মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন এবং লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। তখন থেকেই তিনি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনী ক্ষমতা দখল করলে তিনি ইসলামিক রাষ্ট্র পরিচালনার বিরুদ্ধে একাধিক লেখা লেখেন। ফলে তাঁকে ফ্রান্সে নির্বাসিত হতে হয়। ১৯৬৬ সালে তাঁর প্রথম গল্প সংকলন (‘দ্য ব্লাইন্ড অ্যালি’) প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য গলগ্রন্থের মধ্যে ‘বিবি খানমস্ স্টার্লিং’ (১৯৬৮), ‘আফটার দ্য লাস্ট ডে’ (১৯৬৯) এবং ‘ইন দ্য ফার্স্ট পার্সন সিঙ্গুলার’ (১৯৭১) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ (‘অ্যাট হোম’) এবং ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস (‘ইন এ জার্নি’)। আমীরশাহীর প্রতিটি গল্পের মূল বিষয় ইরানের পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে নারীদের মমতা, ভালোবাসা, যন্ত্রণা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং বিদ্রোহ। তিনি এসব মানবিক অনুভূতিগুলোকে নতুন আঙ্গিকে নতুন উপলব্ধির মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। অনূদিত গল্পটি এর ব্যতিক্রম নয়। [‘ভয়’ গল্পটি মাহশীদ আমীরশাহীর ইংরেজিতে ‘হিয়ার অ্যান্ড নাউ’ গল্পের অনুবাদ। ইংরেজিতে গল্পটি অনুবাদ করেছেন রয়া মোনাজেম। গল্পটি আমীরশাহীর ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘সিলেক্টেড স্টোরিজ’ গল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত, যা ২০০২ সালে ‘পেওয়ান্ড’ ম্যাগাজিনে পুনঃপ্রকাশিত হয়।]