গল্প

ছোঁয়া

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:৩০
রতনের বউয়ের চেঁচামেচিতে গত পনের বছর ধরে ঘুম ভাঙে মালতী দাসের। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সেই চেঁচামেচি না শুনলে ঘুমও ভাঙে না। রতনের চোলাই মদের ব্যাবসা ছিল। রতন যখন লিভার পচে মারা গেল তখন তার বউ ব্যাবসার হাল ধরল। সকাল সকাল ছোটখাটো ভিড় জমে রতনের ঘরের সামনে, দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েই চলে চিত্কার-চেঁচামেচি। রতন একটু উদারমনা ছিল, সবাইকেই বাকিতে মদ খাওয়াতো, কিন্তু তার বউয়ের কাছ থেকে বাকিতে কেউ এক গ্লাস মদ পেয়েছে—এমন ইতিহাস খুব কম। এ কারণেই এই হরিদাসপল্লীতে রতনের বউকে অভিশাপ দেয় না—এমন লোকের সংখ্যাও খুব কম। সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে মালতী দাস একজন। মালতী দাস নিজের বৃদ্ধ শরীরটাকে কোনোমতে ঠেলে বিছানা থেকে উঠালেন, প্রায় ভাঙা চৌকিটা আর্তনাদ করে উঠল। ঘরের আসবাবপত্র বলতে এই ভাঙা চৌকিটাই সম্বল। ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে টানানো দড়িতে কিছু ছেঁড়া ময়লা কাপড়-চোপড় ঝুলছে, মেঝেতে একটা পানির কলসি আর কিছু হাঁড়িপাতিল, বাসন-কোসন জড়ো করে রাখা আছে। তার পাশেই মরিচা ধরা একটা ট্রাঙ্ক। মালতী দাসের বিয়ের সময় তার মেসো এই ট্রাঙ্ক দিয়েছিল। মালতী দাসের আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই, স্বামী লিভার পচে মরেছে কোলে বাচ্চা আসার পরপরই। এই পাড়াতে অধিকাংশ পুরুষ লিভার পচে মারা যায়। হরিদাসপল্লীর লোকজন হচ্ছে সমাজের কাক, নোংরা-ময়লা সব তারাই পরিষ্কার করে। কাক যেমন পাখিদের মধ্যে নিকৃষ্ট, তারা তেমন মানুষদের মধ্যে নিকৃষ্ট। মদ না পেলে সুস্থ মানুষের পক্ষে মানবকাক হওয়া অসম্ভবের কাছাকাছি। মালতী দাস তার ঘরের দাওয়ায় এসে বসে গলা উঁচু করে প্রশ্রয়ের সুরে বলে— —কী লো রতনের বউ, তোর গলায় কি ভগবান সব বিষ দিয়া দিছেনি? মরনের আগে মনে অয় আর শান্তিতে ঘুমাইতে পারতাম না। —পিসি, এই গলা না থাকলে দুইটা পুলাপাইন লইয়া টিকতে পারতাম না, চিল-কাউয়্যায় কবেই ছিঁড়াবিড়া খাইয়া লাইতো। —হ, চিল-কাউয়্যার তো অবাব নাই। বলেই মালতী বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, হয়তো অতীত মনে করেই। মালতী দাস সপ্তাহে ছয় দিন ভিক্ষা করে, আর এক দিন ছুটি। যতদিন গায়ে শক্তি ছিল, রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করত। সহায়-সম্বলহীন মালতীর ভিক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। কিন্তু শহরে হিন্দু ভিক্ষুক নেই বললেই চলে, আর ভগবানের ওয়াস্তে কেউ ভিক্ষাও দেয় না, হিন্দুরাও না, কেমন সন্দেহমাখা দৃষ্টিতে তাকায়। তাই মালতী পেটের খাতিরে আল্লাহর আশ্রয় নিল। এখন সে আল্লাহর ওয়াস্তে ভিক্ষা চায়। সাধারণত কোনো ভিক্ষুক শুক্রবারে ভিক্ষা করার সুযোগ ছাড়ে না, কিন্তু মালতী শুক্রবারে ভিক্ষা করতে যায় না, এইদিন তার এরচেয়েও জরুরি কাজ থাকে। রোদের তেজ জানান দিচ্ছে যে বেলা বাড়ছে। মালতী দাস একটা পুঁটলি হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে হরিদাসপল্লীর উত্তর দিকে হাঁটা ধরেছেন। বয়সের সাথে সাথে মালতী দাস যত বৃদ্ধ হচ্ছেন, হরিদাসপল্লী যেন ততই যুবতী হচ্ছে। আগের সেই মায়ামাখা নিরীহ কুড়েঘরগুলো নেই, ইটের রাজত্ব এখানেও চলে এসেছে। ইটের বাড়িগুলোকে দেখায় অতিরিক্ত লিপস্টিক-পাউডার দিয়ে সজ্জিত নৈশকন্যাদের মতো। তবে এই পল্লীর মানুষগুলো এখন স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, অনেকেই নিজেদের সন্তানদের নিজের ভবিষ্যত্ দিয়ে যেতে চান না। সকাল বিকাল চোলাই মদ গেলা বাবাও চান তার ছেলে যেন তার মতো কাক হয়ে বেঁচে না থাকে। ঘরগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটলে টেলিভিশনে বাংলা সিনেমার নায়িকার গগনবিদারী চিত্কার, মাতাল স্বামীর সাথে স্ত্রীর যুদ্ধের আওয়াজ, ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ছাড়াও এখন মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কোমল কণ্ঠে ‘অ’ ‘আ’ শোনা যায়। রাজুর দোকানে এসে থামল মালতী। রাজু মালতীকে দেখা মাত্রই বয়াম থেকে চকচকে কাগজে মোড়ানো কিছু লজেন্স বের করে মালতীর দিকে এগিয়ে দিল। প্রতি শুক্রবার ঠিক এই সময়ে মালতী রাজুর দোকান থেকে লজেন্স নিয়ে যায় আর প্রতিবারই মালতী টাকা দেওয়ার জন্য নিজের আচলের গিঁট খুলতে গেলেই রাজু বাধা দিয়ে বলে, ‘আহা পিসি কী করতাছ, ট্যাকা লাগবো না, ঠাকুরের কাছে আমার লাইগা আশির্বাদ কইরো’। সূর্যের দিকে তাকিয়ে মালতী আন্দাজ করার চেষ্টা করল, কত বেলা হলো। না দেরি করা যাবে না, নিখিলটা না আবার খেলতে বেরিয়ে যায়। নিখিল হচ্ছে মালতীর গুরু আর এই লজেন্সগুলো হচ্ছে গুরুদক্ষিণা। নিখিল পাশের সরকারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। তার কাছেই মালতী বাংলা পড়তে শিখছে। লজেন্সের মতো গুরুদক্ষিণা পেয়ে গুরু খুবই প্রীত হন, সেই প্রীতির আতিশয্যে মাঝে মাঝে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাংলার ‘অ’ ‘আ’-এর সাথে ইংলিশ ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’ও পড়ানো শুরু করে, কিন্তু তার শিষ্যার ইংলিশের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই, এমনকি লেখাতেও তার আগ্রহ নেই, তার সব আগ্রহ পড়াতেই। নিখিলের বাবা নিজের ছেলের বুড়ি ছাত্রীকে দেখে খুব গর্ববোধ করেন, আবার বুড়ির ভীমরতি দেখে মনে মনে হাসেন। রতনের বউ তার বুড়ি পিসির এই ছেলেমানুষির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায় না। মালতীকে শ্লেষমাখা কণ্ঠে বলে, -পিসি দুইদিন পরে তো ভগবানের কাছে চইল্যা যাবা, এখন এই ‘সরু’, ‘সরায়া’ কইরা কী লাভ? মালতী উদাস হয়ে যায়, কেমন যেন প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চায়। রতনের বউয়ের দৃষ্টি এড়ায় না সেটা, একটু ঠাট্টার ছলেই বলে— —আরে পিসি, ভগবানের কাছে পাপ-পূণ্যের বিচার হইবো, পড়ালেখা না জানলেও সমইস্যা হইবো না। মালতী অতি কষ্টে একটা সৌহার্দ্যের হাসি দিয়ে ঘরে চলে আসে। পুরোনো জংধরা ট্রাঙ্কটা যেন বার বার অতীতটাকে সামনে এনে রেখে দেয় মালতীর, বিচ্ছেদের অতীত। স্বামীর স্মৃতিগুলোতে জং ধরে গেছে, কিন্তু সন্তানের স্মৃতি যেন প্রতিবছর নতুন করে সবুজ হয়, বসন্তে গাছের নতুন পাতার মতো। অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পর ছেলেটাই ছিল মালতীর বাঁচার উপলক্ষ। অনেক আদর করে নিজে নাম রেখেছিল মানিক, মালতীর কাছে তার ছেলে আসলেই মানিক ছিল। ট্রাঙ্কের ভেতরটা মানিকের খেলনায় ভরতি, অধিকাংশই মালতী রাস্তায় ময়লা পরিষ্কারের সময় কুড়িয়ে পেয়েছে। একটা ভাঁজ করা লাল শার্ট আছে ট্রাঙ্কের এক পাশে, দুর্গা পূজায় মানিককে দেবে বলে কিনে রেখেছিল মালতী, কিন্তু মানিক জানত না, আর কোনোদিন জানবে না। মানিককে হরিদাসপল্লীতে রেখে মানুষ করতে পারত না মালতী। সে চায়নি, তার মানিক মানুষের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করুক, তাই দশ বছর বয়সেই নিজের মেসতুতো দাদার মুদি দোকানে পাঠিয়ে দিয়েছিল মানিককে। সে সময়টাতে কোনোবেলা পেট পুরে খেতো না মালতী, ছেঁড়া শাড়িটাকে তালি দেওয়ার জন্যও আর কাপড় অবশিষ্ট ছিল না। এই দরিদ্রতা সে ইচ্ছে করেই বরণ করেছিল, নিজের মানিকের ভবিষ্যতের জন্য, তার ছেলেকে নিজস্ব দোকান করে দেবে বলে। এক টাকা-দু টাকা করে মালতী তিন হাজার পঁয়তাল্লিশ টাকা জমিয়ে ফেলেছিল, সেই টাকা এখনো এই ট্রাঙ্কে আছে। বহু বছর কেটে গেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, ভিক্ষা করতে হচ্ছে মালতীকে, কিন্তু সেই টাকায় একবারও হাত দেয়নি মালতী, এই টাকা তার মানিকের। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছরটা ঘোরে কেটেছিল মালতীর। কীভাবে কেটেছে সে মনে করতে পারে না, কিন্তু একটা দিন সে ভোলেনি, কোনোদিন ভুলবে না। সেদিন রাতে প্রচণ্ড চিত্কার, মানুষের আর্তনাদ আর বন্দুকের হুংকারে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল মালতীর। অনেকক্ষণ পরে চারদিক শান্ত হলো, চিত্কারগুলো থেমে গেল, হঠাত্ তার দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ শুনে যেন সম্বিত্ ফিরে পেলো মালতী, রতনের গলা শোনা যাচ্ছে, পিসি পিসি বলে ডাকছে। মালতী ধীরে ধীরে দরজা খুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রতনের দিকে। সেই জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা রতনের ছিল না। বাইরে তাকিয়ে মালতী দেখল, এ পাড়ার অনেককেই জড়ো করা হয়েছে, একটা ভয়ার্ত চাপা গুঞ্জন হচ্ছে চারপাশে। সবার সামনে কিছু খাকি উর্দি পরা বিশালদেহী লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন নেতা গোছের আরেকজনকে ডেকে কানে কানে কী যেন বলল। সেই লোকটি সামনে এসে গলা উঁচিয়ে বলল, ‘তোমলোগ হামারা সাথ আও, কুছ সাফাই কারনি হ্যায়’। তারা তখনও জানত না, কী বিভীষিকা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মালতী রাস্তায় এসে দেখল, সকালবেলা তারা যে রাস্তা পরিষ্কার করেছিল সে রাস্তাটা আর পরিষ্কার নেই। পিচ দিয়ে ঢাকা রাস্তাটা রক্তে লাল হয়ে গেছে, জমাট বাঁধতে শুরু করেছে সেই রক্ত, জমাট বাঁধা রক্তে চুল, আঙুল আর মাংসখণ্ড দেখা যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কয়েকটা নিথর দেহ পড়ে আছে। খাকি উর্দি পরা গোঁফওয়ালা লোকটি তাদের তাগদা দিচ্ছে তাড়াতাড়ি লাশগুলোকে একজায়গায় স্তূপ করার জন্য আর পানি দিয়ে রক্ত মোছার জন্য। রতন আর মালতী ঢক ঢক করে একটু মদ গিলে লাশগুলো স্তূপ করার কাজে নেমে গেল। দুইটা লাশ এনে মালতী আরও একটা লাশের কাছে গেল, দশ-এগারো বছরের একটা ছেলে, মুখটা দেখামাত্রই মালতীর শরীরে যেন রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। মানিক চেয়ে আছে তার মায়ের দিকে এক চোখ দিয়ে, অন্য চোখটায় জমাট বাঁধা রক্ত। সাথে সাথে মূর্ছা গেল মালতী। চোখ খোলার পর এক সপ্তাহ শুধু চিত্কার করেছে মালতী, একবার নিজের মানিকের শরীরটা ছোঁয়ার জন্য আকুতি জানিয়েছে। বিয়াল্লিশ বছর সে আকুতি মনে বয়ে বেড়াচ্ছে মালতী। হরিদাসপল্লীতে পঁচিশে মার্চে যারা মারা গিয়েছিল, তাদের জন্য একটা স্মৃতিস্তম্ভ হয়েছে। স্তম্ভ কী জিনিস, মালতী বোঝে না। এলাকার কমিশনার স্তম্ভটি উদ্বোধন করে গেল, মাইক লাগিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কিছু লোক গলা ফাটিয়ে গেল। মালতীর কাছে মাইকে কথাবলা লোকগুলোর কথা সবসময় এক রকম লাগে। কিন্তু যখন পরশ দা বলল সেই স্তম্ভে তার মানিকের নাম আছে, মালতী ছুটে গিয়েছিল লম্বামতো একটা সিমেন্টের পিলারের নিচে। শ্বেতপাথরে কিছু কালো কুচকুচে অক্ষর। মালতী কালো পিঁপড়ার সারি আর এই কালো অক্ষরের মাঝে কোনো পার্থক্য করতে পারে না। নিজের ছেলের নামটা ছোঁয়ার জন্য মালতীর প্রাণটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। একটা কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে স্তম্ভটার সামনে এসে দাঁড়াল মালতী। আজ এই স্তম্ভ তার কাছে শুধু সিমেন্টের পিলার নয়, তার মানিকের প্রতিরূপ। কাছে গিয়ে শ্বেতপাথরে লেখা নামগুলো পড়তে লাগল মালতী। ঝাপসা ঝাপসা দৃষ্টিতে পড়ছিল নামগুলো, বয়সের কারণে মালতীর দৃষ্টিতে কোনো প্রভাব পড়েনি, ঝাপসা দেখার কারণ তার চোখে অপেক্ষমান অশ্রু। সাতটা নাম পড়ার পর নিজের মানিককে খুঁজে পেলো মালতী। মানিক চন্দ্র দাস, পড়া মাত্রই চোখের অশ্রুর অপেক্ষা শেষ হলো। নামের ওপর নিজের বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছিল মালতী। বহুদিনের আকুতি বুঝি শেষ হলো, বুকের মধ্যে একটা ঠান্ডা হাওয়া অনুভব করছে মালতী। নিজের ছেলেকেই যেন ছুঁয়ে দিচ্ছিল সে। নিজের পুঁটলিটা থেকে একটা ভাঁজ করা লাল শার্ট আর পলিথিনে মোড়ানো তিন হাজার পঁয়তাল্লিশ টাকা বের করল সে। সেই শ্বেতপাথরটার ওপর মানিকের পূজার শার্ট আর তিন হাজার পঁয়তাল্লিশ টাকা রাখল মালতী। অশ্রু গড়িয়ে মালতীর শাড়িটা ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু মালতী অশ্রু মুছল না, বহু বছর পর নিজের অশ্রুকে আর বাধা দিচ্ছে না মালতী। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার, বিয়াল্লিশ বছরের কান্না আজ কাঁদবে সে, নিজের মানিককে ছোঁয়ার আনন্দে কাঁদবে।