আধুনিক আরবের ছোটগল্প

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:৩১
মধ্যযুগ শেষ হবার পর ইউরোপে যে নবজাগরণ বা রেনেসাঁ শুরু হয়েছিল, আরবি ভাষা ও সাহিত্যে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ঠিক একই ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। ১৭৯৮ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন মিসর অভিযান চালান। এতে ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে আরব্য জগতের সম্মুখ পরিচয় ঘটে। সিরিয়ায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম থেকেই আরবি বই-পুস্তক ছাপানোর সুযোগ ছিল। নেপোলিয়ন প্রশাসন এসে মিসরে প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করে। ফলে সেখানে আরবি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার নানামুখী সম্ভাবনার পথ খুলে যায়। এরপর থেকে ইউরোপীয় তথা পশ্চিমা বইপত্র আরবিতে অনূদিত হতে থাকে। মিসরের শাসক মুহাম্মদ আলী পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও চিকিত্সাশাস্ত্র শিক্ষার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সিরিয়াতেও এ ধরনের শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। লেবাননের বিখ্যাত পণ্ডিত বুক্রস আল-বুস্তানই সর্বপ্রথম আরবি পত্রিকা আল-জিনান প্রতিষ্ঠা করেন। বৈরুতের আমেরিকান কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। ফরাসি মিশনারি সেন্ট জোসেফ বিশ্ববিদ্যালয় নামে বৈরুতে আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করে। একই সময়ে কায়রোতেও একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এসময় বহু আরব বিদ্যার্থী ফরাসি বইপত্র আরবিতে অনুবাদ করেন। ঊনবিংশ শতকের শুরুর এই সময়টিতে মিসরসহ আরবের অন্যান্য প্রান্তের লোকেরা বৈশ্বিক জীবনোপকরণে আধুনিকতার ছোঁয়া, প্রাকৃতিক শক্তিকে পরাভূত করার যাবতীয় উপায় ও উপকরণ এবং প্রকৃতিকে অধীনস্থ করার সব আয়োজন সম্বন্ধে জানতে শুরু করে। এসময় তাদের চিন্তার জগতে, ভাব, মনন, চিন্তায় ও অর্থে, সাহিত্যে, কাব্যে, সর্বত্রই নতুন নতুন আবিষ্কার, আধুনিক তথ্য, তত্ত্ব এবং প্রযুক্তি ক্রমশই জায়গা করে নেয়। পাশ্চাত্যের সাহিত্যিকেরা তখন নতুন সব আঙ্গিক, কাঠামো, অবয়ব আর রূপে সাহিত্য চর্চা করছে, নিজস্ব ফর্মে কবিতা লিখছে। বাস্তব উপলব্ধি আর অভিজ্ঞান তাদের লেখায় ফুটে উঠছে। গণমানুষের জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য রচনা করতে তারা তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি এবং প্রমাণাদির অবতারণার মাধ্যমে সাহিত্যকর্মকে উচ্চমার্গীয় সৃষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করায় ব্যস্ত। ঠিক তখন থেকে আরব দেশগুলো পাশ্চাত্যের সঙ্গে তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে আঙ্গিকের বাঁধনে জড়িয়ে ফেলে। তবে এ কথাও সমানভাবে সত্য যে, আরবেরা পাশ্চাত্যের সঙ্গে নিজেদের এমন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ফেলার পরও, তারা তাদের সোনালি অতীত, বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে কখনোই পুরোপুরি ভুলে যায়নি। বরং এই সময়টাতে আবারও তারা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সমৃদ্ধ আরবি সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারকে পুনরুজ্জীবিত করতে সমানভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। পুরাতন সাহিত্য এবং আধুনিক সাহিত্যের ভালো দিকগুলো বিবেচনায় রেখে, ভিন্নধর্মী এই দুই সংস্কৃতির মাঝে মেলবন্ধন তৈরি করে আরও উন্নত সাহিত্যকর্ম, কাঠামো আর আঙ্গিক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। আর একারণেই আজকের আধুনিক আরবি সাহিত্য অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আধুনিক আরবি ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও কথাটা সমানভাবে প্রযোজ্য। কল্পিত, রোমান্স কাহিনিভিত্তিক আরবি ছোটগল্প এবং উপন্যাস উন্মেষের ধারাবাহিকতা পশ্চিমের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তবে পশ্চিমের মতোই উনিশ শতকের শেষ দশকে উপন্যাসের হাত ধরেই আরবের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষিপ্তভাবে এই ধাঁচের সাহিত্য রচনার সূত্রপাত। এর মূলপ্রেরণা মূলত অনুবাদ থেকেই আসে বলে জানা যায়। আর এইসব অনুবাদের বেশিরভাগই ছিল উপন্যাস। মাঝের একটা সময়ে অল্পস্বল্প পশ্চিমা ছোটগল্পও আরবিতে অনূদিত হয়। এতসবের পরও সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের ছোটগল্প লেখেন—১৯২০-এর দিকে মিসরে এমন একদল লেখকের সন্ধান পাওয়া যায়। বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে আরবের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটগল্পকারদের অজস্র লেখনীর মধ্যদিয়ে এই ধারা আরও জোরদার হয়। এভাবে একসময় রোমান্স কাহিনি ধারার ধাঁচটি স্থায়িত্ব পায়। পরবর্তীতে পঞ্চাশের দশক জুড়ে এবং সত্তরের দশকেও এই একই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। এসময় বিদেশি চিন্তাধারা আর দেশীয় পরিস্থিতির অভিঘাতে আরবি ছোটগল্প উচ্চতর মর্যাদার সঙ্গে আঙ্গিকের দিকদিয়ে আরও বৈচিত্র্য মণ্ডিত হতে থাকে। এবং ছোটগল্পের প্রাধান্যই বজায় থাকে। একই দশকসমূহে আরব বিশ্বের আরবি উপন্যাসের শেকড়ও দৃঢ় হতে থাকে। সেখানকার সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছোটগল্পকারের হাত ধরেই তা সম্পন্ন হয়। কিন্তু সত্তরের পর হতে ছোটগল্পের এই প্রাধান্য ধীরে ধীরে উপন্যাসের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে থাকে। পশ্চিম থেকে এই ধরন খানিকটা আলাদা। সর্বপ্রথমে উপন্যাসের মাধ্যমে ইউরোপে এ ধরনের গদ্যমুখী সাহিত্যচর্চার শুরু এবং সেখানে ছোটগল্পের শেকড় বের হবার আগেই উনিশ শতকের গোঁড়ার দিকে এর পরিণতি ঘটে এবং ১৮৯০-র দশকে এসে গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক প্রাপ্ত হয়। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধকালিন এবং তার পরবর্তীকালে ব্যাপক অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার ছোটগল্প আরও বেশি উপযোগী চেহারা পেতে শুরু করে। এবং উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে তা অনেক বেশি সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়। মজার বিষয় হলো, বিংশ শতাব্দীতে এসে, আমেরিকার বেশিরভাগ জার্নাল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ছোটগল্পকারদের পুরস্কৃত করতে শুরু করে। একক কোনো গল্পের জন্য আর্থিক বিচারে এর মূল্যমান বর্তমান সময়ের চাইতেও অনেক বেশি। এখানে মনে রাখতে হবে, আধুনিক আরবের উপন্যাস ও ছোটগল্পের মতোই, সাহিত্যের এই দুই আধুনিক ধারণার সমরূপী অসংখ্য বাস্তব বা কল্পিত কথাকাহিনি, লিখিত বা মৌখিক আকারে বিগত বারশত বছরের অধিক কাল ধরে আরব্য ভূমিতে পঠন পাঠন ও চর্চা হয়ে আসছিল। কিন্তু অতীত দিনের গৌরবগাথার সেইসব সংক্ষিপ্ত বর্ণনামূলক আঙ্গিকসমৃদ্ধ কাহিনির উদাহরণ সম্মুখ স্মৃতিতে আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ। তার অনেক বৈচিত্র্যময় কারণও রয়েছে। পুরাকালের সেই চমকপ্রদ ঐতিহ্য আজও আরবের লেখকদের অবচেতনে কাজ করে যাচ্ছে এবং স্বতঃস্ফূর্ত সেই শৈল্পিক শৈলী আধুনিক আরবের কল্পিত কথাকাহিনিকে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তথা আধুনিক ছোটগল্পের সঙ্গে স্বাভাবিক এক মেলবন্ধন তৈরিতে সহায়তা করেছে। ইংল্যান্ডের ছোটগল্পের ধীর এবং অস্বাভাবিক উন্মেষের ধারাবাহিকতার দিকে তাকালেই এই পরিস্থিতি আমাদের কাছে অনেকটাই স্পষ্ট হবে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেখানে এমন কোনো লেখক ছিলেন না যাকে আমরা ছোটগল্পের বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভাবতে পারি। ১৮৮২ সালে রবার্ট লুইস স্টিভেনসন-এর প্রথম ছোটগল্প সংগ্রহ প্রকাশিত হয়, এবং তাকেই সেখানকার ছোটগল্পের পুরোধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও ইংল্যান্ডের বদলে আধুনিক ছোটগল্পের ধারাটি পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে খুব দ্রুততার সঙ্গেই পরিপক্বতা লাভ করেছিল। কিন্তু সময়ের বিচারে সেটা আরবের মাটিতে আরও দ্রুততর পরিপক্বতা লাভ করেছে। কিন্তু পরিপক্বতা লাভের সেই সময়টাতে, প্রধান দুটি কাল্পনিক তথা ফিকশন আঙ্গিক তাদের আধুনিক ধাঁচে আবির্ভূত হয়েছে, যা আরবে পুরোপুরি নতুন। এবং ঐতিহ্যের আলোকবর্তিকায় পথ চিনে নেওয়ার বদলে সেখানকার লেখকদের তাই আধুনিক পদ্ধতি এবং গুরুত্বারোপের দিকটি আবিষ্কারের জন্য একেবারে প্রথম থেকেই আবার শুরু করতে হয়েছে। তাছাড়া, সুপরিচিত লেখকদের উত্তরাধিকার ধরে রাখার প্রচেষ্টা আক্রমণের মুখে পড়ায় এই সময়টাকে অনেক গদ্যকারের স্বভাবজাত আঙ্গিককে তেমন একটা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়নি। এবং এসব স্বভাবজাত লেখকদের সমৃদ্ধ বর্ণনার ঢঙ বুঝে উঠতে এবং তা থেকে সচেতনভাবে প্রেরণা গ্রহণে আরও কয়েক দশক সময়ের প্রয়োজন হয়। ফিকশন লেখকদের জন্য সরাসরি সনাতনতা থেকে মুক্ত হওয়া মানে প্রতিষ্ঠিত প্রথা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, যা কবিতার ক্ষেত্রে আদৌ ঘটতে দেখা যায়নি। কিন্তু এরপরও, এক্ষেত্রে সরাসরি গতানুগতিকতা থেকে সম্পর্ক ছিন্নতার মতো কোনো ঘটনা না ঘটলেও বা উত্তরাধিকার সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা না আসলেও, কাহিনিকারেরা কেবল সেখান থেকে মুক্তই হননি, কালক্রমে তারা বিচ্ছিন্নও হয়ে পড়েন, এতে নিজের ভাষাকে আঁকড়ে ধরে থাকার আর কোনো বাধ্যবাধকতাও রইল না। এই স্বাধীনতা সত্যিই সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার এক স্বাধীনতা। নতুন এই মান ও ধীরে অর্জিত নব এই শৈল্পিকতার ধারণা এবং এর কৌশলকে উপযুক্ত ভিত্তি প্রদানের জন্য এই ধারাটিতেই তাদের সবাইকে থিত হতে হয়। একথা সত্য যে, পশ্চিমাদের দেবার মতন তাদের হাতেও একটা ছাঁচ বা প্রতিরূপ ছিল, কিন্তু সেখানেও আরও বড় বিপত্তি ঘটতে পারত, আর সেই বিপত্তির নাম—সংকরায়ন। যদি তারা আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত কোনো ধাঁচের মধ্য হতে নিজেদের জন্য উপন্যাস বা ছোটগল্পের ছাঁচ বা কাঠামো বেছে নিতো তাহলে খুব শীঘ্রই তারা অনুধাবন করতে পারত যে, সংকরায়নের উদাহরণ সৃষ্টি থেকে বিরত হবার জন্য কাহিনি বা নাটকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হতে আসা অন্যসব ফলাফলগুলোও বর্জন করতে হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ছোটগল্প অথবা উপন্যাসের প্লটের শুরুর বিচিত্রতা আর সমাপ্তির ভিন্নতাই পশ্চিমা ধাঁচটিকে হুবহু ফুটিয়ে তুলতে পারে, সেই সঙ্গে অন্যান্য আরও সব উপাদানের মধ্যে রয়েছে চরিত্র, অণুঘটনা, বর্ণনার ঢঙ, নান্দনিকতা, মানসিক প্রতিক্রিয়া, আবেগি সাড়া সর্বোপরি লেখকের নিজস্ব বা দেশজ সংস্কৃতি। নতুন লেখকদের তাদের চারপাশের বাস্তবতাকে অতি নিখুঁতভাবে অনুধাবন করে তা স্পষ্টভাবে রূপায়ণ করার জন্য এবং আধুনিক সাহিত্যের ভাষায় অতি সাবলীলভাবে আধুনিক আরব বিশ্বের নারী-পুরুষের চিন্তাবিষ্টতা, উদ্বেগ, এবং তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তুলতে লেখনীর মাঝে নিজস্ব আঙ্গিকটিকে খুঁজে নিতে হয়। তারপরও সৃষ্টিশীল কাহিনিকার এবং নাট্যকারদের পরীক্ষামূলক চরিত্রের চিত্রণ এবং ধীরে ধীরে সাহসের সাথে নিজেকে নব্য প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে নিতে হয়। লেখক তার লেখনীতে যত দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন তত দ্রুতই তিনি নিজস্ব লেখনীর মাঝে নতুন শৈল্পিক ধারার সূত্রপাত ঘটাতে সক্ষম হবেন। আর সেটি সম্ভব না হলে পাঠক এবং সমালোচক সেই লেখাতে স্বাভাবিকতা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হবেন, এটাই স্বাভাবিক। আর এই একটি কারণে, কাহিনিকারেরা অতি চাহিদা সত্ত্বেও উপন্যাস রচনায় দ্বিধান্বিত থাকেন। এবং আর্থিক সাফল্য নিয়ে চিন্তিত হবার কারণে প্রকাশকেরাও এ ধরনের সাহিত্যকর্ম প্রকাশে থাকেন সন্দিগ্ধ। অন্যদিকে ছোটগল্পকারেরা তাদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশে হাতের নাগালেই প্রকাশ-উন্মুখ অনেক সাহিত্য ম্যাগাজিনের সন্ধান পান। নতুন এই স্বাধীনতার কারণেই শূন্য অলীক অবস্থান থেকে লেখকদের নিজস্ব অবস্থান তৈরি করে নিতে উত্সাহিত করে। তারা বুঝতে শেখেন, সাহিত্যের শৈল্পিক এই ধারাটি আদতেই অবাধ বা স্বাধীন নয়। শিল্পেরও রয়েছে নিজস্ব অন্তর্গত কিছু নিয়ম, যা কখনোই পুরোপুরি বিরোধিতা, অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করা সম্ভব নয়। অপরিহার্য এইসব নির্বাক নিশ্চুপ অলিখিত নিয়ম-কানুন সবসময়ই উচ্চমার্গীয় লেখকদের অনুপ্রাণিত করে এসেছে; তিনি জানেন কখন কোথায় থামতে হবে, কখন ঝুঁকি গ্রহণ করতে হবে, কোনটা পরিগ্রহণ করতে হবে এবং কোনটা পরিত্যাগ করতে হবে। এরপরও, এতসবের বিচারে সম্পূর্ণ নতুন শৈল্পিক আঙ্গিক গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল সহজাত শৈল্পিকতাই সর্বোত্তম ফলাফলটিকে নিরাপদ করতে পারে না। সৃষ্টিশীল লেখকদের তাই নিজের নতুন সব পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টাকে উপযুক্তভাবে সাজিয়ে তুলতে নিজের ‘কাজের প্রতি দরদ’ এবং ‘সঠিক সময়’—এই দুটারই প্রয়োজন হয়। কেননা নতুন শৈল্পিক আঙ্গিক খুব বেশিদিন অনাত্মীয় থাকেনা। খুব শীঘ্রই তাতে অন্যেরা মানিয়ে নিতে পারে এবং সেটা যথাসময়ে অন্যদের কাছে পৌঁছেও যায়। সাহিত্যের রকমফের বা আঙ্গিকের ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, যেকোনো ভাষায় সৃষ্টিশীল লেখকদের জন্য এই রকমফের বা আঙ্গিকের সংখ্যা খুব বেশি নেই। তার ওপর, মরুময় আরবের উষ্ণ ভূমিতে বিভিন্ন সংস্কৃতির পত্তন এবং উন্মেষের ধারাবাহিকতার বিচারে, অবশ্যম্ভাবীরূপে এটাও আশা করা হয় যে, আরব উপন্যাসের ফর্ম তথা আঙ্গিকে আধুনিক সময় আরোপ করতে হয়েছিল, পশ্চিমা উপন্যাসের আঙ্গিক গঠনের পেছনেও ঠিক এই একই বিষয় কাজ করেছে। এটা খুবই সম্ভব যে আধুনিক আরবের প্রথম দিককার কল্পকাহিনিকারেরা পশ্চিমা আঙ্গিকসমূহ অনুকরণে সচেতন ছিলেন। তারপরও আঙ্গিক নিয়ে এতসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারাবাহিকতা, লেখক এবং পাঠকের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা, ঐতিহাসিক মুহূর্তে এসবের যথার্থতা, নিরেট সময়োপযোগীতারই প্রমাণ করে।