প্রস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধিজনিত রোগের আধুনিক চিকিত্সা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৮:৪০
সহযোগী অধ্যাপক, ইউরোলজি বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। চেম্বার:ঢাকা রেনাল এন্ড জেনারেল হাসপাতাল, ১৬১/এ, লেক সার্কাস, কলাবাগান, ঢাকা প্রষ্টেট ওয়াল নাট আকৃতির ছোট ফাইব্রো মাসকুলার গ্লান্ড যেটা প্রস্রাবের থলির নীচের দিকে তলপেটে অবস্থিত। ইউরেথ্রা বা প্রস্রাবের নালী প্রস্রাবের থলি থেকে যে স্থানে বাহির হয় এটা সেখানে প্রস্রাবের নালী ঘিরে রাখে। প্রষ্টেট গ্রন্থি সারাজীবন বৃদ্ধি পেতে পারে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই বৃদ্ধির পরিমাণ বেশী হলে মূত্র নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। প্রস্টেট পুরুষদের ইন্টারনাল অর্গানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পুরুষের সুখময় দাম্পত্য জীবনে প্রষ্টেট-এর রয়েছে এক অনবদ্য ভূমিকা। এই প্রস্টেট-এর নানা সমস্যা, নানা রোগ রয়েছে। বিশেষ করে চল্লিশোর্ধ পুরুষের বছরে অন্ততঃ একবার অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি প্রস্টেট-পরীক্ষা করানো উচিত। প্রস্টেট গ্রন্থি বেড়ে গিয়ে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। প্রস্টেটের সমস্যাকে হালকা করে দেখা উচিত্ নয়। প্রস্টেট গ্রন্থির যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। প্রস্টেট জনিত সমস্যা গুলোর মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া বিশেষত রাত্রে। চিকন নালীতে প্রস্রাব হওয়া, বেগ পেলে প্রস্রাব ধরে রাখতে কষ্ট হওয়া, প্রস্রাবের শেষে কিছু প্রস্রাব থলিতে রয়ে গেছে মনে হওয়া, প্রস্রাবের শেষে অনেকক্ষণ ধরে ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব ঝরতে থাকা এবং এক পর্যায়ে প্রস্রাব আটকে যাওয়া। এই সব উপসর্গ থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত করতে হয়। সাধারণত যে সব পরীক্ষা করা হয় তা হলো প্রস্রাবের রুটিন, মাইক্রোসকপিক ও কালচার সেনটিভিটি পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, কেইউবি এক্সরে-ইউরোফ্লোমেট্রি, সিরাম পি.এস.এ. সিসটোমেট্রাগ্রাম বা ইরোডাইনামিক ষ্ট্যাডি ইত্যাদি। প্রস্টেটের গ্রন্থির সমস্যার ক্ষেত্রে দুই ধরণের চিকিত্সা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। একটি হলো ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে এবং অন্যটি হলো অপারেশন করে। অপারেশন আবার দুই প্রকার একটি প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে অন্যটি পেট কেটে। কোন রোগী কোন পদ্ধতির জন্য উপযুক্ত তা চিকিত্সক নির্ধারণ করবেন। প্রস্টেটের ওষুধে চিকিত্সা ক্ষেত্র বিশেষে প্রস্টেট বৃদ্ধি জনিত উপসর্গসমূহ ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে উপশম লাভ করা যায়। সাধারণত দুই গ্রুপের ওষুধ প্রয়োগ করা যায়। এর এক গ্রুপ ওষুধ প্রস্টেটের মাংসপেশীসমূহ শিথিল করে প্রস্রাবের বাধা দূর করে। এদেরকে বলা হয় আলফা ব্লকার। অন্য গ্রুপ হল প্রস্টেটের আকার ছোট করে। এই গ্রুপটি হরমোন মেনুপুলেশনের মাধ্যমে কাজ করে। এই গ্রুপের ওষুধ যদিও নিরাপদ তবুও কিছু ক্ষেত্রে পুরুষত্বহানী করে। অন্যদিকে আলফা ব্লকারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বীর্যপাত পিছনের দিকে মূত্র থলিতে হতে পারে। শল্য চিকিত্সা আধুনিক পদ্ধতিতে পেট না কেটে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে অপারেশন করা যায়, একে বলে TURP। এই পদ্ধতিটি বাংলাদেশের ইউরোলজিস্টরা সফলতার সাথে বিগত কয়েক দশক ধরে প্রয়োগ করে আসছেন। এই পদ্ধতিতে যন্ত্রের সাহায্যে সরাসরি প্রস্টেট এবং ইউরিনারি ব্লাডারের ভিতরের অংশ দেখা যায়। এর পর হাইফ্রিকোয়েন্সি কারেন্টের সাহায্যে প্রস্টেটকে চিপস আকারে কেটে বের করে আনা হয়। দীর্ঘদিন প্রস্টেট রোগে ভুগলে মূত্রথলির ভিতর পরিবর্তন আসে। মূত্র ত্যাগের পর অধিক পরিমাণ প্রস্রাব থলিতে জমা থাকলে মূত্র থলির সংকোচন ক্ষমতা কমে যেতে পারে বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এমনকি কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সুতরাং এ ধরণের অসুখ নিয়ে অবিলম্বে চিকিত্সকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। সফল অস্ত্রপচারের ১০ দিনের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। ২-৬ সপ্তাহ ভারী ওজন তোলা, স্ত্রীর সাথে মেলা মেশা করা এবং ড্রাইভিং থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রস্টেট বাড়তে থাকে। এই বৃদ্ধির হার ৫০ বছরের উপরে বেশী তবে কিছুক্ষেত্রে প্রস্টেট না বেড়ে ছোট হয়ে যেয়েও সমস্যা সৃষ্টি করে যাকে বলা হয় ফাইব্রাস প্রস্টেট। প্রস্টেট রোগের লক্ষণ নির্ভর করে প্রস্টেট গ্লান্ড মূত্র প্রবাহের উপর কতটুকু বাধা সৃষ্টি করেছে তার উপর বা এটা মূত্রথলির ভিতর কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে তার উপর। উপসর্গগুলো সরাসরি প্রষ্টেট গ্রন্থির আকারেরর উপর নির্ভর করে না। যে সব পুরুষ মানুষের প্রস্টেট জনিত রোগ রয়েছে কিন্তু তা মারাত্মক নয় কিংবা অপারেশন করতে চান না অথবা অপারেশনের জন্য উপযুক্ত নন তাদের ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। যাদের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় বা উপযুক্ত চিকিত্সা পদ্ধতি প্রয়োগ করেও প্রস্রাব করতে পারছেন না, যাদের প্রস্রাবের থলিতে অধিক পরিমাণ প্রস্রাব মূত্র ত্যাগের পরও থেকে যায় বা প্রস্রাবের ধারা অত্যন্ত কম, যে সব ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, যাদের প্রস্টেটের সাথে অন্য জটিলতা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করা হয়। নতুন চিকিত্সা পদ্ধতি TURISঃ TURP এর উন্নত সংস্করণ হচ্ছে TURIS বা Trans Urethral Resection in Saline অর্থাত্ TURP করার জন্য এক ধরণের তরল ব্যবহার করা হতো যাকে বলা হয় গ্লাইসিন। শরীরে গ্লাইসিনের কিছু ক্ষতিকারক প্রভাব রয়েছে এবং গ্লাইসিন থেকে অপারেশন পরবর্তী কিছু কিছু অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই সব দূরীভুত করার জন্য বিশেষ এক ধরণের মেশিনের সাহায্যে গ্লাইসিনের পরিবর্তে নরমাল স্যালাইন দিয়ে TURP করা হয়। এতে রোগী গ্লাইসিনের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে রেহাই পান এবং রোগী অপারেশন পরবর্তী দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন। যে কারণে যাদের হূদরোগ রয়েছে তাদের জন্য বিশেষ উপযোগী। প্রস্টেটের লেজার চিকিত্সা হোলমিয়াম লেজারের সাহায্যে পুরো প্রস্টেটকে তার ক্যাপসুল থেকে আলাদা করে ফেলা হয় যাকে বলা হয় এনোক্লোয়েশন। পরবর্তীতে এই প্রস্টেট মূত্রথলির ভিতরে নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ ধরণের মেশিনের সাহায্যে টুকরো টুকরো করে বের করে আনা হয়। সাধারণত খুব বড় প্রস্টেটের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশী কার্যকর। এই পদ্ধতিকে বলা হয় হোলমিয়াম এনোক্লোয়েশন প্রস্টেট। গ্রীণ লাইট লেজার এই লেজার দিয়ে প্রস্টেটের বৃদ্ধির চিকিত্সা করা হয়। এটি প্রস্টেটকে বাষ্পীভূত করে ফেলে। এই পদ্ধতিতে চিকিত্সা সুবিধা হল রোগী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে বাসায় ফিরতে পারে। রক্তপাত কম হওয়ায় কার্ডিয়াক রোগীদের জন্য ঝুঁকি কম থাকে। সফল অপারেশনের পরেও প্রথম দু’সপ্তাহ প্রস্রাবে জ্বালা যন্ত্রণা করতে পারে বা ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব ঝরতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রথম ২-৩ সপ্তাহ মাঝে মাঝে প্রস্রাবের সাথে দু’এক ফোটা রক্ত ঝরতে পারে। অপারেশনের পর সাধারণত ব্যথা অনুভূত হয় না তবে ক্যাথেটার থাকার জন্য অস্বস্তি হতে পারে। ক্যাথেটার খুলে ফেলার পর স্বাভাবিক প্রস্রাব করা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে যেমন বড় প্রস্টেট হলে কয়েক দিন প্রস্রাব ঝরতে পারে যা পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যায়। যদিও বাইরের দিকে কোন কাটা ছেড়া হয় না তবুও মনে রাখতে হবে প্রস্রাবের রাস্তার ভিতর দিয়ে প্রস্টেট কাটা হয় তাই ভিতরটা কিছু দিন কাঁচা থাকে এবং শুকাবার জন্য কয়েক সপ্তাহ প্রয়োজন। এ সময় ভারী জিনিস উঠানো পায়খানায কোথ দেয়া, স্ত্রীর সাথে মেলা মেশা না করা বাঞ্ছনীয়।