অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না নারীদের

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০৪
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক মাস পালন উপলক্ষে শ্রমিক নারী সমাবেশে নারী নেত্রীরা বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকরা বিশেষ ভূমিকা রাখলেও তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। বর্তমানে বিশ্বমন্দার সময়েও দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড যে মজবুত রয়েছে, তার পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অবদান। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে কাজ করছে শতকরা ৮০ ভাগ নারী এবং অভিবাসী নারী শ্রমিকরাও অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অথচ সেই নারী শ্রমিকদের শ্রমের মূল্যায়ন ঠিকভাবে হচ্ছে না। ‘সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদ প্রতিরোধ করি, তৃণমূলে সংগঠন শক্তিশালী করে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে শক্তিশালী করি’ এই শ্লোগান নিয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে পরিষদের সাংগঠনিক মাস পালন উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সংগঠন উপ-পরিষদের উদ্যোগে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শ্রমিক নারী সমাবেশে তারা এসব কথা বলেন। নিম্ন মজুরি, বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামোর ভেতরে কাজ করছে নারী। সেখানে রাষ্ট্র কোন ভূমিকা নিচ্ছে না। সময় এসেছে নারীর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, সম্মানজনক কর্মক্ষেত্র এগুলো নিশ্চিত করার। সম্প্রতি আবার মৌলবাদী শক্তি নারীকে ঘরে বন্দি করার যে নতুন ষড়যন্ত্র করছে এসব চক্রান্ত রুখে দাঁড়াবার আহবান জানান নারী নেত্রীরা। সমাবেশে মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানম বলেন, নারী শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে সমান সুযোগ, সমান মজুরি, মানবিক কর্মক্ষেত্র, সন্তানদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র, ন্যূনতম মানবিক অবস্থানের ব্যবস্থা, চিকিত্সা সুযোগের জন্য আইএলও নীতিমালার আলোকে নিশ্চিত না করলে মানবিক গণতান্ত্রিক ও সোনার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তিনি শ্রমিক সংগঠন, সরকার, বেসরকারি সংঠনের প্রতিনিধিদের অতিদ্রুত একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আহ্বান জানান। আয়শা খানম বলেন, নারীরা যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে তাদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে। পোশাক শিল্পের সমস্যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আজ নানান চাপ রয়েছে, পোশাক শিল্পের অসংখ্য নারী শ্রমিকের স্বার্থ, নিরাপত্তা, নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, কিছুদিন আগেও বাংলাদেশ পরিচিত ছিল দুর্যোগ প্রবণ, অর্থনৈতিক দুর্দশাকবলিত একটি দেশ হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে আমরা স্বপ্ন দেখছি বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত হবে। এখানে যুক্ত হয়েছে নারীর শ্রম। তিনি বলেন, দেশের মূল অর্থনৈতিক শ্রোতধারায় নারীর শ্রমকে যুক্ত না করতে পারলে দেশের উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে না। স্বাগত বক্তব্যে সাংগঠনিক সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংগঠন উপ-পরিষদের মাধ্যমে সাংগঠনিক মাস পালনের বিশেষ কর্মসূচিতে গত বছর ২০১২ সালে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল কৃষক নারীদের; এবছর শ্রমিক নারীদের নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নির্মাণ শ্রমিক পেয়ারা বেগম। তিনি বলেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করে মজুরি পাই ২০০টাকা। অথচ একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিক পান ৪০০টাকা। কুলসুম বেগম কাজ করেন পোশাক কারখানায়। তিনি বলেন, তারা যে বেতন পান তাতে ঘর ভাড়া দেয়া, খাবার খরচ কোনো কিছুই সঠিকভাবে মেটানো যায় না। হোশিয়ারি শ্রমিক ফাতেমা বেগম বলেন, নারায়ণগঞ্জে ৩ হাজার কারখানায় প্রায় ৬ হাজার নারী কাজ করেন। সেখানে যাতায়াত সমস্যা, বাথরুম সমস্যা, যৌন হয়রানিসহ নানা সমস্যা হয়। কিন্তু এসব সমস্যার কথা জানালে মালিক চাকরি চ্যুতির হুমকি দেন; কিন্তু সমস্যার কোন সমাধান করেন না। টঙ্গীর টেক্সটাইল শ্রমিক সাজেদা বেগম বলেন, সেখানে মজুরি কম দেয়া হয় মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ম মানা হচ্ছে না। নিয়মিত বেতন দেয় না, ডে-কেয়ার সেন্টার নেই। পুরুষ শ্রমিকরাও এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়, তবে নারীরা বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়। উপস্থিত নারী শ্রমিকরা এসব বৈষম্য ও সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানমের সভাপতিত্বে শ্রমিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নরসিংদী জেলা শাখার আন্দোলন সম্পাদক জয়শ্রী সাহা। সমাবেশের প্রস্তাব পাঠ করেন মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসিমা আক্তার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও উন্নয়ন সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম। সমাবেশে ঢাকা মহানগরসহ টঙ্গি, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জ থেকে মোট দুই সহশ্রাধিক নারী শ্রমিক অংশগ্রহণ করেন।