বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে লক্ষ্মীপুরের বীর জনগণ যে দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছে তা আমাদের ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। ২৫ মার্চের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের খবর সারাদেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। এই মর্মান্তিক দুঃসংবাদ লক্ষ্মীপুরে পৌঁছার পর তদানীন্তন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক বসে। বৈঠকে প্রতিরোধ আন্দোলন পরিচালনার জন্য লক্ষ্মীপুর পুরাতন বার লাইব্রেরি ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। পাকবাহিনী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বিনা বাধায় চৌমুহনীর দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়। এই দুঃসংবাদ লক্ষ্মীপুরে পৌঁছার পর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ প্রায় সকলেই প্রাণ ভয়ে লক্ষ্মীপুর ছেড়ে চলে যান। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ফরিদগঞ্জের এক আস্তানায় হানা দিয়ে আমরা ৫টি রাইফেল ও দুই বাক্স গ্রেনেড উদ্ধার করি। এটা ছিল একটা দুঃসাহসিক অভিযান। শহীদ আবুল বাসার বাসু ওরফে আবদুল হালিম, শহীদ আবুল মুনছুর, শহীদ ইছমাইল, শহীদ মোস্তফা, শহীদ আবদুল্যাহ, শহীদ আবু ছয়েদ, শহীদ নজরুল, শহীদ আতিক উল্যা, শহীদ ভূতা মিয়াসহ অনেকে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে আত্মবিসর্জন করেন। ২৮ এপ্রিল, ১৯৭১ ঃ মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন সদস্য রায়পুর থানা আক্রমণ করে। রায়পুর থানা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন লাভ না হলেও এটি আমাদের মনোবল ও মানসিক অবস্থা দৃঢ় করে। এ অঞ্চলে ঐ ঘটনা ছিল মুক্তি বাহিনীর প্রথম অপারেশন।৬ মে, ১৯৭১ ঃ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল লক্ষ্মীপুর মাদাম পুলটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরকের সাহায্যে উড়িয়ে দিয়েছিল। মাদাম পুলটি ভেঙ্গে যাবার ফলে লক্ষ্মীপুর প্রবেশের বিকল্প রাস্তাটি মুক্তিযোদ্ধারা প্রকাশ্য দিনের বেলায় লোকজন নিয়ে কেটে ফেলে। ২৯ মে, ১৯৭১ ঃ আমাদের লক্ষ্য ছিল নোয়াখালীর সমস্ত পশ্চিমাঞ্চল হানাদার বাহিনী মুক্ত রাখা। সে লক্ষ্যে পরিকল্পনা মোতাবেক চন্দ্রগঞ্জ পুলটি বিস্ফোরকের সাহায্যে উড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে রাত ১১.০০ টায় চন্দ্রগঞ্জ পৌঁছে বিস্ফোরকের সাহায্যে পুলটি উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পর্যাপ্ত বিস্ফোরক না থাকায় পুলটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। পুলটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার জন্যে আমরা সরারাত হাতুড়ি এবং সাবোল দিয়ে চেষ্টা করি। পরদিন সকালে আমরা রায়পুর পৌঁছার পর চেয়ারম্যান জনাব নুরুল ইসলাম আজুব আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। একারণে পাক বাহিনী আজুবের বাড়ি ঘর ও তাঁর একটি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। ২৫ অক্টোবর ১৯৭১ ঃ লক্ষ্মীপুর-মীরগঞ্জ রাস্তার দুই পাশে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর সরবরাহ পথ বন্ধ করার জন্য ফাঁদ পেতে আক্রমণের অপেক্ষায় ছিল। দীর্ঘ ৮ মাইল রাস্তার দুই পাশে মুক্তিযোদ্ধারা ২০টি সেকশনে বিভক্ত হয়ে এ্যাম্বুশ পেতে তিন দিন যাবত পাকবাহিনীর আক্রমণের অপেক্ষায় বসে থাকে। পাকবাহিনীর ১০-১২টি গাড়ি, জিপ, ট্রাক ও মিলিটারি ভ্যান সাইছা ফজল চৌধুরী বাজারের ঠিক উত্তর দিকে বেলা ১০ টার সময় পৌঁছলে রাস্তার পূর্ব দিকে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম আক্রমণ শুরু করে। এইভাবে ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ সেকশনের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। মীরগঞ্জ পৌঁছার পরই হানাদার বাহিনীর মেজর ইমতিয়াজ ট্রাকের ওপর থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। সেদিন যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর মেজরসহ ৭০ জন পাক সৈন্য ও ৪১ জন রেঞ্জার নিহত হয়। বিপুল হতাহতের কারণে বিপর্যস্ত হানাদার বাহিনী পশ্চাদপসারণ করতে বাধ্য হয়। সেদিন কোন মুক্তিযোদ্ধা মারা না গেলেও পূর্ব পাকিস্তান রেডিও এই যুদ্ধে ৮০০ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা গিয়েছিল প্রচারণা চালায়।
শহীদ নজরুল ঃ স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা আত্মোত্সর্গ করেছে তাদের মধ্যে শহীদ নজরুল ইসলাম একজন অমিততেজা-সাহসী মুক্তিযোদ্ধার নাম। লক্ষ্মীপুর সদরের বাগবাড়িস্থ পাকবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে পাকসেনারা তার ওপর নির্মম ও পাশবিক নির্যাতন করে। তিনি পাকবাহিনীর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সাহাপুরে এক হিন্দু বাড়ির বাগানের ভিতর দিয়ে দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করে। পাকবাহিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পুকুরে ঝাঁপ দেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। পাকবাহিনী সেখানেই তাকে হত্যা করে। সংবাদ পেয়ে পরদিন ভোরে চারজন সহযোগীকে নিয়ে সাহাপুর গ্রামে গিয়ে শহীদ নজরুলের বিকৃত লাশ নিয়ে আসি। পরে রামগঞ্জের মাঝিরগাঁয়ে তাঁকে সমাহিত করা হয়। এমনিভাবে বিভিন্নযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল, আবুল বাশার বাসু, মোস্তফা, মনসুর, আবু সায়েদ, আতিক, ভুতা মিয়া শহীদ হয়েছিলেন।
সংগৃহীত ঃ সাপ্তাহিক আনন্দ আকাশ, লক্ষ্মীপুর ১৯৯৫-১৯৯৭ লেখক ঃ লক্ষ্মীপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক মরহুম রফিকুল হায়দার চৌধুরী।
