পুলিশের সোর্সরা বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দেয়। এলাকার ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদাবাজি, জমি দখল নিয়ে মধ্যস্থতা, এমনকি কাঁচামালের আড়ত থেকেও এরা চাঁদাবাজি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সোর্সরাই থানার ওসির ক্যাশিয়ার হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকে। অনেক সোর্স মামলার আসামিদের পক্ষ নিয়ে পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে বাদীকে হুমকি দেয়। আবার অনেক সোর্স কোন ব্যক্তিকে আটক করে থানায় আনলে মোটা অংকের টাকা মিলবে-এমন তথ্যও সাব-ইন্সপেক্টরদের দিয়ে থাকে। থানার সোর্সদের বিরুদ্ধে এরকম অন্তত শতাধিক অভিযোগ পড়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘থানায় অনেক সময় সোর্সের কাজ করার পর তাদের বাদ দেয়া হয়। পরে ঐ সাবেক সোর্সরাই পুলিশের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে। এরকম চাঁদাবাজদের ইতিপূর্বে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ঢাকার ১০, দক্ষিণ খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা রুমানা শারমিন গত ১৯ সেপ্টেম্বর ডিএমপি কার্যালয়ে একটি অভিযোগ জমা দেন। তাতে বলা হয়, গত ১২ সেপ্টেম্বর সকালে তার বাসায় খিলগাঁও থানার সোর্স জলিল ও খাদেম আসেন। তারা নিজেদের পুলিশের লোক বলে পরিচয় দেয়। এসময় তারা তার স্বামী মাহবুব হোসেনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। তার স্বামী চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তারা জানায় যে, ইয়াবা দিয়ে তার স্বামীকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়া হবে।
এ ঘটনার কিছু সময় পর খিলগাঁও থানা থেকে সিভিল টিম এসে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তিনি থানায় যোগাযোগ করে সোর্সদের কাছে ২০ হাজার টাকা দেয়ার পর তার স্বামীকে ছেড়ে দেয়া হয়।
খিলগাঁও থানার উত্তর দিকে জ-২৮ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির মালিক আব্দুল খালেক। কয়েকদিন আগে থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় একজন সাব-ইন্সপেক্টর তাকে থানায় দেখা করার জন্য কনস্টেবল দিয়ে ডেকে নেন। থানায় যাওয়ার পর তাকে হাজতখানায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সেখানে দুই জন সাব-ইন্সপেক্টর তার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তিনি থানায় আসার আগে তার এক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে মাসিক ভাড়া ১২ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। তিনি পুলিশের কাছে ১ লাখ টাকা দিতে অস্বীকার করলে তার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা কেড়ে নেয়া হয়। পরে তার শার্টের পকেটে ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে আদালতে চালান দেয়া হয়। আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে তিনি ঐ দুই সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
ঐ অভিযোগটি পুলিশের ডেমরা জোনের একজন পদস্থ কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দিষ্ট দিনে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় ঐ পুলিশ কর্মকর্তার কক্ষে উপস্থিত হন। সেখানে পূর্ব থেকেই ঐ দুই সাব-ইন্সপেক্টর পুলিশের ঐ কর্মকর্তার সামনের দুই চেয়ারে বসেছিলেন। তাকে দেখে ঐ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি এসেছেন। আমি যেটা ভাল করার তাই করব।’ এ কথা বলার পর ঐ পুলিশ কর্মকর্তা তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। এ ঘটনার পর এখনও কোন সুবিচার হয়নি। তিনি এ অভিযোগ আবারও পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় ও পুলিশ সদর দফতরে সিকিউরিটি সেলে জমা দেন।
যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় পুলিশের সোর্সদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। এলাকায় সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল, যাত্রাবাড়ী মোড়, যাত্রাবাড়ী মাছের আড়ত, সবজির আড়তসহ বিবির বাগিচার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তারা যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করে।
যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে পুলিশ সোর্স দেলু, কাশেম ও খোকন চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে। জানা যায়, যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে প্রায় ১২শ’ দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন পুলিশের নামে ১০ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে। যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের একজন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, পুলিশ সোর্সদের কাজ প্রতিদিন ভোরে মাছের আড়তে এসে থানার নামে চাঁদা তোলা।
