সিরিয়ায় আসাদ সরকার গত ২১ আগস্ট রাসায়নিক ব্যবহার করেছে দাবি করে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্ররা দেশটিতে সামরিক হামলার হুমকি দেয়। যুদ্ধ প্রস্তুতিও নিতে শুরু করে তারা। কিন্তু পার্লামেন্টে অনুমোদন না পাওয়ায় পিছু হটে ব্রিটেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিরিয়া বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানায় ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র একাই সিরিয়াতে হামলা চালাবে বলে ঘোষণা করে। তবে সিরিয়ার পক্ষে সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে মার্কিন অভিযানের বিরোধিতা করে রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, এ রাসায়নিক অস্ত্র যে আসাদ সরকারই ব্যবহার করেছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।
সরকার বিরোধীরাও এ ধরনের হামলা চালাতে পারে। এছাড়া জাতিসংঘের অনুমোদন না নিয়ে পশ্চিমাদের সিরিয়া হামলা হবে বেআইনি। তিনি বলেন, সামরিক হামলার চেয়ে কূটনৈতিক তত্পরতা চালানো যেতে পারে। এ অবস্থায় মার্কিন জনগণের সম্ভাব্য অসমর্থনের মুখে রাশিয়ার দেয়া প্রস্তাব অনুসারে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করার বিষয়ে একমত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতিসংঘসহ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এখন এগোচ্ছে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করতে। যদিও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ বলছেন, এ অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করতে এ বছর সময় লাগবে। এজন্য খরচ হবে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় এখন মার্কিন হামলার সম্ভাবনা নেই। কূটনৈতিক তত্পরতার মাধ্যমেই সিরীয় সমস্যার সমাধান হতে চলেছে। একটি সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে বিশ্ব মানব সমাজের একটি অংশ। এ বিষয়টিকে বিশ্বের শত কোটি মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে এ কারণে একটু বেশিই ক্ষুব্ধ হয়েছে সিরিয়ার সরকার বিরোধীরা। যারা আসাদ সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে দুই বছরের বেশি সময় ধরে লড়াই করে আসছে।
তারা মনে করেছিল, এ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অজুহাতে পশ্চিমা বিশ্ব সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালাবে এবং আসাদ সরকারের ক্ষমতা দুর্বল করে দেবে। যাতে সহজেই তারা ক্ষমতা থেকে আসাদ সরকারকে হটাতে পারবে। কিন্তু রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করার পরিকল্পনায় তারা হতাশ হয়েছে। এছাড়া আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে তাদের পশ্চিমা সমর্থন হারানোরও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিরীয় বিদ্রোহীদের আলাদা করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিগত আড়াই বছরের গৃহযুদ্ধের অবসানে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাও বিঘ্নিত হতে পারে। রাসায়নিক অস্ত্র হামলার পর যুদ্ধক্ষেত্রে কিছুটা অচলাবস্থার তৈরি হয়েছিল। বিদ্রোহীরা ভেবেছিল যুক্তরাষ্ট্র আসাদের শাস্তি হিসেবে সামরিক অভিযান চালাবে। যার ফলে নতুন শান্তি সম্মেলনে আসাদ যোগ দিতে বাধ্য হবে।
বিদ্রোহী সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশন বলছে, প্রায় দশদিন আগেও মার্কিন প্রশাসন আমাদের বলেছে খুব শিগগিরই অভিযান হবে। এখন তারা আমাদের না জানিয়ে নিজেদের মত পরিবর্তন করে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে গেছে। তাদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে যাওয়া কার্যত আসাদ সরকারের কাজের বৈধতা দেয়া এবং আসাদ বিরোধী সিরীয় নাগরিক দাবিকে অসম্মান করা।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আসাদ বিরোধীদের সমর্থন দিচ্ছে। গত সপ্তাহে এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে আমরা এখনো অটল রয়েছি। প্রথমে আমরা রাসায়নিক অস্ত্রের বিষয়টি সমাধান করতে চাই। তবে ওবামার ভাষণে বিদ্রোহীরা ততটা আশাবাদী হতে পারেনি। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে বিরোধী গ্রুপগুলোর বৈঠকে সে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে পশ্চিমা কূটনীতিকরা মনে করেন। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সিরিয়ার বিদ্রোহী জোট বুঝতে পারছে এখানে অনেক বড় শক্তির খেলা চলছে।
বিদ্রোহীরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত তাদের উপর চপেটাঘাতের মতো। এর মাধ্যমে বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকায় আসাদ বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণের অনুমতি মিলেছে। আসাদ সরকারকে তার সামরিক শক্তি একত্রিত করারও সুযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে। প্রায় ২৫ লাখ লোক শরণার্থী হয়েছে। এ অবস্থায় পশ্চিমাদের সিদ্ধান্ত হতাশাজনক।
অন্যদিকে, আসাদ বিরোধী দলগুলো এখনো একজোট হয়ে কাজ করতে পারছে না। বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী জোটের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে। বিদ্রোহীদের প্রধান দুই উপদল হলো পশ্চিমা দেশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা ফ্রি সিরিয়ান আর্মি এবং ইসলামপন্থী দলগুলোর জোট। প্রথম উপদলটি নিজেকে সবচেয়ে বড় বাহিনী হিসেবে ঘোষণা করে থাকে। পরের উপদলটি দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের অনেকগুলো স্থান দখল করে আছে এবং দিন দিন এসব জিহাদির ক্ষমতার আকার বাড়ছে। এ অবস্থায় পশ্চিমা সামরিক অভিযান ছাড়া তাদের জয়ের সম্ভাবনা কম।
পশ্চিমাদের এই চুক্তিতে সিরীয় বিদ্রোহীদের পাশাপাশি আরব পারস্য উপসাগরীয় অনেক দেশই খুশি হতে পারেনি। বিশেষ করে সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পক্ষে নয়। যদিও তারা সরাসরি এ বিষয়ে কিছুই বলেনি। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আসাদ সরকারকে নয় বরং রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। এসব উপসাগরীয় দেশই সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রধান অর্থ সহায়তাকারী। তারা তুরস্ক দিয়ে অস্ত্রশস্ত্রও সরবরাহ করছে।
