নাইজেরিয়া

বাল্যবিবাহের স্বর্গরাজ্য!

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৮
একমাত্র কন্যা জাইনাবের বয়স ১৩ হতে না হতেই ঘনঘন বিয়ের প্রস্তাব পাঠাচ্ছিলেন ৬৩ বছরের এক বৃদ্ধ। কিন্তু মেয়ের ভবিষ্যত্ চিন্তা করে ইব্রাহিম কানুমা তাতে সায় দেননি। পাত্রের অধিক বয়সের বিষয়টি মাথায় এনে তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু এ ধরনের বিয়ে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত ও ধূলিময় রাজ্য জামফারাতে হরহামেশা ঘটছে; কেউ বাধা দেয় না। ওই সময়কার ঘটনাগুলো স্মরণ করতে গিয়ে ইব্রাহিম কানুমা বলছিলেন, ‘তার বয়স পঞ্চাশের কম হলেও একটা কথা ছিল। আমি তো জেনেশুনে আমার মেয়েকে সহসাই বিধবা হতে দিতে পারি না। সে তো তাকে ছেড়ে পরপারে চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েই ছিল। উপরন্তু তাকে হতে হতো তৃতীয় কিংবা চতুর্থ স্ত্রী। লোভে পড়ে মেয়েকে বিয়ে দিলে আমি ভুলই করতাম।’ তাই বলে বাল্যবিবাহকে এড়িয়ে যেতে পারেননি সরকারি কর্মকর্তা ইব্রাহিম কানুমা। মেয়েকে দ্রুত বিধবা হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পাত্র হিসেবে বেছে নেন প্রায় নিজের সমবয়সী একজনকে। অর্থাত্ বয়স চল্লিশের কোঠায়। নাইজেরিয়ার ফেডারেল আইন অনুসারে ১৮ বছরের নিচের কোনো মেয়েকে বিয়ে দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সে কথা কে শুনে। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বয়স বারো-তেরো হলেই মেয়েদের পরের ঘরে পার করে দেয়াটাই যেনো বিধান। ইব্রাহিম কানুমার অভিমত, পছন্দ হচ্ছে না এমন কারো সঙ্গে চাপিয়ে দেয়াটাকে আমি পছন্দ করি না; কিন্তু রজঃস্রাব শুরু হয়ে গেলে যতো দ্রুত সম্ভব মেয়ের বিয়ে দেয়া উচিত। বাল্যবিবাহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল ও সাহারা বেল্টে এর তীব্রতা অনেক বেশি। বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হারের সেরা দশটি দেশের তালিকায় এ অঞ্চলেরই রয়েছে চারটি দেশ। তার মধ্যে নাইজেরিয়া পড়ে। ২০১০ সালে ৪৭ বছর বয়স্ক জামফারার সিনেটর আহমেদ ইয়েরিমা ১৩ বছর বয়সী মিশরীয় বালিকা আইশাকে বিয়ে করে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। মিডিয়ায় খবরটা এসেছিল এভাবে— রক্ষকই ভক্ষক। বিয়ের পরের দিনই আইশাকে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে। ওই রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সে কেবল একটি কথাই বলেছিল, ‘বেদনাদায়ক’। কিন্তু এ নিয়ে মোটেই অনুশোচনা ছিল না আহমেদ ইয়েরিনার। উপরন্তু ইয়েরিমা বিয়ে হয়ে যাওয়া সকল নারীর ভোটাধিকার দাবি করেছেন। কিন্তু তা মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় সরকার। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে গ্রামীণ হাউসা জনগোষ্ঠীর মাঝে বাল্যবিবাহের প্রবণতা খুব বেশি। খরা বা দুর্ভিক্ষের সময় এ ধরনের বিয়ের ঘটনা বেড়ে যায়। ক্ষুধার জ্বালা থেকে বাঁচতে দরিদ্র বাবা টিনেজ মেয়েকে তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী পাত্রের হাতে সপে দেয়। এক্ষেত্রে যার যত কম বয়স তার জন্য স্বামী মেয়ের বাবাকে তত বেশি পণ দেয়। বয়স বেশি হলে পণের বাজারে ওই মেয়ের কদর কমে যায়। বিত্তবানরা সবসময়ই চায়, খরা কিংবা দুর্ভিক্ষ ঘনঘন আসুক, যাতে কমবয়সী বধূ ঘরে আনা যায়। জামফারার রিগাসা গ্রামে নাফিসার শ্বশুড়বাড়ি। ১২ বছর বয়সে তাকে বসতে হয়েছিল বিয়ের পিড়িতে আর এখন ১৪ চলছে। প্রতিদিন সকালে স্বামী ও শ্বশুড়ের জন্যে রুটি বানানোর সময় গুড়াকৃত ভুট্টার উপর সে লিখে, এ-বি-সি-ডি। কেবল এই চারটি অক্ষরই মনে আছে তার। আবার পড়াশোনা করতে চাই, এ কথা বললেই স্বামী তাকে মারতে আসে। সেজন্য এখন আর ভয়ে বলে না। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে স্কুলে। চোখ বন্ধ করলেই সে শুনতে পায় ঘন্টার আওয়াজ।